আন্তর্জাতিক

এশিয়ার কারাগারগুলো নারী বন্দিতে ঠাসা

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন সম্প্রতি এশিয়ার বন্দিশিবিরগুলোর ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রীতি ঝা লিখিত ‘এশিয়া’স প্রিজনস্‌ আর ফিলিং আপ উইথ উইমেন‘ প্রতিবেদনটিতে এশিয়াজুড়ে বিভিন্ন দেশের বন্দিশিবিরে বন্দি থাকা নারীদের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদক সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত হয়ে বিপুলসংখ্যক নারী এশিয়ার কারাগারগুলোতে বন্দি হয়ে আছে বিশ্বের অন্য অঞ্চলের কারাগারের তুলনায়।

থাইল্যান্ডের কারাগারগুলোর নারী বন্দিদের ৮২ শতাংশই মাদক সংক্রান্ত অপরাধে বন্দি হয়ে আছেন। ফিলিপাইনের কারাগারে আছেন ৫৩ শতাংশ নারী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক সংক্রান্ত অপরাধে নারীরা অধিক জড়াচ্ছেন, এই কারণে নারী কয়েদীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ব্যাপারটা এমন নয়। বরং লঘু অপরাধে কঠোর শাস্তি দেওয়ার কারণেই নারী কয়েদীদের সংখ্যা বাড়ছে বলে তারা মনে করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীরা মাদক বহন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। অথচ মাদকের পেছনের হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান।

ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনামূলক দুর্বল ও শহর অর্থনীতি অধিক চ্যালেঞ্জের হওয়ায় নারীদের বাধ্য হয়ে উপার্জনের পথে হাঁটতে হয়। অনেক নারীই হাইস্কুলের গণ্ডি না পেরোতেই মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। ইন্দোনেশিয়ার এক নারী জুনি। তাকে তার এক বন্ধু আকর্ষণীয় ‘ভ্রমণের চাকরি’র প্রস্তাব দেয়। যেহেতু জুনির বিশ্ব ঘুরে দেখার ইচ্ছে ছিল তাই তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন। ইন্দোনেশিয়ার মেদান শহর থেকে তার কাছে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন এসেছিল। তাকে চাকরি দিয়েছিলেন একজন বয়স্ক ইন্দোনেশিয়ান নারী। সাক্ষাৎকারের জন্য বিমানযোগে কাছাকাছি একটি দ্বীপে যেতে হয় জুনিকে। সেখানে তাকে বলা হয়, তার কাজ শুরু হবে কম্বোডিয়া থেকে।

জুনি সিএনএনকে বলেন, ‘আমার কোনও সন্দেহ হয় নি। সম্ভবত প্রশ্ন করার মতো অতটা বুদ্ধি আমার ছিল না।’ পিটার নামে এক লোক নমপেন বিমানবন্দরে তাকে একটি ব্যাগ দেন। জুনির যাওয়ার কথা হংকং। তার ব্যাগে যে মাদক ছিল, তা ছিল মূলত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের মাদকের একটি চালান। বিমানবন্দরের চৌকস রক্ষীদের কাছে ধরা পড়েন জুনি। এরপর তার ঠিকানা হয় কারাগার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে মাদক মেথামফেটামিনের বৈশ্বিক বাজার হয়ে উঠেছে। শুধু এশিয়া প্যাসিফিকেই বছরে ৬১ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয় এই মাদকের। এই বিশাল বাণিজ্যে কুরিয়ারের কাজ করা নারীরা কারাগারে যাওয়ার পর তাদের আর বাকি জীবনে কিছু করার থাকে না। হংকংয়ের কারাগারে নারী বন্দিদের মধ্যে ২০ দশমিক ১ শতাংশই মাদক সংক্রান্ত কারণে গ্রেপ্তার হওয়া। থাইল্যান্ডে ১২ দশমিক ৭, মিয়ানমারে ১২ দশমিক ৩, ব্রুনাইয়ে ১১ দশমিক ৯, লাওসে ১৩ দশমিক ৭ শতংশ নারী বন্দি কারাগারে। থাইল্যান্ডের কারাগারে বন্দি নারীদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, তারা জানেই না তাদের এই কাজে কে যুক্ত করেছে। মোবাইল ফোনেই সব নির্দেশনা দেওয়া হতো। তাদের কাজ ছিল শুধু লাগেজ নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়া।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়াতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। দেশটিতে ২০১৯ সালে ১ হাজার ২৮১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে অধিকাংশই মাদক সংক্রান্ত ইস্যুতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। অন্য অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীরা জামিন বা আইনানুগ সুবিধা পেলেও এই কুরিয়ার নারীদের ক্ষেত্রে তা হয় না। কারণ আর্থিক দুরবস্থার কারণে ওই নারীদের পক্ষে কেউই আইনি সহায়তা নিয়ে দাঁড়ান না। কিছু বেসরকারি সংস্থা চেষ্টা করলেও বাস্তবচিত্রের তুলনায় তা অনেক কম।❐

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension