
মানুষের মানচিত্র
জাকির হোসেন
ফয়েজ ভাইয়ের চলে যাওয়া: ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, ফয়েজ ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। জন্ম ১৯২৮ সালের ২ মে। বেঁচে ছিলেন প্রায় ৮৪ বছর। কর্মে ও সৃষ্টিতে ব্যস্ত ছিলেন জীবনের প্রায় সারাটা সময়। শেষ দিকে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন ফয়েজ ভাই। কথা প্রসঙ্গে প্রায়ই বলতেন, ‘শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। বেশিক্ষণ কথাবার্তা বলার ক্ষমতা শারীরিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। চোখের গ্লুকোমা অপারেশন হয়েছে দু’বার। দ্রুত হার্ট অপারেশন করতে যেতে হয় ছিল ব্যাঙ্গালুরে। বাম পায়ের হাঁটুতে চিরস্থায়ী রোগ বাসা বেঁধেছে। স্মৃতির অধিকাংশ সময় হঠাৎ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে অতীতের অনেক ঘটনা মনে জেগে ওঠে। তখন পারলে নোট রাখি, নইলে অনুলেখকের জন্য বক্তব্যটা রেখে দিই। তাছাড়া আরও একটি রোগ আমাকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে, বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারি না। এখন আমি ইব্রাহিম কার্ডিয়াকের একজন বয়স্ক চিকিৎসাধীন রোগী। তারপরও কোনও অনুষ্ঠানে যাই না তা নয়; তবে অল্পক্ষণ বসতে হয়। আর অভ্যাসের ছড়া লিখি। মাঝে মাঝে নিবন্ধ ও প্রবন্ধও লিখছি। তবে তা একান্ত অনুরোধে।’
ঢাকা শহরে ফয়েজ ভাইয়ের কোনও নিজস্ব বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট ছিল না। ধানমন্ডির যে বাসায় থাকতেন সেখানে বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ দেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ফয়েজ ভাই কম ভাড়ার বাসা খুঁজতে শুরু করেন। এ দায়িত্বের খানিকটা তিনি তাঁর প্রিয় শিষ্য সাংবাদিক আতাউস সামাদ এবং সর্বকনিষ্ঠ শিষ্য হিসেবে আমাকেও দিয়েছিলেন। আমি বাসা খুঁজতে শুরু করি এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মোজাম্মেল হক তারা ভাইকেও বাসা খুঁজতে বলি। তারা ভাই সেন্ট্রাল রোডে একটি বাসা ঠিক করেন। তবে ফয়েজ ভাইকে এ যাত্রায় আর বাসা বদল করতে হয় নি। এর আগেই তিনি চলে যান অন্য জগতের অভিযাত্রী হয়ে।
সেদিন ছিল সোমবার। ভোররাত চারটার দিকে বুকে ব্যথা অনুভব করেন ফয়েজ ভাই। হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। দ্রুত নেওয়া হয় হাসপাতালে। তবে চিকিৎসকদের তখন কিছুই করার ছিল না। ভোরের আলো ফোটার আগেই জীবনের পথপরিক্রমা শেষ করেন ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ খ্যাত ফয়েজ ভাই। ভোর ৫টায় তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। তৎক্ষনাৎ ফয়েজ ভাইয়ের সেল ফোন থেকে আমার ফোনে কল আসে। দুঃসংবাদের আশঙ্কায় আমি আতঙ্কিত হই। ফোন রিসিভ করতেই ভেসে আসে সোহেল ভাইয়ের কণ্ঠ। তিনি ফয়েজ ভাইকে দেখাশোনা করতেন। আমাকে জানান, ফয়েজ ভাই আর নেই। কথাটি শোনা মাত্রই চোখ ভিজে যায় জলে। ফয়েজ ভাইয়ের নানা কথা, নানা স্মৃতি হৃদয়কে তাড়িত করে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ফয়েজ ভাই বলেন, ‘এখন বাড়িতে একা একা প্রায়ই পুরনো দিনের ছবি দেখি। এসব ছবির অধিকাংশ মানুষ এখন আর বেঁচে নেই। আমার আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী, পরিচিতজনদের অনেকেই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি এখনও বেঁচে আছি। এখন সপ্তাহে দু’তিন দিন হাসপাতালে যেতে হয়। হাসপাতালে প্রায় প্রতিদিনই মৃত্যু দেখি, কান্না দেখি। আর ভাবি, এমনি করেই একদিন আমাকেও চলে যেতে হবে। আমারও যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। তুমি কয়েকটা দিন সময় করে বাসায় এসো। আমি তোমাকে ব্যক্তিগত কিছু কথা বলতে চাই। আমার মৃত্যুর পর এগুলো তুমি ‘ফয়েজ আহমদ’-এর অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার হিসেবে ছাপিও।’
কথাগুলো বলার সময় ফয়েজ ভাইয়ের কন্ঠে অকৃত্রিম আবেগ ফুটে ওঠে। এতে আমি ভীষণ আবেগ তাড়িত হই, আমার পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে অশ্রু সংবরন করা, আমার চোখ ভিজে যায় জলে। তথাপি ফয়েজ ভাইয়ের এই প্রস্তাব আমার পক্ষে মানা সম্ভব হয় নি। এ কারণে যে, ফয়েজ ভাইয়ের মৃত্যুর আগেই তাঁর মৃত্যুকে উপলক্ষ্য করে কিছু করা এবং তাঁর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ফয়েজ ভাইয়ের নানারকম দুঃখ ছিল, কষ্ট ছিল, অস্বস্তি ছিল। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি প্রায়ই এসব কথা বলতেন। কাছের মানুষেরা তাঁর প্রথম যৌবনের প্রেম-বিরহ, দুঃখ, কষ্টের কথা জানেন। এসব কথাই হয়ত বলতে চেয়েছিলেন। আবার ভাবি, অন্য কোনও কথা হয়ত ছিল যা তিনি কাউকে বলেন নি, আমাকে বলতে চেয়েছিলেন। আমি শুনতে রাজী না হওয়ায় তিনি হয়ত কষ্ট পেয়েছেন। পরস্পরবিরোধী এসব চিন্তা আমাকে দিশেহারা করে তোলে। নিদারুন মনোকষ্ট আমাকে পাগলপ্রায় করে তোলে।
চিরকুমার ফয়েজ ভাই ব্যক্তিগত সুখের কথা ভাবেন নি কখনও। সারাজীবন মানুষের জন্য গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত থেকেছেন। শীতের শেষে গ্রীষ্ম এলে মৌমাছিরা যেমন ব্যস্ত হয়ে ওঠে ফুলের বনে, তেমনি ব্যস্ত জীবন কাটিয়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত সংসারের মায়া কাটানো ফয়েজ ভাই তাঁর কর্মপরিন্ডলে গড়ে তুলেছিলেন এক বিরাট পরিবার। সেই পরিবারের সদস্যরাই তাঁর চিরপ্রস্থানে অন্তিম শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ব্যথাহত চিত্তে, অশ্রুসজল হয়ে।
সোমবার সকাল ১০টায় ফয়েজ আহমদের মরদেহ নেওয়া হয় তাঁর গড়া প্রিয় প্রতিষ্ঠান ধানমন্ডির গ্যালারি শিল্পাঙ্গনে। এরপর সকাল ১১টায় আনা হয় তার দীর্ঘদিনের সেকেন্ড হোম জাতীয় প্রেস ক্লাবে। এখানে বিভিন্ন স্তরের লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। বেলা ১২টায় প্রেস ক্লাব চত্বরে জানাজা শেষে ফয়েজ আহমদের মরদেহ নেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজিত বাংলা চত্বরে।এরপর নেওয়া হয় কমিউনিস্ট পার্টির কার্যালয়ে। তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী মৃতদেহ ঢেকে রাখা হয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা দিয়ে। পাশে রাখা হয় মার্ক্স ও এঙ্গেলস এর বই ও কমিউনিস্ট পার্টির মেনিফেস্টো। এখানেই অপরাহ্নের আলোয় ফয়েজ ভাইকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিয়ে বিদায় জানানো হয়। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে কমিউনিস্ট পার্টির কার্যালয়। মৃত্যুর প্রায় দশ বছর আগে ফয়েজ ভাই তাঁর চোখ দুটি সন্ধানীর আন্তর্জাতিক চক্ষু ব্যাংকে দান করার অঙ্গীকার করেন। তাঁর দান করা দুই চোখের দুই কর্নিয়া দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছে দুই অন্ধ যুবককে।
২৯ বছর বয়সী সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার তাজহারুল ইসলাম ও ২৫ বছর বয়সী ডাক্তার মোঃ সাইফুল ইসলাম এখন দেখতে পাচ্ছেন। তাঁদের চোখে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ফয়েজ আহমদের কর্নিয়া। ফয়েজ ভাই নিজের শরীরটাও দান করে গেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য। নিজেকে দান করার চেয়ে কঠিন কাজ জগতে কিছু নাই। মানুষের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ এবং দাতা হওয়ার সাহসী মানসিকতা ফয়েজভাই সহসা অর্জন করেন নাই। সেই যে শৈশবে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং মানুষের অধিকার অর্জনে নিজের নাম থেকে ‘চৌধুরী’ বাদ দিয়েছিলেন, সেই অঙ্গীকার অটুট আছে তাঁর মৃত্যুর পরও। ফয়েজ ভাইয়ের এই অঙ্গীকার আমাদের বলে দেয় যে, মানুষ মরে, কিন্তু মানবতার মৃত্যু নাই। মানুষের জীবনকে ঘিরে মানবতার এই অখন্ড প্রবাহ চলে বলেই মানবিক মূল্যবোধ কখনও নিঃশেষ হয় না।
তথাপি ফয়েজ ভাই এই চলে যাওয়া আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। মানুষের জীবনে অভাবের পূরণ আছে, কিন্তু ক্ষতির পূরণ নাই। তবু মাঝে মাঝে মনে হয় একটা গভীর ও গোপন মমতা দূর থেকে আমাদের জন্য মঙ্গল কামনা করছে। স্বার্থ ও বিদ্বেষে ভরা এই জগতে এর তুলনা নাই…
লেখক: সাংবাদিক



