
নিরাপত্তা মানুষের ন্যূনতম চাওয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাম্য নিজ ক্যাম্পাসেই দুর্বৃত্তদের হাতে ছুরিকাহত হয়ে নিহত হওয়ায় ক্যাম্পাস বিক্ষোভে উত্তাল। এর আগে কথিত হাসির অভিযোগে ছুরিকাহত হয়ে মৃত্যুবরণ করে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পারভেজ। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে- মৃত্যু কি এতই সহজ আর এত সহজেই হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটে? দলবদ্ধ হয়ে হামলা করা, যাকে মব সৃষ্টি বলা হয়, সেটাও মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলছে।
Ezoic
এর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত ধরনের ১৩ হাজার ৪৯৬টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর পুলিশি ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এরপর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি ব্যাপকভাবে সামনে আসতে থাকে। এর মধ্যে ছিনতাই বা ডাকাতি, দস্যুতা, অপহরণ, খুন, ধর্ষণ, চুরি ও সিঁধেল চুরি- এই সাত ধরনের অপরাধের ঘটনা নিয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা গেছে। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণের অভিযোগে ৮৩২টি মামলা হয়েছে। সাত মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৪৫৬টি, গত সাত মাসে চুরির ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৭৩৪টি।
অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া, অভ্যুত্থানে আশাবাদী হয়ে ওঠা মানুষের কপালে তাই চিন্তার ভাঁজ। তাদের অনুচ্চারিত প্রশ্নকে ভাষায় রূপ দিলে শোনা যাবে তারা বলছেন, হচ্ছেটা কী দেশে? পুরোনো অধ্যায় শেষ করে নতুনের পথে যাত্রা করার জন্যই তো মানুষ পরিবর্তন চায়। পুরোনো পরিত্যক্ত কিন্তু নতুন এখনো স্থায়িত্ব পায়নি এরকম সময়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা এবং অস্থিরতা থাকতে পারে কিন্তু অভ্যুত্থানের এতদিন পর অরাজকতা তো কারই কাম্য নয়।
মানুষ মনে করে বিচারালয় সব নাগরিকের শেষ আশ্রয়। যেখানে ন্যায়বিচারের স্বার্থে অভিযুক্ত, অপরাধী, অন্যায়কারীকে যেমন উপস্থিত হতে হয় তেমনি বিচারপ্রার্থীও উপস্থিত থাকেন। অন্যায়কারী এবং অন্যায়ের শিকার দুজন এক জায়গায় উপস্থিত হলে উত্তেজনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যখন মানুষ বিচারপ্রার্থী হয় তখন ব্যক্তিগত উত্তেজনার পরিবর্তে আইনের ব্যাখ্যা করে অপরাধের মাত্রা ও শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। রায় ঘোষণার আগে বিচারালয়ে সবার নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার গণতান্ত্রিক ও নৈতিকভাবে স্বীকৃত।
এটা না থাকলে তো বিচারের আগেই রায় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তেজনা থাকলেও আদালতের পরিবেশ রক্ষায় আইনজীবীদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিছুদিন ধরে আইনজীবীদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। যা দৃষ্টান্ত হিসেবে খারাপ এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রশ্ন ও পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করবে। নিম্ন আদালতে অভিযুক্তদের ওপর হামলা, জুতা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। কিন্তু উচ্চ আদালতে এ ধরনের ঘটনা বিচারালয়ের সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগের জন্ম দেয়।
অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানের তুলনায় রাজধানীতেই প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো ইস্যুতে বিশৃঙ্খলা, সংঘাত ও সহিংসতা ঘটছে। কলেজের ছাত্ররা জড়িয়ে পড়ছে সংঘাত ও সংঘর্ষে। মাঝে মাঝেই ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের ছাত্ররা জড়িয়ে পড়ছে সংঘর্ষে। কিছুদিন আগে ছাত্রসংঘর্ষে পুরান ঢাকা ও যাত্রাবাড়ী পরিণত হয়েছিল রণক্ষেত্রে। হামলা-পাল্টা হামলার শিকার হয় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একটি হাসপাতাল। শুধু হামলা নয়, লুটপাটের কারণে তিন তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।
তেজগাঁওয়ের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলের শিক্ষার্থীরাও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে কারণ খুব বড় নয় কিন্তু সংঘাতের ব্যাপকতা ভয়াবহ। আর যে বিষয়টি উদ্বেগের তা হলো, কদিন আগে যে ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এত বড় আন্দোলনের জন্ম দিল, জীবন ও রক্ত দিয়ে সাফল্য ছিনিয়ে আনল, তারা কেন এ ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে?
কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যার পরিণতিতে তৈরি হয় উত্তেজনা। ব্যাটারিচালিত রিকশা ধ্বংস করা কোনোভাবেই বিবেচনাপ্রসূত ছিল না। এর সঙ্গে শুধু লাখ লাখ চালকের জীবিকার প্রশ্নই জড়িত নয়, ঢাকা মহানগরের যোগাযোগব্যবস্থাও তো জড়িত। নাগরিকরা চলাফেরা করবেন কীভাবে সে কথাও ভাবা হয় না। ফলে জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক নেমে এসেছিলেন রাস্তায়। ঢাকার প্রেস ক্লাব, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, মহাখালী ও ধানমন্ডি এলাকা অবরুদ্ধ ছিল ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের আন্দোলনে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ ছিল ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক। কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে মানুষ নিজের মতো করে কাজ খুঁজে নেয়। সংসার চালানোর চিন্তা, মাথায় ঋণের বোঝা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ একজন তরুণ যুবককে বিক্ষুব্ধ করে তুললে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, সে কথা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
একথা তো সত্যি যে, গত পনেরো বছরে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের পুলিশ ও প্রশাসনের শৃঙ্খলা। এ প্রতিষ্ঠানগুলো যে রাষ্ট্রীয় এবং এখানে কর্মরতরা যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী তা ভুলিয়ে দিয়ে দলীয় কর্মীর মতো ভূমিকা আর দুর্নীতির অবাধ সুযোগের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো দমন-পীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। অভ্যুত্থানের পরে ক্ষোভের মুখে পড়েছিল এ দুই প্রতিষ্ঠান। এখনো সেখানে স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যদি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল না হয় তাহলে সংঘাত অনিবার্য। এ সংঘাত রাজনৈতিক রূপ নেবেই। যদি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন হয়, তাহলে যে সাময়িক শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা তৈরি হয়, সেই সময় এক ধরনের অরাজকতা চলে। আর এ সময়ে তাৎক্ষণিক সুবিধা নেওয়া, শত্রুতা, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা, জমি, বাড়ি, সম্পদ দখল করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। এসব যারা করে সেই মানুষগুলোর কোনো সামাজিক দায় নেই, থাকে না কোনো লজ্জা বা কোনো মানবিকবোধ।
কাজেই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধান করা, দখলবাজি বন্ধ করা, দেশকে আইনশৃঙ্খলার আওতায় নিয়ে আসার কাজটি প্রথম এবং প্রধান হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় কাজটি হলো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে অনিয়ন্ত্রিত বাজারের কারণে। চাহিদা-সরবরাহের সাধারণ নীতিকে পর্যুদস্ত করে বাজার সিন্ডিকেট সরবরাহ চেইনে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। ফলে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং দ্রব্যমূল্য সহনীয় করে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আনা অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
আর একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের চর্চা এবং জবাবদিহি না থাকায় গত পনেরো বছর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এমন দলীয়ভাবে কুক্ষিগত করা হয়েছিল যা আগে কখনো হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠান ভয়াবহ দুর্নীতি এবং দমন-পীড়নের সংস্থায় পরিণত হয়েছিল। যোগ্যরা বিতাড়িত অথবা মাথা নিচু করে থেকেছে আর দলীয় ব্যক্তিরা দুর্বিনীত হয়ে উঠেছিল। লুটপাট হয়েছে সীমাহীন। ফলে সব রকম সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়েছে। পুলিশ এবং প্রশাসন তো বটেই বিচার বিভাগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বলা হয় বিচার বিভাগ স্বাধীন, কিন্তু মানুষ দেখেছে তা ছিল আওয়ামী লীগের অধীনে স্বাধীন।
আওয়ামী লীগ যেভাবে চেয়েছে, বিচারকাজ সেভাবেই চলেছে। কাউকে জামিন দেওয়া বা শাস্তি দেওয়া ক্ষমতাসীন দলের অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করত। ফলে এখানে বড় ধরনের সংস্কার আনা অপরিহার্য। তা না হলে মানুষের আস্থা ফিরবে না।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অপরাধপ্রবণতার নেপথ্যে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যায়। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার শূন্যতা প্রথম কারণ। দ্বিতীয় কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবলের অভাব।
চলমান অপরাধপ্রবণতার তৃতীয় কারণ সুবিচার নিশ্চিত করতে আইনের প্রতি মানুষের সাময়িক অনাস্থা এবং অপরাধীদের সুযোগ গ্রহণ। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার অভাব ও সুবিচার নিশ্চিত করতে আইনের প্রতি মানুষের অনাস্থা রয়েছে। এ কারণে মানুষের মধ্যে আইন ভঙ্গের প্রবণতা বেড়ে যায়। অপরাধীরা এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হত্যা, ডাকাতি, দস্যুতা ও অপহরণের মতো অপরাধ করছে।
তা ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দখল-চাঁদাবাজি ও সহিংসতাও অপরাধপ্রবণতার বৃদ্ধির কারণ। রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, লুটপাট ও দখল-চাঁদাবাজির কারণে অপরাধের হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। কিন্তু কারণ জানলেই তো মানুষ স্বস্তি পাবে না। জনগণ চায় কারণগুলো দূর হোক আর সমাজে শৃঙ্খলা এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসুক।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)



