
নির্বাচিত কলাম
শের ও শায়ের নওশাদ নূরী
আইয়ুব হোসেন
নওশাদ নূরী উর্দু সাহিত্যের একজন খ্যাতনামা শীর্ষস্থানীয় কবি। বাংলাভাষী পাঠক তাঁর কবিতার সংস্পর্শে খুব বেশি আসার সুযোগ পান নি। তাঁর খুব সামান্য কিছু কবিতা বাংলায় অনূদিত হয়েছে। তাতে তাঁর কাব্যগুণ বা মননশীলতা বুঝে ওঠার মতো সুযোগ সৃষ্টি হয় নি। তিনি কত বড় মাপের কবি ছিলেন তা অবহিত করার জন্য একগুচ্ছ কবিতা পাঠ ও অনুধাবন করা গেলে তাঁর কাব্যমানস সম্পর্কে ধারণা গড়ে ওঠার অবকাশ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে উর্দু জানা কাব্য সমঝদারের সংখ্যা নেহায়েতই হাতে গোনা। তাদেরই কয়েকজন বিদগ্ধ কবি নওশাদ নূরীর কতিপয় কবিতা অনুবাদ করেছেন। তিনি প্রগতিশীল চিন্তা এবং ধ্রুপদধর্মী অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত উর্দু ম্যাগাজিন এবং ভারত ও পাকিস্তানের উর্দু পত্রপত্রিকায় তাঁর অসংখ্য কবিতা কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। জীবদ্দশায় বই প্রকাশিত হয়েছে দু’খানি। প্রায় দুই দশক আগে তিনি প্রয়াত। ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনা থেকে অভিবাসীত কবি নওশাদ নূরী অল্প কিছুকাল পাকিস্তানে এবং আজীবন ঢাকায় বসবাস করেছেন। ১৯২৬ সালের ২১ অক্টোবর তারিখে ভারতবর্ষের বিহার রাজ্যের দ্বারভাঙ্গায় নওশাদ নূরীর জন্ম। নওশাদ নূরী তাঁর ছদ্মনাম বা কলমী নাম। আসল নাম মোহাম্মদ মোস্তফা মাসুম হাশমী। ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিক এবং তারপর বিএ পাস করেন পাটনা বিএন কলেজ থেকে। এসময় তিনি বামধারার রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। যুক্ত হন বিহারের রেলশ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে। সর্বভারতীয় প্রগতিশীল লেখকদের সংগঠন প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশন গঠিত হলে তিনি বিহার রাজ্য শাখার সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। পঞ্চাশ দশকের প্রাক্বালে তিনি গ্রেফতার হন। মুক্তি পাবার কিছুকাল পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওয়াহারলাল নেহেরুকে নিয়ে একটি কবিতা লেখার কারণে তাঁর নামে হুলিয়া জারি হয়। অতঃপর ১৯৫১ সালে পূর্ব বাংলায় পালিয়ে আসেন। বাংলা ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রথম পর্যায়ে সমমনা সতীর্থ হিসেবে সখ্য গড়ে ওঠে কমরেড রনেশদাশগুপ্তসহ প্রগতিশীল লেখক ও শ্রমিক নেত্রীবৃন্দের সঙ্গে। ফলত এখানেও প্রগতিধারার বিভিন্ন ফ্রন্টের সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে ওঠে এবং ক্রমান্বয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। হক-ভাসানী যুক্তফ্রন্ট এবং পরবর্তীতে ভাসানী ন্যাপের সমর্থক হয়ে কাজ করেন।
অন্যদিকে, সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পর বিপুল সংখ্যক ভারতীয় উর্দুভাষী মানুষ পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যক অভিবাসী ভারতে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে আশ্রয় নেন। এরা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, ঈশ্বরদী ও সৈয়দপুর বসবাস করতে থাকেন। এদের মধ্যস্থিত প্রগতিবাদী মানুষকে নওশাদ নূরী একত্রিত করার প্রয়াস পান। যাদের মধ্যে ছিলেন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ ইব্রাহীম, জাবেদ মিনহাজ। আজিজ নুমানী, ইমরান ফাহাদ, কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ সাদী, আদমেদ ইলিয়াস, জয়নুল আবেদীন, হাসান সাঈদ, সালাউদ্দিন আহমদ প্রমুখ। মূলত সে সময় উর্দুভাষী প্রগতিশীল লেখকদের অংশের নেতৃত্ব দেন নওশাদ নূরী। আমৃত্যু বাংলাদেশের উর্দু সাহিত্যিকদের অভিভাবক হিসেবে তিনি প্রতিভাত হয়েছেন। সবাইকে আগলে থাকার চেষ্টার পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা, এই ভূখণ্ডের মাটি ও মানুষের প্রতি আনুগত্য এবং প্রেম গড়ে তোলায় সচেষ্ট থেকেছেন। উর্দুভাষী একাংশের দোলাচল বৃত্তি পরিহার এবং এই প্রবণতাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। একজন বিশ্ব নাগরিক হিসেবে আমরা তাঁকে প্রত্যক্ষ করছি।
১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন পাকিস্তানে। কাজ করেছেন অডিট এন্ড একাউন্টস ডিপার্টমেন্টে। পড়ে ফিচার সিন্ডিকেটে। ছিলেন করাচি ও কোয়েটায়। ফিচার সিন্ডিকেটের ঢাকা শাখায় কর্মকালে তিনি কর্মস্থলে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃতজ্ঞ কামাল লোহানী ও কৃতবিদ্য সাংবাদিক আহমেদ হুমায়ুনকে। ১৯৬১ সাল থেকে সংবাদপত্রের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত থেকেছেন। ভাসানী ন্যাপ-এর তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল মশিউর রহমান যাদু মিয়ার সঙ্গে সখ্যের সুবাদে তাঁকে নিয়া ‘রুদাদ’ নামে একটি উর্দু সাপ্তাহিক প্রকাশ করেন ১৯৬৮ সালে। ক্ষণকালীন এই সাপ্তাহিকটি অবলুপ্ত হলে বিশিষ্ট দূরদর্শী প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাজনীতিক তাজউদ্দিন আহমদের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৬৯ সালে প্রকাশ পায় আরেকটি উর্দু সাপ্তাহিক। এর নাম জারিদা। জারিদায় বাঙালি জনতার সমধ্বনিতে উর্দুতে শ্লোগান দেওয়া হয়, তেরি নাজাত মেরি নাজাত, ছে নুকাত ছে নুকাত (তোমার মুক্তি আমার মুক্তি, ৬ দফা ৬ দফা)। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের ইঙ্গিত প্রদান করেই সাপ্তাহিক জারিদার প্রতিটি সংখ্যায় একজন করে বাঙালি বিশিষ্ট লেখকদের পরিচিতি ও সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে আছেন- আব্দুল গণি হাজারি, সিকান্দার আবু জাফর, শহীদ কাদরী, শওকত ওসমান। লায়লা সামাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, সরদার জয়েনুদ্দিন, জহির রায়হান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, রাহাত খানসহ আরও অনেকে।
স্বাধীনতা উত্তরকালে নওশাদ নূরী প্রচণ্ড অনটনে পরিবার নিয়ে দিনাতিপাত করেছেন। তবে চার ছেলেমেয়ের (এক ছেলে তিন মেয়ে) লেখাপড়া কখনও অগ্রাহ্য করেন নি। এক্ষেত্রে তাঁর সহধর্মীর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। আর্থিক অস্বচ্ছলতা তাঁকে কাতর করে নি বা তাঁর মুখের দরাজ হাসি অম্লানও হয় নি। অজস্র কবিতা লিখেছেন এসময়। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের পরিসর ছাড়িয়ে তাঁর কবিখ্যাতি বিস্তৃত হয় বিভিন্ন দেশে। গুণগ্রাহী সৃষ্টি হয় প্রচুর। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ভাষাগত প্রতিকূলতার কারণে বাংলাদেশে তাঁর পরিচিতি বা খ্যাতি খুব ব্যাপক না হলেও একটা মহল পর্যন্ত নওশাদের প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত জনপ্রিয়তা গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে বসবাস ও চর্চারত উর্দু লেখকদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে তিনি সকলকে এক কাতারবন্দি করায় সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু এখানকার উর্দু লেখকদের মধ্যে মোটামুটি তিনটি ধারা প্রবাহিত- প্রগতি, ধর্মীয় ও নিরীহ। এই ধারার লেখকদের মধ্যে ঐক্য স্থাপনে তাঁর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। শেষমেশ তিনি প্রগতিধারার লেখকদেরই পরিপুষ্ট করেছেন ও সান্নিধ্যে থেকেছেন।বাংলাদেশের এই মহতী উর্দু কবির কাব্য রসাস্বাদনের জন্য আমার এবং কবি জামানভি’র যৌথ সম্পাদনায় ‘নওশাদ নূরীর কবিতা’ অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ২০১০ সালে। বইতে প্রায় ৪০টি কবিতা ও গজল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ভুক্ত কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন বাংলা ও উর্দুভাষার স্বনামখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকবৃন্দ। অনূদিত সকল কবিতা বা গজল স্বচ্ছন্দ বা ঝরঝরে রূপ নিয়েছে এমন দাবি করার অবকাশ হয়ত নেই। আর কবিতার আদৌ সত্যিকার অনুবাদ সম্ভব কিনা তা এ যাবৎ কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেন নি। তবে অনুবাদকর্মে যদি স্বয়ং কবি নিবিষ্ট হন, তাহলে হয়ত তা উতরে যায়। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অনূদিত বইটির মাধ্যমে নওশাদ নূরী এবং তাঁর কিছু কবিতার সাথে আগ্রহী বাংলাভাষী পাঠকদের খানিকটা পরিচয় ঘটবে ও তাঁকে জানার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশাকরি।
আইয়ুব হোসেন: লেখক ও গবেষক। ‘নওশাদ নূরীর কবিতা’ গ্রন্থের অন্যতম সম্পাদক।



