
হাসান পরিবারটি মুরাদের সমস্ত ধারণাকে, ভয়কে ভুল প্রমাণিত করেছিল সেদিন। অতিশয় ভদ্র, বিনয়ী আর বড়লোকি কোনো ছাপই পায় নি মুরাদ তাঁদের মাঝে। আনিকা, অসাধারণ একটি মেয়ে, যেমন মিষ্টি দেখতে তেমনই শিষ্টাচার। ছাত্রী খুব ভালো না হলেও খারাপও ছিল না। যদি একটু মনোযোগী হতো তবে আরও অনেক ভালো করতে পারত! আবার এও ভাবত, এত শান্ত মেয়ে মনোযোগী হয় না কিভাবে!
চুপচাপ, শান্ত স্বভাব কোনো হাসিও নয়, চোখ তুলে তাকাতও না। যদিও মুরাদ স্বস্তিবোধ করত বিষয়গুলোতে। মাস দুয়েক এভাবেই কেটে গেল…
অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল সেদিন, দিনটা মুরাদের চোখের সামনে আজও প্রাণবন্ত। সেদিন স্বপ্নাও ছিল সে বাড়িতে। আনিকা অদ্ভুত আচরণ করছিল। কেমন যেন অস্থির ছিল আপন মনেই। মুরাদের পড়াবার দিকে মনোযোগ দিতে পারছিল না, মুরাদ ভেবে নিল বাড়িতে কাজিন আছে, তার সাথেই হয়ত সময়টা কাটাতে চাইছে। মুরাদও ভাবল আজ আর বেশিক্ষণ পড়াবে না। স্বপ্নাও এলো এর মাঝে ট্রে হাতে, আনিকা লিখতে লিখতে আড়চোখে বোনের দিকে দেখেই মৃদু হাসল। সে হাসি লুকাতে কৌশলে অন্য হাতে মুখটা আড়াল করল।
মুরাদ সেটা লক্ষ্য করেই স্বপ্নার দিকে তাকাতেই দেখে, সে চলে যাচ্ছে। আনিকার এমন হাসির মর্মভেদ করতে পারল না। থেকে থেকে চাপা হাসি হাসছে নীরবে আনিকা। মুরাদ অবাক চোখে তাকেই দেখছিল। হঠাৎ মুরাদের দিকে চোখ পড়তেই আনিকা থতমত খেয়ে সোজা হয়ে বসল। ভারী কন্ঠেই বলেছিল, আজ এ পর্যন্তই থাক। পরের চ্যাপ্টার পরশু ধরব।আনিকা একটুক্ষণ নীরব থেকে মৃদু স্বরে বলল, কিন্তু আমার যে কাল একটা পরীক্ষা আছে,সে চ্যাপ্টারের উপর!
আমিও চেয়েছিলাম সেটা আজ ধরতে। কিন্তু আপনার মন তো আজ পড়ায় নেই, তাই বলছিলাম।
না তো! এমন কিছু না। আছে তো পড়াতে মন। আপনি ভুল বুঝেছেন।
আনিকার সেই দু’লাইন কথায় মুরাদ বেশ অবাকই হয়েছিল সেদিন। কথার চাইতে কথার ধরণে। সে যে এতখানি চঞ্চল স্বভাবের তা মুরাদ দীর্ঘ দু’ মাসেও উপলব্ধি করতে পারে নি। যে মেয়ে ‘হ্যা’ ‘না’ ছাড়া কোনো কথা বলে না, তাও নিরস ভঙ্গিতে…. সে মেয়ে এতটা সাবলীল আর চটপটে কথা, একদিনে তো শেখে নি! আর মুরাদ স্পষ্টই বুঝতে পারছিল এ আচরণই তার স্বাভাবিকতা। তাহলে সে মুরাদের সামনে দীর্ঘ দু’ঘন্টা সময় কি করে অমন স্থির বসে থাকে একটানা? আবার বলছে মুরাদ নাকি ভুল বুঝেছে! আনিকার অভিযোগে সে লজ্জাই বোধ করছিল। ভুল শোধরাতে নিচু স্বরে ‘স্যরি’ বলেছিল।
আনিকা হেসে বলেছিল, না না।ডোন্ট বি স্যরি।আপনি ঠিকই বুঝেছেন। পড়াতে মন নেই তা না। অন্য কিছুও চলছে আমার মাথায়। আর একসাথে দু’টো কাজ করানোটা ভেরি টাফ আমার জন্য।
মুরাদ বিস্ময়ভরে তাকিয়ে ছিল আনিকার দিকে। সেদিন সে প্রথম হেসেছিল তার সামনে। আর এত সহজভাবে কথা বলছিল, যেন এভাবেই কথা বলে অভ্যস্ত তারা! আনিকা চায়ের কাপটা তার সামনে এগিয়ে দিয়ে বই নিয়ে বসেছিল।
মুরাদ জানে না সেদিন কি হয়ে গেল। কিন্তু আনিকাকে হঠাৎই খুব আপন মনে হয়েছিল। যেন খুব কাছের কেউ সে— মন এটাই ভাবছিল।
সেদিনের পর থেকে আনিকার সাথে ভিন্নরকম এক আন্তরিকতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল মুরাদের। আনিকার চঞ্চলতা, দুষ্টামি ভরা কথা, হাসি মুরাদের সমস্ত বিষাদকে ভুলিয়ে অন্য এক জগতে নিয়ে যেত। আনিকা যে এতটা সুন্দর, সেও যেন হঠাৎই দেখতে পেল মুরাদ। স্বপ্নের মতো সময়গুলো কেটে যেত।
এরপর স্বপ্নার সাথে মাঝে মাঝে বাড়িতেও আসা শুরু করেছিল আনিকা। সম্পর্কটা শুধু শিক্ষক আর ছাত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। আনিকা কখনোই তাকে কোনো সম্মোধন করত না। স্যারও না, মুরাদভাইও না। সবার চাইতে ভিন্নই ছিল তার স্বভাব।
আনিকার ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হলো, মুরাদের পড়ানোও। কিন্তু মুরাদের মন যেন কিছুতেই মানতে চাইত না। ধীরে ধীরে কতখানি দুর্বল হয়ে পড়ছিল মুরাদ নিজেও বুঝতে পারে নি। আনিকার ঘনিষ্ঠতায়, আন্তরিকতায় মুরাদও ধরেই নিয়েছিল আনিকার মনেও তার প্রতি দুর্বলতা আছে। আনিকা আসত, কিন্তু স্বপ্নার সাথে। একা কখনোই আসত না, এসেই সারা বাড়ি মাতিয়ে ফেলত। সব বয়সের সাথেই তার সুন্দর সখ্যতার ক্ষমতায় মুরাদ মুগ্ধ হতো। এত বড়লোকের মেয়ে সে, অথচ তাদের বাড়িতে এসে ওদের মতোই থাকত। এই ভাঙা বাড়ির বাইরে কোটি টাকার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে এই রাজকন্যার জন্য। মুরাদের কষ্ট হতো যখন এসব বাস্তবতাগুলো বিচার করত। সহ্য হতো না এ ভেদাভেদ। মনে হতো জাদুমন্ত্রে যদি সে আনিকার যোগ্য হয়ে যেতে পারত! যদি এই ভাঙা বাড়িটা রাজপ্রাসাদ হয়ে যেত! তো এক্ষুনি আনিকার বাবার কাছে তাকে ভিক্ষে চেয়ে নিত! নিজের সুখ, আনন্দ, খুশিকে আনিকার বাবার পায়ে পড়ে হলেও চেয়ে নিত।
আনিকা, এই সেই নাম। যার সাথে মুরাদের ভবিষ্যতের রঙিন সব স্বপ্ন জড়িয়ে ছিল। মরিয়া হয়ে উঠেছিল মুরাদ নিজেকে তার যোগ্য করে তুলবার। মুরাদ সার্থকও হয়েছিল। আনিকা মাস্টার্স কমপ্লিট করতে করতে মুরাদ তার লক্ষ্যে পৌঁছেও গিয়েছিল। বাড়িটাও প্রায় কমপ্লিট। মনে মনে ভেবেও রাখল, আনিকার ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হলেই তাকে প্রপোজ করবে। মুরাদের দৃঢ় বিশ্বাস আনিকা জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলবে।
কিন্তু আনিকা নিজেই একদিন মুরাদের সমস্ত স্বপ্ন আর আশাকে ভেঙে চুরমার করে দিল। আনিকার পরীক্ষা শেষ, স্বপ্নার সাথে সেদিন এল। মুরাদ ভাবল,আজই সে বলবে আনিকাকে। মনে অনেক সাহস জোগাড় করে ওর সামনে গিয়ে বলল, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
আনিকাও দারুণ উচ্ছ্বাসে পাল্টা বলল, হোয়াট আ কোইন্সিডেন্স! আপনার সাথেও আমার কিছু কথা আছে। ভেরি ইমপর্টেন্ট। কে আগে বলবে? আপনি না আমি! আমি আগে বলি? প্লিজ…
শিওর, বলো।
মুরাদ বিগলিত হাসিতে বলেছিল। যেন সে তো জানেই, আনিকা কি বলবে! আনন্দ ছেয়ে গেল দু’জনার চোখেই। মুরাদ পুলকিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল, আনিকার কথা শোনার পর ‘হ্যা’ বলার জন্য।
আনিকা মহা উৎসাহে বলল, আমি যা বলবো,তা শোনার পর কিন্তু আমাকে বাজে,পাকা ভাববেন না!
অত ভণিতা দরকার নেই। আমি কিছু ভাবতেই পারব না শোনার পর আনিকা। শুধু জবাব দেব। মুরাদ সুখের এক হাসি হেসে জবাবে বলেছিল।
আনিকা সমান আগ্রহে আবার বলল, স্বপ্না আপুকে আপনার কেমন লাগে?
এর মাঝে স্বপ্না এলো কেন!
মুরাদ হতবাক প্রশ্ন করেছিল।আনিকা সামান্য বিরক্ত হয়ে আবার হেসে বলল, আরেএএ! যাকে নিয়ে ঘটনা সে আসবে না তো কে আসবে! আমি? বলুন না? স্বপ্না আপুকে আপনার পছন্দ কিনা?
মুরাদের হাসিটা মুহূর্তে মিলিয়ে গিয়েছিল। স্থির দৃষ্টিতে আনিকার দিকে তাকিয়ে ছিল কতক্ষণ, ধীর কন্ঠে বলল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আনিকা!!
এতে না বোঝার কি হলো? স্বপ্না আপু আপনাকে ভালোবাসে। অদ্ভুত বোকা তো আপনি! এতদিনে এ সামান্য বিষয়টা চোখে পড়ল না! আপনাকে পটাবার জন্য পাঁচটা মাস আমাকে আপনার ছাত্রী হয়ে থাকতে হলো। কিচ্ছু বোঝাতে পারলাম না। দেখেছেন কোথাও? অনার্সের ছাত্রী বাড়িতে প্রাইভেট পড়ছে স্কুলের বাচ্চাদের মতো? তারপর আপনাদের বাড়িতেও আসা-যাওয়া করতে শুরু করতে হলো, শুধু এই বোঝাতে। কিন্তু আর এসবের সময় নেই। স্বপ্না আপুর বাসায় পাত্র দেখা চলছে বহুদিন ধরে। এবার নাকি বাছাইও করে ফেলেছে একজনকে। কিন্তু স্বপ্না আপু আপনাকে পছন্দ করে। এবার জলদি করে ‘হ্যাঁ’ বলে দিন তো। আপুকে সুখবরটা দিয়ে মুক্তি নেই এসব থেকে।
তুমি স্বপ্নার জন্য এতদিন ধরে এসব করছিলে!
নয়ত কি? বোনের ভালোবাসার জন্য এটুকু করতে পারব না? আমি জানি, আপনিও আপুকে পছন্দ করেন। তারপরও স্বপ্না আপু এত ভীতু যে কি বলব! শুধুই ভয় পায়। তাই তো আমাকে ঘনিষ্ঠ হতে হলো আপনাদের। এবার বলুন, ‘হ্যাঁ’ কিনা?
একটু ভাববার সময় দাও আমাকে।
অস্ফুটস্বরে জবাব দিয়েছিল মুরাদ। আনিকা বিরক্ত হয়েছিল তাতে। তারপরও সহজভাবে বলল, দিলাম। শুধু আজকের রাতটা। দু’দিন পর আপুকে পাকা দেখা দেখতে আসবে। আপনার জবাবের ওপর সেটা নির্ভর করে আছে।
ধরো, যদি জবাব ‘না’ হয়? তো তোমার সাথে কি এই বন্ধুত্বর সম্পর্ক থাকবে?
জবাব হ্যাঁ বা না যাই হোক। আমি কোনো অবস্থাতেই থাকছি না।
কেন! এত আন্তরিকতা, ঘনিষ্ঠতা সেসব কিছুই না তোমার কাছে?
সে সবই ছিল স্বপ্না আপুর জন্যে। আমি আমার ব্যক্তিগত কোনো তাগিদে বা ইচ্ছায় করি নি। তবে হ্যাঁ, কিছু যদি হয় আপনাদের মধ্যে তাহলে আত্মীয়ের একটা সম্পর্ক তো হবেই। না হলে কিছুই না, আচ্ছা? আপনি কি যেন বলতে চেয়েছিলেন আমাকে…
কিছু না। ভুলে গেছি। মনে পড়ছে না। তাহলে কি আমাদের সাথে তোমার সম্পর্ক আজ এখানেই শেষ?
হ্যাঁ। সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না!
রাখা যায় না কোনোভাবেই??
সম্ভবই না। আমরা আগামী সপ্তাহে একেবারে আমেরিকা চলে যাচ্ছি। বড় ভাইয়ার কাছে।
সেই শেষ আনিকার সাথে মুরাদের দেখা এবং কথা। তার পরের সপ্তাহে সত্যিই আনিকা বিদেশ পারি দিল। আর মুরাদ সময়ের কাঁটা ধরে তার স্মৃতি আগলে থেমে গিয়েছিল। স্বপ্নাকে সে বিয়ে করে নি। আনিকাকেও ভুলে যায় নি কখনো। কিছু বছর বাদে জেনেছিল, আনিকার বিয়ে হয়ে গেছে। সুখে আছে, ভালো আছে। তা জেনে মুরাদও নিজের সুখ খুঁজে নিয়েছিল। জীবন কাটানো প্রয়োজন কাটিয়ে যাচ্ছে। সকল সুখের কামনা তো শুধু আনিকার জন্যেই। কষ্ট বয়ে বেড়াবার ভার তো মুরাদ একলাই নিয়ে রেখেছে। সেদিন থেকেই।



