
‘হাওয়া’ খ্যাত পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনের নতুন রূপক-আখ্যান ‘রইদ’ মুক্তি পাচ্ছে উত্তর আমেরিকার ২০ অঙ্গরাজ্যে
হুমায়ূন কবীর ঢালী
২৪ জুন, ২০২৬ বুধবারের সন্ধ্যাটি ছিল একটু অন্যরকম। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের সানাই রেস্তোরাঁয় যেন এক চিলতে বাংলাদেশ। প্রবাসের কর্মব্যস্ত দিন শেষে সেখানে জড়ো হয়েছেন চলচ্চিত্র অনুরাগী, সাংবাদিক আর সংস্কৃতি কর্মীরা। উপলক্ষ—‘হাওয়া’ খ্যাত পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনের নতুন রূপক-আখ্যান ‘রইদ’-এর উত্তর আমেরিকা মুক্তি উদযাপন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ‘বায়োস্কোপ ফিল্মস’-এর ৫৫তম পরিবেশনা হিসেবে ছবিটি মার্কিন মুলুকে পা রাখছে, আর সেই বিশেষ মুহূর্তটিকে বরণ করে নিতেই আয়োজন করা হয়েছিল এই প্রাণবন্ত আড্ডা ও নৈশভোজের।
২৯ মে ২০২৬ বাংলাদেশে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই ‘রইদ’ নিয়ে আলোচনা চলছিল। ‘হাওয়া’র আকাশচুম্বী সাফল্যের চার বছর পর মেজবাউর রহমান সুমনের এই প্রত্যাবর্তন ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাড়া ফেলেছে। বিখ্যাত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যাম’-এর ৫৫তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা ‘টাইগার প্রতিযোগিতা’-এ অফিশিয়ালি নির্বাচিত হয়েছিল ১০৯ মিনিটের এই রহস্যধর্মী চলচ্চিত্রটি। শুধু তাই নয়, আমেরিকার মর্যাদাপূর্ণ ‘সিয়াটল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ (SIFF)-এর ‘এশিয়ান ক্রসরোডস’ বিভাগেও জায়গা করে নিয়েছে ছবিটি।
সানাই রেস্তোরাঁর ইনফরমাল আড্ডায় বায়োস্কোপ ফিল্মসের কর্ণধার রাজ হামিদ ‘রইদ’ নিয়ে তাঁর মহাপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি এক রোমাঞ্চকর ঘোষণা দিয়ে জানান যে, আগামী ২৬ জুন থেকে আমেরিকার ২০টি অঙ্গরাজ্যের ৩১টি প্রেক্ষাগৃহে একযোগে প্রদর্শিত হবে ‘রইদ’। প্রবাসের মাটিতে বাংলা চলচ্চিত্রের এই জোয়ার সত্যিই গর্ব করার মতো। রাজ হামিদ এ সময় শোনালেন ছবিটির পেছনের অবিশ্বাস্য প্রস্তুতির গল্প। সিলেটের এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় কীভাবে ছবির সুবিশাল সেট নির্মাণ করা হয়েছে, কীভাবে চিত্রনাট্যের দাবি মেনে নিখুঁত পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে—তা উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে।
সাদ ও তাঁর পাগল স্ত্রী, আর তাদের বাড়ির পাশের এক নিঃসঙ্গ তালগাছ—এই তিন উপাদানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে ‘রইদ’-এর গল্প। রাজ হামিদ মনে করিয়ে দেন, বাইরে থেকে এটি একটি প্রেমের গল্প মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের পুরোনো এক চিরন্তন আখ্যান। তবে এই পুনর্নির্মাণ সময়ের বর্তমানকে নয়, বরং অনুভূতির বর্তমানকে ধারণ করে। চলচ্চিত্রটির প্রতিটি স্তরে মিশে আছে চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের কল্পনায় ধরা গ্রামীণ বাংলার সেই পেশিবহুল, মাটির কাছাকাছি থাকা আবহ ও জীবনবোধ। বঙ্গ বিডি ও ফেসকার্ডের প্রযোজনায় এই ছবির কাহিনি লিখেছেন মেজবাউর রহমান সুমন ও সেলিনা বানু মনি। আর চিত্রনাট্যে সুমনের সাথে কলম ধরেছেন জাহিন ফারুক আমিন, সিদ্দিক আহমেদ ও শুকর্ণ শাহেদ ধিমান।
প্রসঙ্গত, চলচ্চিত্র গবেষক বিধান রিবেরুর একটি গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রণিদানযোগ্য। তাঁর মতে, ‘রইদ’ কেবল বিনোদন নয়, এটি মানবসভ্যতার এক মহাবৃত্ত। তিনি লিখেছেন, “‘রইদ’ চলচ্চিত্রটি মানবসভ্যতা, জীবন-মৃত্যু এবং নর-নারীর চিরন্তন আবর্তনকে এক মহাবৃত্তের রূপকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছে। ছবির মূল চরিত্র ‘সাধু’ ও নামহীন এক ‘পাগলী’—যারা মূলত আদি মানব-মানবী আদম ও ইভ এবং সেন্ট জোসেফ ও মারিয়ারই আধুনিক রূপক। এখানে নারীকে প্রথমত গৃহিণী, দ্বিতীয়ত কামিনী এবং শেষ পর্যন্ত দৈবশক্তির অধিকারী ‘ঈশ্বরী’ বা আদি প্রকৃতি রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। পাকা তালের মাটিতে পতনকে ‘গন্ধম ফল’ খাওয়ার আদি রূপক হিসেবে এবং ছাগল ভক্ষণের দৃশ্যকে উপনিষদের ‘অজা’ বা অনাদি প্রকৃতিকে নিজের ভেতর ধারণের আকুতি হিসেবে দেখানো হয়েছে।”
রইদ-এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নুর ইমরান ও নাজিফা তুষি। তাঁদের সাথে আছেন গুণী অভিনেতা গাজী রাকায়েতসহ আরও অনেকে। বিধান রিবেরুর ভাষায়, জোহায়ের মুসার আলো-ছায়ার চোখধাঁধানো চিত্রগ্রহণ এবং রশীদ শরীফ শোয়াইবের আবহ সঙ্গীত ছবিটিকে দৃশ্য ও সুরের এক অপূর্ব গীতল আবহে রূপ দিয়েছে।
জ্যাকসন হাইটসের সানাই রেস্তোরাঁর এই সন্ধ্যাটি যেন শুধু একটি ছবির প্রচারণাই ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বমঞ্চে বাংলা সিনেমা’র রাজকীয় অভিযাত্রার এক আনন্দঘন দলিল। আগামী ২৬ জুন থেকে উত্তর আমেরিকার প্রেক্ষাগৃহগুলোতে ‘রইদ’ দেখার জন্য এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন প্রবাসী বাঙালিরা।



