গল্প

অচেনা দৃষ্টি

শাহানাজ পারভীন শিউলি


প্লিজ, একটু সরে দাঁড়ান তো দাদা! বিনয়ের সাথে কয়েকবার বলল নাজ। লোকটা কোনো কেয়ারই করছে না। নাজ এবার রেগে বলল, গায়ের ওপর এভাবে ঢলে পড়ছেন কেন? সোজা হয়ে দাঁড়ান তো। শুনতে পাচ্ছেন না?

লোকটা নড়েচড়ে দাঁড়াল। একটু পরে আবারও একই কাজ করল। প্রথমে নাজ ভাবছিল প্রচণ্ড ভিড়ে হয়ত এ রকম হচ্ছে। পরে খুবই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখল, আসলে তা নয়, মাঝে মাঝে লোকটা ইচ্ছে করেই নাজের পিঠ ছুঁতে চেষ্টা করছে। নাজ লোকটির মুখের দিকে তাকালেই লোকটি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকছে। এমন ভাব করছে, যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। নাজ এবার খুবই সতর্ক থাকল। লোকটি আবার যখন একই কাজ করল নাজ বলল, দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা! নাজ পায়ের হিল জুতা দিয়ে লোকটার পায়ের আঙুলের ওপর চাপ দিয়ে দাঁড়াল। লোকটি মাগো বলে সরে দাঁড়াল। নাজ তখন একটা সিটের পাশে জায়গা করে নিলো।
তার সামনের সিটে এক ভদ্রলোক বসেছিলেন। তিনি নাজকে বললেন, হ্যালো ম্যাম, আপনি এখানে এসে দাঁড়ান। উনি সামনের স্টেশনে নামবেন। লোকটির কথা মতো দাঁড়িয়ে নাজ জানালার পাশে একটা সিট পেয়ে গেল। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে সিটে বসে পড়ল।

লোকটা অনেক সুদর্শন। বয়স তেমন বোঝা যাচ্ছে না। মাথাভর্তি চুল, একটু লম্বা লম্বা। মাঝে মাঝে বাতাসে কপাল ঢেকে দিচ্ছে। হ্যান্ডসাম, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। অপূর্ব মায়াভরা চোখ।

এমন সময় এক বাদামওয়ালা এলো। লোকটি দুই প্যাকেট বাদাম কিনলো। এক প্যাকেট নাজের দিকে বাড়িয়ে বললেন, প্লিজ বাদাম খান। । ভয় নেই আমি খারাপ মানুষ নই। নাজ বাদামের প্যাকেটটি হাতে নিয়ে জানালার পাশে বসে প্রকৃতি দেখছে। লোকটি আবার বললেন, কী হলো? বাদামটা খাচ্ছেন না কেন? এমনভাবে আন্তরিকতার সাথে কথা বললেন, যেন নাজ কত দিনের চেনা। এরপর বলল, আপনার নামটি কিন্তু জানা হলো না।

আমার নাম নাজ।

আপনার?

অরুণ।

কি করেন আপনি?

ইঞ্জিনিয়ার।

অফিসে যাচ্ছেন বুঝি!

না, ঘুরতে যাচ্ছি।

আজ রবিবার। সাপ্তাহিক ছুটি।

প্রতি রবিবার আমি এখানে ঘুরতে আসি। লোকটি বললেন।

কোথায় নামবেন আপনি?

নাজকে প্রশ্ন করলেন।

চাকদহ, নাজ উত্তর দিলো ।

লোকটি বললেন, এখনও চারটা স্টেশনের পর। তারপর গুন গুন করে গান শুরু করল, ‘মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম।’

গান থামিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল অরুণ। নাজ বলল, এভাবে কী দেখছেন?

লোকটি বললেন, আপনাকে। খুব মায়াবী আপনি। আপনার মুখখানা কি মিষ্টি! পবিত্র। আপনাকে গভীরভাবে না দেখলে কেউ বুঝবে না।

নাজ হেসে দিলো।

অরুণ বলল, হাসলেন কেন? আমি কি হাসির কিছু বলেছি?

নাজ বলল, হেসেছি আপনার পাগলামি দেখে। মাত্র এটুকু সময়ে এত বড় সার্টিফিকেট দিলেন! শুনুন, এই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ মানুষকে চেনা।

ত্রিশ বছর একই সাথে, একই ঘরে থেকেও কেউ কাউকে চিনতে পারেনা। জগতে এমন মানুষও আছে।

তা হয়ত ঠিক বলেছেন। কিম্তু আমার চোখ আপনাকে চিনতে ভুল করি নি।

আপনি কি কবি? নাজ জিজ্ঞেস করল।

না। তবে কবিতা, গান পছন্দ করি।
নাজ অরুণের চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, কী মায়াবী চোখ! মনে হচ্ছে ‘শতজনমের প্রেম লুকিয়ে আছে ঐ চোখের গভীরতায়’। কী কালো ঘন পাপড়ি! মনে হচ্ছে প্রেমের সুরমা মেখেছে চোখের নিচে।

লোকটি বললেন, আপনি কবিতা ভালোবাসেন? যদি অনুমতি দেন তাহলে শোনাতে পারি।

নাজ বলল, আমার প্রিয় । কবিতা আমি ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি । লোকটি জীবনান্দদাসের ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি শোনালেন।

নাজ আরো অবাক হলো এত সুন্দর আবৃত্তি শুনে।

ইতিমধ্যে প্রায় পথ ফুরিয়ে এসেছে। লোকটি গম্তব্যে নামলো না। নাজ বলল, নামলেন না যে!

তিনি বললেন,আর একটু সময় থাকতে চাই, আপনার সাথে। পরের স্টেশনে নামবো, বলেই বুক পকেট থেকে একটা ছোট্ট প্যাড বের করে মোবাইল নম্বর ও ফেসবুক আইডি লিখে দিলেন। বললেন, যদিও কখনও মনে হয় তবে কল দেবেন। আর এই আইডিতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দেবেন। আপনার মিষ্টি মুখখানা হৃদয়ের গহীনে এঁকে নিয়ে গেলাম। অপেক্ষায় থাকব। বলেই লোকটি তড়িঘড়ি পালবাড়ি স্টেশনে নেমে পড়লেন।

ইতিমধ্যে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠলো। লোকটি মায়াবী চোখে নাজের দিকে তাকাতে তাকাতে হাত নাড়িয়ে বিদায় নিয়ে নেমে পড়লেন। নাজ মনে মনে বলল, অনেক না বলা কথা রেখে গেলাম আপনার দৃষ্টির গভীরে। নাজ লোকটিকে আর দেখতে পেলো না।

ট্রেনটি তিন মিনিট দাঁড়াল স্টেশনে। নাজ জানালায় মুখ বাড়িয়ে দেখল, চারদিকে লোকজন দৌড়াদৌড়ি করছে। একজনকে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে দাদা? ওখানে এত ভীড় কেন? লোকজন সব ছোটাছুটি করছে কেন?
একজন লোক জবাব দিলো, অ্যাক্সিডেন্ট। নাজের বুকের ভিতর যেন ধাক্কা দিলো।

আবার ট্রেন ছেড়ে দিলো।

তারিখটা ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। নাজ বাসায় ফিরল। সারাক্ষণ সেই দৃষ্টি । সে কিছুতেই ভুলতে পারছিল না। এভাবে সাতটি দিন কেটে গেল। নাজ কাগজটি বের করল। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিতে গিয়ে দেখে প্রোফাইল লক। নাজের ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। প্রোফাইল লক করা আইডি একদম পছন্দ করে না। এটা নীতিগতভাবে ঠিক নয়। তাই এ রকম ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট সে কখনও অ্যাকসেপ্ট করেনা। সে ভাবল, ফোন করে বকা দেবে। মোবাইল নম্বরটা নিয়ে ফোন করতে একটা মেয়ে ধরল।

নাজের গলার স্বর কাঁপছে। এক তো প্রোফাইলটা লক, তার ওপর আবার একটা মেয়েকন্ঠ। রেগেমেগে কিছু না বলেই ফোন রেখে দিলো। পরক্ষণে মেয়েটা আবার ফোন দিলো। নাজ তখন কিছুটা শান্ত, হ্যাঁ বলুন!

মেয়েটি বলল, আপনি কাকে চাইছেন? নাজ বলল, অরুণকে।

হ্যাঁ, আমার দাদা ভাই।

প্লিজ উনাকে একটু দেওয়া যাবে?

মেয়েটি খানিকটা সময় চুপ করে রইল। তার কন্ঠটা ভেজাভেজা মনে হলো। স্বরটা যেন অস্পষ্ট আর ভারি হয়ে উঠেছে। নাজ অস্থির হয়ে উঠল, বলুন কোথায় উনি? দেন না, প্লিজ।

মেয়েটি তখন সশব্দে কেঁদে ফেলল, দাদাভাই আর নেই। না ফেরার দেশে চলে গেছে।
নাজের গলা যেন শুকিয়ে যাচ্ছিল। তারপর জিজ্ঞেস করলো, কবে? কখন? কোথায়? কিভাবে?

মেয়েটি বলল, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি। প্রতি রবিবার দাদা ঘুরতে যায়। সেইদিন কি কারণে দাদা পালবাড়ি স্টেশনে নামলো আমরা কেউ জানি না। তিনটার দিকে ওই স্টেশনে অ্যাক্সিডেন্ট হয়। তারপর সব শেষ।

তাহলে ওই দিন যে অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটেছিল, ওটা উনি ছিলেন! নাজের বুঝতে কিছুই বাকি রইল না। তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। নাজ আকাশের দিকে তাকাল। একজোড়া মায়াবী চোখ যেন নাজের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। বড্ড অচেনা চাহনি। অচেনা দৃষ্টি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension