বইয়ের কথাসাহিত্য

সেইসব অমৃত পৃষ্ঠায়

রাহাত খান

যারা পড়েন, তারা এক জীবনে কত রকমের বই-ই না পড়েন। আমিও ছোটবেলা থেকে প্রচুর বই পড়েছি। কত রকমের সে বই! কৈশোরের যে পড়াশোনা- ডিটেক্টিভ বা অ্যাডভেঞ্চারের বই, নানা রকমের গোয়েন্দা সিরিজ।

তখন অনেক লেখকই এসব লিখতেন। মোহন সিরিজ, ফেলুদা সিরিজ- এমন নানা রকম গোয়েন্দা সিরিজ। কিন্তু স্কুলের উঁচু ক্লাসে উঠে সৌভাগ্যক্রমে বড় বড় লেখকের বই পড়েছি। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনি দা’র গল্প। প্রেমেন মিত্তিরের ঘনা দা’র গল্প। তারপর শিবরাম চক্রবর্তীর বই। এদের বই না পড়লে আমাদের শিশুসাহিত্যের জগৎটা, এর সমগ্রটা উপলব্ধি করা যায় না।

আমাদের সময়ে সব শহরেই পাড়ায় পাড়ায় একটা লাইব্রেরি আর একটা ব্যায়ামাগার থাকতো। এগুলো এখন একদম উঠে গেছে। আমি ময়মনসিংহ শহরে পড়েছি। সাহিত্যের জন্য লেখালেখির যে আগ্রহ এবং রসবোধ তৈরি হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি এসবের জন্য বইও ততটাই জরুরি।

যে বই পেয়েছি, সেটিই পড়েছি। এখন সেসবের অনেকগুলোরই নাম মনে করতে পারি না। তবে লেখক এবং পড়ার অনুভূতিগুলো মনে লেগে আছে।

আমরা শরৎচন্দ্র পড়েছি স্কুলের শেষের দিকে বা স্কুল পার করে কলেজে ওঠার সময়টাতে। তবে সেই সময়ে এমন কিছু কিছু বই পড়া নিষিদ্ধই ছিল। যেমন ‘চরিত্রহীন’ নামে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যে বইটা, বলা যায় এর নামের কারণেই অভিভাবকদের রোষের মুখে পড়েছিল। তখনও পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বই পড়া অনেকটা নিষিদ্ধ ছিল। তবে আমরা নানাভাবেই পড়তাম। লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। কিছু কিছু লেখক আছেন, যারা আমার শুধু যে প্রিয় তাই নয়, মানসিক ভিতটাও গড়ে দিয়েছিল তাদের বইগুলো। এটা দু’ভাবেই হতে পারে। একটা হচ্ছে যে বই পড়ে, আরেকটা হলো পরিবেশ।

ময়মনসিংহ শহরে অনেক গ্রন্থাগার ছিল। যথাসম্ভব বই পড়েছি শুরু থেকেই। লেখকদের ব্যক্তিগত যে অভিজ্ঞান- তারই তো প্রতিফলন এই বই।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় যে এত ভালো ছোটগল্প লিখেছেন, সেটা পড়ে আরও একটু বয়স হলে বুঝেছি। তারপর সুবোধ ঘোষ- এখন পর্যন্ত বাংলা ছোটগল্পের যে প্রধান ধারা, তাতে এবং রবীন্দ্রনাথের পর উল্লেখ করার মতো যে ক’জন ছোটগল্পকার ছিলেন, তার মধ্যে সুবোধ ঘোষ ছিলেন আমার সবচাইতে প্রিয়। সুবোধ ঘোষ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত। অচিন সেনগুপ্তের প্রথম বইটি ‘বেদে’। এটি একটি অসাধারণ সৃষ্টি। রাবীন্দ্রিক যুগের বিরুদ্ধে চল্লিশের লেখকদের যে বিদ্রোহ, সে বিদ্রোহের অন্যতম সেরা ফসল হচ্ছে ‘বেদে’ উপন্যাসটি। বিদ্রোহ যে খুব সফল হয়েছিল তা আমি বলবো না। তবে একটা পরিবর্তনের জোয়ার স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো। এই চল্লিশেই তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব। মানিক বিভূতিভূষণ এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়- এদের কথা তো আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। তবে এদের মধ্যে আমার কাছে সেরা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তার নিভৃতির প্রতি যে আকর্ষণ এবং প্রকাশক্ষমতা- তার তুলনা হয় না।

বিভূতিভূষণের জীবন আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় মনে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে এবং যখন অধ্যাপনা করি- তখন রুশ সাহিত্যের ধ্রুপদিগুলো পড়েছি। আন্তন চেখভ, টলস্টয়, দস্তয়ভস্কিসহ অনেকের লেখার সঙ্গেই তখন পরিচয়। কী বিশাল সেই জগৎ। আমি যেন বাংলার নদী-মাঠ-জীবন পেরিয়ে আরেকটা জগতে প্রবেশ করলাম। রাশিয়ান সাহিত্যের রত্নভাণ্ডার সমস্ত পৃথিবীকেই যেন আলোড়িত করছে তখন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়- রাশিয়ান সাহিত্যের এমন উজ্জ্বল ধারাও স্তিমিত হয়ে গেল। কারণ মার্ক্সবাদ বা কমিউনিজম প্রবর্তিত হওয়ার পরে খুব বড় লেখক রুশ সাহিত্যে নেই। রুশ সাহিত্যের যা গৌরব, তা কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার আগেই। এর একটা কারণ হচ্ছে, কমিউনিজমে ব্যক্তিমানুষকে বর্জন। আমিত্বের কোনো জায়গা নেই কমিউনিজমে।

