
আজকের দিনটা কেবল মায়ের জন্য
মা এই শব্দটি এত শান্তির যে মনের অজান্তেই উচ্চারিত হয় ‘মা’। সব দুঃখ-কষ্ট লাঘব করে দেয় এ শব্দটি। সন্তানের মুখে এই ডাকেই একজন নারী পান তার জীবনের সর্বোচ্চ সম্মান। সৃষ্টির সেই আদিলগ্ন থেকে মধুর এই শব্দটা শুধু মমতার নয়, ক্ষমতারও যেন সর্বোচ্চ আধার? মার অনুগ্রহ ছাড়া কোনো প্রাণীরই প্রাণ ধারণ করা সম্ভব নয়। তিনি আমাদের গর্ভধারিণী, জননী। মা শব্দটির মূল্য কত-যাদের মা এ পৃথিবীতে বেঁচে নেই, সেই অভাগা সন্তানরাই ভালো করে বুঝতে পারে। মা বলে না ডাকার সে কী কষ্ট-বেদনার তা ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বুঝছি। এই দিনটিতেই মাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। মায়ের চলে যাওয়ায় ভেতরটা ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সারাক্ষণই মনে হয় কী যেন নেই। কিছুদিন থেকেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলাম না-কারণ ৮ মে রোববার মা দিবস। মাকে নিয়ে কিছু লিখতে হবে। যতবারই লিখতে বসেছি, চোখে পানি এসেছে। ঝাপসা চোখে কেবল মায়ের মুখখানিই ভেসে উঠেছে। কী লিখব জানি না। শুধু জানি মাকে খুব মনে পড়ে, অসম্ভব রকম মনে পড়ে।
কেউ কেউ বলবে- মাকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিনের হয়তো কোনো প্রয়োজন নেই? তারপরও আধুনিক বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার ‘মা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে, যার সূত্রপাত ১৯১৪ সালের ৮ মে। তবে বিশেষ একটি দিন যদি শুধু মায়ের জন্য হয়, তাহলে মন্দ কী। বিশেষ মানুষটির জন্য বিশেষভাবে না হয় দিনটি কাটানো যাবে। আমাদের যাদের এ পৃথিবীতে মা নেই, তারা মাকে স্মরণ করে বেশি বেশি দোয়া করব। তাই তো আজ মাকে খুবই মনে পড়ছে।
মা- বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে যেমনটি করে চারটি সন্তানকে লালন-পালন করেছে, সেটি আমার দৃষ্টিতে খুবই নজিরবিহীন। আমি তখন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। বাড়িতে তুমি একা; বড় ভাই আর মেঝো ভাই দুজন চাকরি শুরু করেছিল; ছোট বোন কাকনেরও বিয়ে হয়েছিল; এর ভেতরে আমাদের কখনো বাবার অভাব বুঝতে দাওনি। তুমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে। ফজরের নামাজ শেষ করে পুরো বাড়িটির আঙিনা নিজের হাতে ঝাড়ু দিতে। পুকুরঘাটে গিয়ে থালাবাসন ধুয়েমুছে সাফ করতে। নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ ছিল তোমার। ২০১১ সালে তুমি ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি করে অপারেশন করা হলো। ক্যামোথেরাপি দেওয়া হলো। তোমার জন্য বাসা নিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে। যেখানে থাকতে তুমি খুবই পছন্দ করতে। আমার জন্য রান্না করে একসঙ্গে খাবারে জন্য বসে থাকতে। এভাবে চলতে লাগল।
তারপর ২০১৫ সালে আবারও তোমাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। এবার ধরা পড়ল ব্লাড ক্যানসার। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েও তুমি ছিলে সব সময়ই হাসিখুশি। তাই তো তুমি যেদিন এ পৃথিবী থেকে একেবারে চলে যাবে-সেদিন সকালে ডাক্তার আমাকে বলেছিল-তোমার মা সব সময় হাসিখুশি। আজ তার হাসি নেই। সেদিন তোমার মুখখানা যত দেখেছি, মনে হচ্ছে তুমি আমাকে দেখে হাসছ আর বলছ, বাবা আমি ভালো আছি-তুই বাসায় চলে যা। আমার জন্য আর কত কষ্ট করবি! আমি হাসপাতালে থাকতে পারব। সত্যিই মা সেদিন তোমার মুখখানি ছিল হাস্যোজ্জ্বল। সেদিন বলেছিলে, আমরা সবাই যেন একসঙ্গে মিলেমিশে থাকি।
হাসপাতালে প্রথম ক্যামোথেরাপি শেষের দিকে যখন মাকে জিজ্ঞাসা করতাম-মা থেরাপি শেষ হলে তুমি কার বাসায় যাবে? তখন মা বলত-আগে নাজুর বাসায়, তারপর তোমার বাবার বাড়ি, এরপর হামিদ খালুর বাসায়। আত্মীয়স্বজনের বাসা ঘুরে আবার যখন হাসপাতালে দ্বিতীয় ক্যামোথেরাপি দেওয়ার জন্য ভর্তি করলাম তখন মাকে বললাম-থেরাপি শেষ হলে তুমি কোথায় বেড়াতে যাবে? এবার মা বলেছিল-বাড়িতে যাব। বাড়িতে ঠিকই গেলে-তবে জীবিত নয়-লাশ হয়ে। আজ চারপাশে তোমার স্মৃতিগুলো বারবার মনে করিয়ে দেয়, তুমি নেই। বিশেষ করে বাড়িতে যখন যাই তখন নাবিল, রাফা, রুহির, রাহাত, তাইয়্যেব তাওহিদ এদের মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায় তুমি নেই, চলে গেছো তাদের একা ফেলে।
সত্যি মা, তোমার সন্তানরা আজ খুব একা। সবার ইচ্ছা থাকে বিয়ের সময় মা-বাবার আশীর্বাদ নিয়ে বিয়ে করতে যাবে। কিন্তু মা- আমি সেটা পারিনি। তুমি চলে যাওয়ার পর ২০১৫ সালের ১৬ অক্টোবর বিয়ে করলাম শাকিলাকে। ২০১৮ সালের ২২ এপ্রিল আমি কন্যাসন্তানের বাবা হলাম। আজ আমার মেয়েকেও একা একা বাসায় থাকতে হচ্ছে। আমার মেয়েও এখন বুঝতে শিখছে। আনিসা এখন প্রায়ই বলে, আমার দাদা-দাদু আল্লাহর কাছে চলে গেছে। ঈদের আগের দিন আনিসা আমাদের বাড়িওয়ালার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে বলে, জানো আমার দাদু মারা গেছে। তাই আমাদের গ্রামের বাড়িতে যেতে পারি না। আরও বলে, আমি তো কাউকে দাদু বলে ডাকতে পারছি না। আনিসা দোয়া করে, আল্লাহ আমার দাদা-দাদুকে বেহেশতবাসী করো। তোমাদের সে খুবই মিস করে মা।
আজ আমার সত্যিই খুবই গর্ব হচ্ছে মা, আমার বউ ডাক্তার হয়েছে। আমি চেয়েছিলাম আমার বউ ডাক্তার হবে। কারণ আমার বাবা-মা দুজনই কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মারা যায়। আল্লাহপাকের ইচ্ছা এবং সঙ্গে তোমার দোয়া- সে ডাক্তার হয়েছে। রোগীদের সেবা করছে। গ্রামে গেলেও এলাকার লোকজন এসে সেবা নিচ্ছে। আর বলছে, আজ যদি তোমরা বেঁচে থাকতে তাহলে কত না খুশি হতে। তোমার আদরের নাতি নাবিল ক্যাডেটে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাফা, রুহি, রাহাত, তাইয়্যেব- এরা স্কুলে যাচ্ছে।
মাগো, এখন তো মনকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারি না। তুমিহীনা সেই ঘরে আর যেতে ইচ্ছে করে না। আমরা কেউ বাড়িতে যাচ্ছি শুনলে আগেই বাড়ির সামনে দৌড়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে। আমি বাড়ির কাছে রাস্তা থেকে মা মা বলে চিৎকার করে ডাকতাম। এখন আর ডাকতে পারি না। কষ্টে বুকটা মুচড়ে ওঠে। বলতে পারো, আমার এই কষ্টের শেষ কোথায়? এবার যখন রংপুরে একা একা ঈদ করলাম, সে কী কষ্ট পেয়েছি মা, কাউকে বোঝাতে পারিনি। শুধু বুক ফেটে কান্না এসেছে।
মাগো, তোমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ ছিল মানুষকে খাওয়ানো। মাগো, তোমার পিঠা বানানোর কথা, খিচুড়ি রান্নার কথা-তোমার মৃত্যুর পর সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছে। তোমার উদার দানশীল মন-মানসিকতার জন্য সবাই তোমাকে খুব পছন্দ করত। জানো মা, তুমি চলে যাওয়ার পর সবাই প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ তোমাকে, তোমার সুকর্মগুলোকে স্মরণ করে। যখনই গ্রামে যাই সবার কাছে শুধু তোমার প্রশংসা শুনি। তখন গর্বে আমাদের বুক ভরে যায়।
তুমি আমাদের মাঝে নেই ভাবতে বড় কষ্ট লাগে। কারণে-অকারণে কত না কষ্ট দিয়েছি তোমাকে। কখনোই শান্তি দিতে পারিনি, হয়তো বা জীবনভর শুধু উৎকণ্ঠা আর সীমাহীন দুশ্চিন্তায় কেটেছে তোমার অনেকটা সময়। বলতে দ্বিধা নেই, তুমি ছিলে সৃজনশীল শৈল্পিক মনের একজন সরল-সাধারণ মানুষ। সেজন্য সন্তান হিসেবে আমরা গর্বিত। আমি সব সময়ই দোয়া করি, আল্লাহ যেন তোমার গুনাহ মাফ করে ভালো কাজগুলোর প্রতিদান দেয়। আর আমরা যদি কোনো নেককাজ করে থাকি, এর প্রতিদানও যেন তোমায় দান করে মহান আল্লাহ।
মা দিবসের এই দিনে বিশ্বের সব মমতাময়ী মাকে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা।
লেখক: উপপরিচালক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়