তারপর সুযোগ হলো আমেরিকান সাহিত্যে প্রবেশ করার। ফরাসি ও ল্যাটিন সাহিত্যের সাথেও তখনই গভীরভাবে পরিচয় হওয়া শুরু হলো। অসাধারণ সেই সময়। আমি একের পর এক বই পড়ছি- অসাধারণ সেই সব দিনের অনুভূতি। আমি বিভোর হয়ে থাকতাম। এখনও পড়ি।

আমার খুব প্রিয় লেখক হচ্ছেন দস্তয়ভস্কি। আমি মনে করি যে, বিশ্বসাহিত্যে কবিতা বা নাটকে শেক্‌সপিয়রের যে স্থান- দস্তয়ভস্কির একই স্থান হওয়া উচিত গদ্যসাহিত্যে। তিনিও সামন্তবাদী পরিবারের ছেলে, খুব জুয়া খেলতেন। দিনের শেষে বাসায় ফিরতেন একটা বা দুটো মোমবাতি আর পয়সায় কুলালে সামান্য কিছু খাবার-দাবার নিয়ে। দস্তয়ভস্কি ছিলেন যেন ‘দোধারি মোমবাতি’। শারীরিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছেন, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। লিখতেন বঞ্চিত, অসহায়দের নিয়ে। মজার ব্যাপার হলো- রুশ সাহিত্যে চিরকালই যেন এই ধারাটাই বিরাজ করেছে। মিখাল শলকভের লেখাও যদি দেখি- সেখানেও দেখা যাবে একই ধারা। শোষিতদের নিয়েই।

টলস্টয়ের পরিবার ছিল বিশাল জমিদার। সৌভাগ্যক্রমে তার বাড়িতেও আমি গিয়েছিলাম। বিশাল বাড়ি। কিন্তু তিনিও সেই নির্যাতিতদের নিয়েই লিখেছেন। নারীদের প্রতি বৈষম্য নিয়ে লিখেছেন, পুরোহিতদের যথেচ্ছচার নিয়ে লিখেছেন। একটা সময় এমন কথাও চালু ছিল, রুশ জার শাসক দুটো জিনিসকে ভয় পেতেন। একটা হচ্ছে চার্চ, আরেকটা হচ্ছে এই লিও টলস্টয়। তিনি যে খুব বিদ্রোহী ছিলেন তা নয়, তবে সত্য কথা অকপটে বলতেন।

এদের বই পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তখনকার আমাদের ব্যক্তিত্বের যে গঠন, তাতে একধরনের পরিবর্তন এসেছে। সব লেখকেরই আসে। আমি তখন সুবোধ ঘোষের বইগুলোর অন্ধ ভক্ত ছিলাম। তখন আমি ভাবতাম, আমি যদি কোনোদিন সুবোধ ঘোষের মতো হতে পারতাম! রুশ সাহিত্যেরও ভক্ত ছিলাম খুব।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জন স্টেইনবাক, ফ্রানৎস কাফকা, আলবেয়ার কামু- এদের বই পড়েও মনের মধ্যে যেন আরেক ধরনের জগৎ নির্মিত হয়েছে। কামুর ‘আউটসাইডার’ পড়ে বিমোহিত হয়েছি। স্টেইনবাক আমার খুব প্রিয় ছিল। অনেক বইয়ের নামও এখন ভুলে গেছি। আরেক আশ্চর্যজনক এবং প্রিয় লেখক এই আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। প্রকৃত লেখক বলতে যা বোঝায় হেমিংওয়ে ছিলেন সেটাই। তিনি যখন লিখতে বসতেন, আর কিছুর দিকেই নজর দিতেন না। কোথাও যেতেন না। এমনকি এক ফোঁটা মদও খেতেন না। বাইরে থেকে খাবার আসতো, তাই খেয়ে দিনের পর দিন লিখতেন।

আরেকটা প্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বই ‘মবিডিক’। চিরন্তন কিছুকে অনুভব করতে চাইলে এ উপন্যাসটার কোনো তুলনা হয় না। এ রকম বহু বই আছে। অনেকগুলো পড়েছি নাম মনে করতে পারছি না।

আরও দুটি বইয়ের কথা বলব। একটি বই হচ্ছে ইরানের রেহনুমার। রেহনুমা যদিও তার উপাধি, আসল নামটি এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। বইটা ছিল হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনী। কী অসাধারণ তার বর্ণনা। আরেকটা বই হচ্ছে জালালুদ্দীন রুমির ওপরে তারই এক শিষ্যের লেখা। প্রথমবার এই বইটা পড়তে গিয়ে পড়ার মধ্যেই অনেক সময় বন্ধ করে দিয়েছি। এমন সব কথা লেখা আছে, যেগুলো অনেক সময়ই বিশ্বাসকে টলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। খুব ভালো লেগেছে এই দুটো বই।

আরেকটা খুব সুন্দর বই পড়েছিলাম আজারবাইজানের স্বাধীনতার ওপরে লেখা। এটারও নাম মনে নেই। আজারবাইজানেরই এক লেখকের লেখা। আজারবাইজানে আমি গিয়েছিলামও। রুশদের সঙ্গে আজারবাইজানিদের একটা বিশাল যুদ্ধ হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত তারা তাদের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারেনি।

নানা ভাবেই লেখককে তৈরি হতে হয়। বই সেই তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বই এবং পরিপার্শ্বের ওপর ভিত্তি করেই একজন লেখক গড়ে ওঠে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension