
[পূর্বে প্রকাশের পর]
জার্মানিরা ভদ্র জাতি, তাই দোকানে কোনও কাস্টোমার আসলে তাম্মীও ভদ্রতা বজায় রাখে; কেউ কিছু কিনতে চাইলে সে বিক্রি করে, না চাইলে নাই। কিন্তু হাসানের ব্যাপারটাই আলাদা, সে কোনও কাস্টোমার পেলে একটার পর একটা জিনিস তো দেখাবেই, সাথে ভুল-ভালো জার্মান ভাষায় জিনিসপত্রের যে বর্ণনা দেয় তা শুনে কাস্টোমার না হেসে পারে না, আর মাঝে মাঝে তো তাদের হাসি থামাতেও কষ্ট হয়। তবে যাই হোক, তারা যে খুব মজা পায়, এই ব্যাপারে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। অল্প কিছু দিনের মধ্যে হাসান নিজেকে একজন দক্ষ সেলসম্যান হিসাবে প্রমাণ করে। এখন দোকানে কী ধরনের মালামাল কিনতে হবে, কী ধরনের মালের চাহিদা বেশি, এই সব ব্যাপারে হাসানের মতামত ছাড়া তাম্মী কিছু করে না। সপ্তাহে একদিন একটু আগে ভাগে দোকান বন্ধ করে হাসানকে নিয়ে তাম্মী পাইকারি মার্কেটে যায় দোকানের মালামাল কেনার জন্যে। হাসান অবাক হয়ে লক্ষ্য করে পাইকারি ব্যবসার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রন ভিয়েতনামীদের হাতে; তাদের সাথে মিশে যেতে হাসানের কোনও কষ্ট করতে হয় না।
হাসান বাকিতে মাল বিক্রির নতুন পদ্ধতি চালু করে, যদিও জার্মানরা এটায় অভ্যস্ত নয়; কিন্তু হাসানের কাছে এটা খুবই পরিচিত এবং স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। একদিন এক পরিচিত ক্রেতার কাছে বাকিতে একটা জামা বিক্রি করে; যদিও উনি এটা নিতে চাননি, হাসানই জোর করে ধরিয়ে দিয়েছিল। তাম্মী অবাক হয়ে বলে, ‘হাসান টাকাটা ফেরত পাবো তো?’ হাসান বলে, ‘অবশ্যই, এই ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহ নেই।’ দুই দিন পরে উক্ত মহিলা টাকা ফেরত দিতে আসে, সাথে হাসানকেও কিছু টিপস দিয়ে যায়। তাম্মী খুব খুশী হয়, আর হাসানের প্রতি তার আস্হা আরও বেড়ে যায়। হাসান তাম্মীকে বোঝায় তাদের দেশে বাকি ছাড়া ব্যবসা চলে না, আর বাকি দিতে হয় বুঝে-শুনে। এই ভাবে দিন যেতে থাকে, আশে-পাশের দোকানদারদের সাথেও হাসানের আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সবাই হাসানকে পছন্দ করে তার অমায়িক হাসি, সারাক্ষণ মজা করা, আর অবশ্যই পরিশ্রমী মানসিকতার জন্য। ইতিমধ্যে অন্য অনেকের নজরে পড়ে হাসান, তারমধ্যে একজন জুতার দোকানের মালিক, নাম উতা মোলার। সে হাসতে হাসতে একদিন হাসানকে প্রস্তাব দেয় হাসান যদি তার দোকানে কাজ করে, তবে সে হাসানকে রোজ পঞ্চাশ মার্ক দেবে। হাসানও হাসতে হাসতে উত্তর দেয় তার পঞ্চাশ মার্কের প্রয়োজন নেই, বিশ মার্কেই সে সন্তষ্ট। মিস মোলার চলে গেলে তাম্মী হাসানকে বলে, হাসান মিস মোলারের প্রস্তাবটা ভেবে দেখলে পারতে।
টাকা আমার দরকার, তাই বলে টাকাই সবকিছু নয় আমার কাছে। হাসান উত্তর দেয়। তাম্মী আর কিছুই বলে না।কিন্তু পরদিন সন্ধ্যায় কাজ শেষে হাসানকে ত্রিশ মার্ক দেয় তাম্মী। হাসান জানতে চায়, দশ মার্ক বেশি কেন আজ?
আজ থেকে তোমার জন্য এটাই। মায়াভরা চোখে তাম্মী হাসানের দিকে তাকিয়ে বলে। তাম্মীকে একটা ধন্যবাদ দিতে ভোলে না হাসান।
ইউরোপে সবাই স্বাধীন, সেটা আত্মিক এবং আর্থিক সব দিক দিয়েই; তাই পারিবারিক বন্ধন শিথিল হতে হতে এক প্রকার আনুষ্ঠানিকতায় এসে ঠেকেছে। সে কারণে এখন বড়দিন, অথবা পারিবারিক বিশেষ কোনও অনুষ্ঠান ছাড়া সন্তানদের পক্ষে বয়স্ক পিতা-মাতার খোঁজখবর নেওয়ার সময় বিশেষ একটা হয় না। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলশ্রুতিতে জার্মান জাতির জীবনে যে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট নেমে এসেছিল, তার কারণেও জার্মানির অনেক মানুষ আর কখনো স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনে ফিরে যেতে পারেনি; যেমন পঁচাত্তর বছর বয়সী মিস এনা। পেশায় নার্স ছিলেন যুদ্ধের যন্ত্রণাময় দিনগুলিতে; তাই যুদ্ধের বিভীষিকা খুব কাছ থেকে দেখেছেন, এবং হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন। কিন্তু এই ডামাডোলে কখন যে যুবতী থেকে বৃদ্ধায় পরিণত হয়েছেন তা খেয়াল করার সময়ই পাননি। অথচ এখন তিনি সরকারী পেনশনের টাকায় চিন্তাহীন নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন অতীত রোমন্থন করে। সুঠাম দেহের শক্ত মহিলা, দেখলে বোঝাই যায় না তার বয়স পঁচাত্তর।
দুই একদিন পরপর বিকালে ঘুরতে আসেন মিস এনা;
প্রয়োজনীয় কিছু থাকলে কেনেন, ঘোরাঘুরি করে সময় কাটান। ইতিমধ্যে হাসানের সাথে পরিচয় হয়েছে, আর মার্কেটে আসলে হাসানের সাথে গল্প না করে তিনি কোনও দিন ফিরে যান না। হাসানও মন দিয়ে মিস এনার গল্প শোনে; অধিকাংশ সময় বিশ্বযুদ্ধের গল্প, নাৎসী বাহিনীর অত্যাচারের কাহিনী। নাৎসী জার্মানির প্রতি হাসানের আগ্রহ সেই ছোটবেলা থেকে; হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্প’ (আমার লক্ষ্য) সে পড়েছে, আব্বার বুক শেলফে ছিল বইটা। একদিন গল্প করার সময় মিস এনা হাসানকে বলে, এখন তুমি যেমন দেখছ, আমাদের সময় জার্মানি এমন ছিল না। একটা রুটি (বেকারিতে তৈরী অনেক বড় রুটি, বাড়িতে রেখে কেটে কেটে খেতে হয়), এক কেজি চিনি, কফি আনতে সকালে আধাঘন্টা পায়ে হেঁটে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো আমাদের। মিত্রবাহিনীর বোমা হামলায় ড্রেসডেন শহর প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, কোনও বড় ইমারত অক্ষত ছিল না। রাস্তাঘাট সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, আর হাসপাতালগুলো ভর্তি থাকতো আহত ও নিহত সৈনিকে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যুদ্ধের শেষে পশ্চিম জার্মানি স্বাধীনতা পেলেও, মুক্তি মেলেনি তাদের। হিটলারের নৃশংসতার হাত থেকে বেঁচে গেলেও, শৃঙ্খল মুক্তি অধরাই থেকে যায়। কারণ, নতুন করে রাশিয়ার লাল পতাকার নীচে চাপা পড়ে যায় তারা। তারপর আরও দীর্ঘায়িত হয় তাদের শৃঙ্খল। এখনো ড্রেসডেন শহরের কোথাও না কোথাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবিস্ফোড়িত বোমা খুঁজে পাওয়া যাবে। এই সব কথা বলতে বলতে যেন কোন্ সুদূর অতীতে হারিয়ে যায় মিস এনা।
পেশাগত কারণে যুদ্ধের বিভীষিকা দেখেছেন একেবারে সন্মুখ সারিতে থেকে। যুদ্ধাহত সৈনিক ও সাধারণ মানুষের সেবা করতে করতে কখন যে যুবতী থেকে বৃদ্ধা হয়েছেন তা খেয়াল করার সময়-সুযোগ পাননি মিস এনা। তাই এখন তার সঙ্গী নিঃসঙ্গ সময়। একদিন মিস এনা হাসতে হাসতে হাসানকে বলেন, যদি তুমি রাজি থাকো, তবে তোমাকে আমি বিয়ে করতে পারি; কিন্তু শর্ত একটাই আমার সাথে থাকতে হবে।
যেহেতু হাসানের ইচ্ছা নেই, তাই সে-ও হাসতে হাসতে বলে, আমার প্রচুর বাচ্চা চাই, কিন্তু তোমাকে বিয়ে করলে সেটা তো হবে না।
দু’জনেই হাসতে থাকে। মিস এনা বলেন, হাসান তুমি খুব চালাক।
অবশ্য যাই হোক, মিস এনা হাসানকে খব পছন্দ করেন। আর যখনই মিস এনা মার্কেটে ঘুরতে আসেন, তাম্মী মজা করে হাসানকে বলে, হাসান তোমার বৌ এসেছে।
হাসানও ব্যাপারটা নিয়ে মজা করে; যদিও সে জানে, তার মতো রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর পক্ষে বিয়ে করা ছাড়া বৈধ ভাবে জার্মানিতে বসবাস করা সম্ভব নয়। তবুও শুধুমাত্র বৈধ হবার জন্যে দাদীর বয়সী একজন মহিলাকে বিয়ে করতে হাসানের বিবেকে বাধে। যদিও অনেক ভারতীয়, পাকিস্তানি এবং বাংলাদেশী এই ভাবে স্হায়ী হয়েছে; কিন্তু হাসানের কাছে এটা অনৈতিক মনে হয়। সে ঠিক করে রেখেছে, যদি জার্মানে না থাকতে পারে, তবে ইতালি চলে যাবে, ওর মামা রবি ইতালিতে থাকে। তিনি নিশ্চই ইতালি থাকার জন্যে হাসানকে একটা বৈধ গ্রিন কার্ড জোগাড় করে দেবেন; এটা হাসানের দৃঢ? বিশ্বাস।
পাঁচ
এল্ব নদী। ড্রেসডেন শহরের মধ্য দিয়ে এঁকে-বেঁকে চলে গেছে। নদীর দুই ধার খুব সুন্দর করে বাঁধানো। ছুটির দিন বিকালে হাসান তার বন্ধুদের সাথে মাঝে মাঝে নদীর উপরের ব্রিজের রেলিং-এ গিয়ে বসে। বিকালে নদীতে অনেকে কায়াকিং করে; ব্রিজের এপার থেকে ওপারে ছুটে চলে ব্যস্ত গাড়িগুলো; সবাই এই সব মনোরম দৃশ্য দেখে, আর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করে। নদীর বাঁধানো পাড় দেখে হাসানের মনে হয় বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙন রোধ কল্পে অপরিকল্পিত ভাবে বাংলাদেশের নদীগুলিতে যে পরিমাণ ব্লক ফেলা হয়, এবং দুর্নীতির মাধ্যমে যে পরিমাণ বরাদ্দের টাকা লোপাট করা হয় যদি সেটা বন্ধ করা যেত, তবে এতদিনে বাংলাদেশের সবগুলো নদীর দুই পাড় সুন্দর করে বাঁধানো থাকতো। তাহলে নদী ভাঙনের কারণে দেশের মানুষ আর নিঃস্ব হতো না; প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতো না। কিন্তু আফসোস, সেটা হবার নয়। কারণ, আমাদের দেশের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত। ক্ষমতার পরিবর্তন হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন হয় না; হয় শুধু নেতার ভাগ্য।
কোনও কোনও দিন সব বন্ধু মিলে ডিস্কো গিয়ে সারারাত নাচানাচি করে, গলা সমান বিয়ার পান করে ঢুলতে ঢুলতে গভীর রাতে বাসায় আসে। ডিস্কোর কড়া মিউজিক, এবং ঠাণ্ডা বিয়ার হাসানের খুব প্রিয়। আবার কোনও দিন নিজেদের রুমেই পার্টি দেয় সবাই মিলে। এইভাবে দিন যেতে থাকে। সবাই যে কাজ করে তা কিন্তু নয়। কেউ কেউ বার্লিনে গিয়ে ফুল, অথবা লাইটার বিক্রি করে। এটা আসলে কোনও কাজ, অথবা ব্যবসা নয়; এক ধরণের ভিক্ষাবৃত্তি। রেস্টুরেন্ট, বার, ডিস্কো, এমন কী রাস্তায় ঘুরে ঘুরে এই সব জিনিস বিক্রি করতে হয়। কেউ নেয়, কেউ গালি দেয়, কেউ আবার ফুল ছিঁড়ে ফেলে, থুতুও ছিটায় কেউ কেউ। এ ধরণের অপমানজনক কাজ খুবই অপছন্দ হাসানের। তার কথা টাকা প্রয়োজন ঠিক, তাই বলে এতটা নীচে নেমে, অপমান-অপদস্ত হবার কোনও মানে হয় না। কিন্তু তবুও বিনা পরিশ্রমে বেশি টাকার লোভে হাসানের অনেক বন্ধু এই কাজ করে।
অবশ্য এখন জার্মানের একটা বড় সমস্যা নয়া নাৎসীবাদ। সাবেক পূর্ব জার্মানি জুড়ে দিনকে দিন তাদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কারণ যাই হোক, উঠতি যুবক-যুবতীদের মাঝে এর প্রভাব উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। এদের একটা পোষাকী নামও আছে, তা হলো, ‘স্কিন হেড’, যেহেতু তারা সব সময় মাথা নেড়া রাখে।এদের দেখলেই চেনা যায়। হিটলারের নাৎসী যেখানে ছিল ইহুদী বিদ্বেষী, অথচ নয়া নাৎসীরা চরম ভাবে অভিবাসন বিরোধী, বিশেষ করে এশিয়ান ও আফ্রিকানদের এরা ঘৃণার চোখে দেখে। বর্তমানে এরা সুযোগ পেলেই বিদেশীদের উপর আক্রমন করে বসে; তাই যতটুকু পারা যায় এদেরকে এড়িয়ে চলে সবাই। তাম্মী সব সময় হাসানকে সাবধান করে; হাসানও সতর্ক থাকে, তবু এই একটি সমস্যা সে অনুভব করে বর্তমান জার্মানিতে। তারপরও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের এই জার্মান মডেলটি হাসানের পছন্দ হয়। আর শোষণ মুক্ত মেহনতি মানুষের সমাজতান্ত্রীক রাষ্ট্রের গালভরা বুলির আঁড়ালে নিবর্তনমূলক একনায়কতন্ত্র এবং তার ফলাফল দেখেছে সারা বিশ্ব। যদিও আন্তঃ পার্টি গণতন্ত্র বলে একটা বিষয় ছিল কমিউনিস্ট পার্টিতে; কিন্তু এই আন্তঃ পার্টি গণতন্ত্রের চর্চা কোনও কালে কোনও দেশেই হয়নি; না রাশিয়াতে, না গণচীনে। তাই যত ভালো মতবাদই হোক না কেন, যদি তত্ত্বের সাথে বাস্তবতার মিল না থাকে, তবে সেটা ব্যর্থ হতে বাধ্য; সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার দিকে তাকালেই এখন বোঝা যায়, সমাজতন্ত্রের নামে কী ভয়ানক অত্যাচার চলছে দেশটিতে। অথচ ষোল বছর জার্মানের চ্যান্সেলর থাকার পর হেলমুট কোল যখন নির্বাচনে হেরে ক্ষমতা ছাড়লেন, তখন সমস্ত জার্মানি তাকে সন্মান জানিয়েছে শ্রদ্ধার সাথে; কত সুন্দর এবং স্বাভাবিক সেই পরিবর্তন। হাসানের কাছে যেটা কল্পনার অতীত, জার্মানে সেটা খুব সাধারণ চর্চা; এটাই গণতন্ত্র। কিন্তু হাসান জানে নির্বাচন, গণতন্ত্র এবং ক্ষমতার জন্য কী ভয়ানক যুদ্ধ চলে বাংলাদেশে এবং বিনিময়ে কী পরিমাণ মূল্য চোকায় জনগণ। তাই জার্মান গনতন্ত্র এবং তাদের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তির সাক্ষী থাকতে পেরে হাসান নিজেকে ধন্য মনে করে।
কাজ এবং জার্মান পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে নিতে কীভাবে যে বছর পেরিয়ে গেছে, তা হাসান টেরও পায় না। ইতিমধ্যে একে একে রুমমেটদের আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হতে থাকে; আর একজন একজন করে জার্মানি ছাড়তে থাকে; সবারই গন্তব্য ইতালি। এখন হাসানের অপেক্ষা একটাই, কখন আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যানের চিঠি আসে! তাম্মী হাসানকে পরামর্শ দেয় মিস এনাকে বিয়ে করার জন্য; কিন্তু হাসান রাজি হয় না। যদিও মিস এনাকে হাসান পছন্দ করে এবং উনার প্রতি সে সহানুভূতিশীল, তবুও তাকে বিয়ে করা হাসানের পক্ষে সম্ভব না। মাথায় অনেক দুশ্চিন্তা ভিড় করে, তবু নীরবে কাজ করে যায় এবং ইতালিতে রবি মামার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখে সে। জার্মানে থাকার অনুমতি বাতিল হলে হাসান কী করবে, তা আগেই ঠিক করে রেখেছেন মামা। সামনের বছর ইতালিতে গ্রিন কার্ড দিতে পারে, আর তার আগেই যদি হাসানের এসাইলাম বাতিল হয়, তবে এরফুর্তে মামার এক পাকিস্তানি বন্ধু আছে, তার কাছে কাজ করতে পারবে হাসান; তারপর যখন ইতালি যাবার সময় হবে মামা তাকে নিয়ে যাবেন। রবি মামা থাকতে এতো চিন্তার কী আছে?
ছোটবেলা বাবা মারা যাবার পর নানা বাড়িতে মানুষ হয়েছে হাসান। সে যখন ছোট তখন রবি মামা জার্মানে চলে যায়; আর এখন ইতালিতে স্হায়ী ভাবে বসবাস করছেন তিনি। মূলত হাসানের ছোট্ট মনে জার্মান নামক স্বপ্নের বীজ রবি মামাই বপন করে দেন; তাই হাসানের বক্তব্য হচ্ছে, ইউরোপের কোনও একটি দেশে স্হায়ী ভাবে বসবাসের জন্য তার একটা ব্যবস্থা করে দেওয়ার দায়িত্ব মামার; ভাগিনার আবদার আর কী! মামা ও হাসানকে খুব স্নেহ করেন। মামা যখন সুইজারল্যান্ড ছিলেন, তখন একবার চেষ্টা করেছিলেন সরাসরি ভিসা লাগিয়ে হাসানকে সুইজারল্যান্ড নিয়ে যাবার জন্যে; কিন্তু বাংলাদেশের সুইস অ্যামবেসিহাসানকে ভিসা দেয়নি, তাই বাধ্য হয়ে মামার পরামর্শে মস্কো হয়ে অবৈধ পথে এই জার্মানে আসা।
জুলাই মাস। বছরের এই সময়ে ইউরোপের প্রকৃতি ও মানুষের মনে উৎসবের আমেজ খেলা করে। উত্তর গোলার্ধে এখন দিনগুলো অনেক দীর্ঘ; ঘড়ির কাঁটা দুই ঘন্টা এগিয়ে নেবার কারণে। বিকালে খুশী মনে কাজ করছিল হাসান, গায়ে শুধু পাতলা একটা টি শার্ট। মিস এনা ঘুরতে আসে, হাসানের জন্য নিয়ে আসে চকলেট। কুশল বিনিময় করে হাসান বলে, আমি বাচ্চা নাকি, যে আমার জন্যে সব সময় চকলেট আনো, মিস এনা?
তা তোমার বয়স কতো, হাসান?
সাতাশ বছর।
আমার কাছে তুমি বাচ্চাই।
ঠিক আছে, তবে তাই হোক।
হাসান হাসতে হাসতে তিনজনের জন্য কফি আনতে চলে যায়। কফির কাপ নিয়ে তাম্মী পাশের দোকানে যায় গল্প করতে। হাসান আর মিস এনা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকে। শুরু করে মিস এনা, হাসান, তুমি কি জান, খুব শীঘ্রই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে অভিন্ন মুদ্রা হিসাবে ইউরো চালু হচ্ছে? আন্তঃসীমান্ত চেক পোষ্ট আর থাকবে না।
হাঁ, শুনেছি। গত সপ্তাহে আমার এক বন্ধু ট্রেনে করে ইতালি চলে গেছে; কোথাও কোনও চেক ছিল না।
তা হলে তুমিও নিশ্চই ইতালি যাবার কথা ভাবছো? অবশ্যই।
হাসান, তুমি যদি ১৯৪৫ সালে আমার কাছে আসতে, তবে আমি কিছুতেই তোমাকে যেতে দিতাম না।
আমিও যেতাম না, প্রয়োজনে তোমার জন্যে যুদ্ধে যেতাম।
হাসান, আমি বুঝি না; পুরুষ মানুষগুলো প্রথমেই কেন যুদ্ধের কথা চিন্তা করে?
কারণ, মানব জাতির শুরুই হয়েছে আমাদের আদি পিতার আদমের দুই পুত্রের হানাহানির মধ্যেমে, আমরা সেই যুদ্ধের গর্বিত উত্তরাধিকারী।
হাসান, তোমার কাছে যুদ্ধটা মনে হয় একটা রোমাঞ্চ; কিন্তু আমার কাছে সারা জীবনের যন্ত্রণা, তাই আমি আর যুদ্ধ দেখতে চাই না।
কিন্তু মিস এনা, তুমি চাও বা না চাও, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এখনো যুদ্ধ চলছে; তুমি বা আমি, আমরা কেউ পারবো না সে যুদ্ধ বন্ধ করতে। খুব বেশি হলে আমরা পারবো যুদ্ধবিরোধী কিছু মিছিল-মিটিং করতে; অথবা কিছু যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস লিখতে, যেমন লিখেছেন তোমাদের এরিখ মারিয়া রেমার্ক।
হাসান, তুমি রেমার্কের উপন্যাস পড়েছো?
অবশ্যই, যুদ্ধ নিয়ে লেখা তার বিখ্যাত উপন্যাসগুলো যে পড়েনি, পাঠক হিসাবে সে অভাগা।
জানো হাসান, ঐ বইগুলো এক সময় আমরা চুরি করে পড়তাম, আর কাঁদতাম। কারণ, ঐ বইগুলো আমাদের এখানে নিষিদ্ধ ছিল।
এই ভাবে গল্পে গল্পে সময় কেটে যায়। কফি শেষ করে তাম্মী চলে আসে; দু’জনে মিলে দোকান বন্ধ করা শুরু করে।
রাতে বাসায় ফিরে সেই অনাকাঙ্খিত চিঠিটা পায় হাসান, যেটা সে কখনো পেতে চায়নি। বিষয় হচ্ছে, জার্মানিতে থাকার রাজনৈতিক আবেদন সরকার বাতিল করার পর, হাসান এই আদেশের বিরুদ্ধে যে আপিল করেছিল সরকার সেটা গ্রহণ করেনি। অতএব হাসানকে এখন জার্মানি ছাড়তে হবে। আগামী পনেরো দিনের মধ্যে বন-এ (জার্মানের রাজধানী বার্লিনে সম্প্রসারণের কাজ চলছে) বাংলাদেশ অ্যামবেসিতে গিয়ে পাসপোর্টের আবেদন করতে হবে। দেশে ফেরার যাবতীয় ব্যবস্হা জার্মান সরকার করবে; কিন্তু সরকার যেটা জানে, অথবা জানে না, তা হচ্ছে টিকেট কেটে দেশে ফেরার জন্য হাসানরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জার্মানে আসে না। বন্ধুরা সাহস এবং সান্তনা দেয়। ইতিমধ্যে কয়েকজন বন্ধুর আপিল বাতিল হওয়াতে তারাও জার্মানি ছেড়েছে। পরদিন কাজে গিয়ে চিঠিটা তাম্মীকে দেখায় হাসান। তাম্মী মনযোগ দিয়ে চিঠি পড়ে শেষ করে, তারপর বলে, তা হলে তোমাকে চলে যেতে হবে?
আর তো কোনও উপায় নাই।
দু’জনেরই মন খারাপ। হাসানের মন খারাপের কারণ, তাকে চলে যেতে হবে; আর তাম্মীর মন খারাপ, কারণ, হাসান তার দোকানটা নিজের মতো করে চালাতো; এমন কর্মঠ ছেলে খুব কমই পাওয়া যায়। সপ্তাহখানেক পর তাম্মী ও মিস এনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসে হাসান। আসার সময় দু’জনে মিলে হাসানকে পাঁচ হাজার মার্ক উপহার দেয়; যদিও হাসান টাকা নিতে চায়নি। ওরা জোর করে হাসানের পকেটে টাকাটা ঢুকিয় দিয়ে বলে, তোমার কাজে লাগবে।
তোমাদের আমি কোনও দিন ভুলবো না।
টাকাটা হাসান ইতালিতে মামার কাছে পাঠিয়ে দেয়। ইতালিতে যাবার পর লিগ্যাল হবার সময় কাজে লাগবে টাকাটা।
মামার সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসান। মামা তার এরফুর্তের বন্ধু খান সাহেবের নাম্বার হাসানকে দিয়ে বলেন, কথা বলে নে।
হাসান ফোন দিলে খান সাহেব বলেন, ভানজে, কই বাত নেহি, চলে আও।
হাসানকে তার ঠিকানা ভালো করে বুঝিয়ে দেয়। ট্রেনে এরফুর্ত স্টেশনে নামলে বাহিরে ট্রাম স্টপেজ। ওখান থেকে ট্রামে করে রটারডেম স্ট্রাসে (স্ট্রিট) স্টপেজে নেমে রাস্তার উল্টা দিকে যে ছোট গলিটা গিয়েছে, সেটার ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে পাকিস্তানি ও ভিয়েতনামীদের বড় বড় পাইকারি কাপড়ের দোকান। ঐ দোকানগুলোর যে কোনও একটিতে গিয়ে জানতে চাইলে যে কেউ দেখিয়ে দেবে খান সাহেবের লাগার (দোকান)। তারপরও যদি কোনও সমস্যা হয়, তবে খান সাহেবের মোবাইল নাম্বার তো হাসানের কাছে আছেই।
ট্রেনে বনে যাবার টিকিট সরকার দিয়েছে; সাথে যাতায়াতের যাবতীয় খরচ। এটাই জার্মানির নিয়ম, যেন কোনও মানবাধিকার লংঘিত না হয়। একটা পিঠে ঝোলানো সাইড ব্যাগে প্রয়োজনীয় জামা-কাপড় ভরে, রুমমেটদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাসান রওনা দেয়। ট্রেনে ওঠার আগে ভালো করে নিশ্চিত হয়ে নেয় ট্রেন এরফুর্তে থামবে কি না। ট্রেন এরফুর্ত স্টেশনে থামবে, এটা জানার পরে আল্লাহ’র নাম নিয়ে সে ট্রেনে উঠে বসে। আবার একাকী এবং নিঃসঙ্গ হয়ে যায় সে; ভেসে আসা স্মৃতির ছেঁড়া পাতা এলোমেলো করে দেয় তাকে। তাম্মী এখন ব্যস্ত তার ব্যবসা নিয়ে, আর বিকালে বেড়াতে এসে মিস এনা হাসানকে আর খুঁজে পাবে না। মানুষ আসলে এই অনন্ত নক্ষত্রলোকের নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক, হাসান তার ছোট্ট একটা নমুনা। মানুষ স্হায়ী হতে চায়, কিন্তু এই পৃথিবীতে মানুষের কোনও ঠিকানা নেই; আমৃত্যু ছুটে চলাই মানুষের নিয়তি। হাসান মনে মনে বলে, বিদায় ড্রেসডেন!
ছয়
এরফুর্ত। সাক্সেন আন হাল্ট প্রদেশের রাজধানী। এটাও সাবেক পূর্ব জার্মানির অন্তর্গত। ট্রেন স্টেশনে নেমে কথা অনুযায়ী স্টেশনের বাহিরে ট্রাম স্টপেজে এসে রটরডেম স্ট্রাসের ট্রামে ওঠে হাসান। ট্রামে ওঠার পর একটা হতাশা ঘিরে ধরে তাকে; আর যাই হোক, ড্রেসডেনে থাকার তবু একটা বৈধ ডকুমেন্ট ছিল, তাই মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াতে পারতো হাসান; কোনও ভয় ছিল না। অথচ এখন আবার সে অবৈধ। ট্রাম থেকে নেমে খান সাহেবের লাগার (দোকান) খুঁজে বাহির করে সে।
বিশাল গুদাম ঘর, চারিদিকে বিভিন্ন পাইকারি মাল সাজিয়ে রাখা। খান সাহেব পাইকারি এবং খুচরা, উভয় ব্যবসাই করেন। দুইটা গাড়ি আছে তাম্মীর মতো, সেইসব গাড়িতে একেক দিন একেক মার্কেটে দোকান লাগায় তার কর্মচারীরা। খান সাহেব এগিয়ে এসে হাসানকে অভ্যর্থনা জানায় এবং বলে, রবি আর আমি অনেক বছর একসাথে ছিলাম। চিন্তা করো না, কাল থেকে কাজে লেগে যাও। রবির ভাগনে মানে, তুমি আমারও ভাগনে; রবির সাথে আমার কথা হয়েছে, সময় মতো তোমাকে ইতালি পাঠিয়ে দেবার দায়িত্ব আমার।
খান সাহেবের মূল ব্যবসা ফেনাটিক্যাল আইটেমের; অর্থাৎ, বুন্দেস লীগার সমস্ত ফুটবল ক্লাব এবং বিভিন্ন জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পীদের যাবতীয় জিনিস (পতাকা, টি শার্ট, কুশন বালিশ, আর্ম ব্যান্ড, মাফলার, টুপি, ফুটবল এবং আরও অনেক কিছু), এবং মহিলাদের জামা-কাপড় বিক্রি করা। এই ফেনাটিক্যাল আইটেমের ব্যবসা একটা অবৈধ ব্যবসা। কারণ, এই মাল বিক্রিত টাকার কেউ কোনও রয়ালটি পায় না; এগুলোর সবই ডুপ্লিকেট, কোনও কপিরাইট নেই। কিন্তু অল্প দামে পাওয়া যায় বলে এইসব জিনিস-পত্রের চাহিদা প্রচুর। পশ্চিম জার্মানির তুলনায় পূর্ব জার্মানের আইন-কানুন একটু শিথিল, তাই তেমন কোনও সমস্যা হয় না এখানে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এসব ব্যবসা করার জন্য প্রচুর সাহসের প্রয়োজন; যেটা খান সাহেবের আছে। সবার সাথে পরিচিত হয়েছে হাসান। আরও তিন জনের সাথে তার থাকার ব্যবস্হা হয়েছে, অর্থাৎ এক রুমে মোট চার জন; দুই জন পাকিস্তানি, এক জন ভারতীয় পাঞ্জাবি এবং হাসান। রুমটা খুব সুন্দর, পরিপাটি করে সাজানো; মাসিক ভাড়া চার শত মার্ক, সবাই ভাগ করে দেবে। রাতে কাজ শেষে সবাই এক সাথে বাসায় ফেরে; ফেরার পথে সুপার মার্কেট থেকে প্রয়োজনীয় বাজার নিয়ে আসে। তারপর সবাই একসাথে রাতের খাবার রান্না করে। সবার বেতনই সমান; দৈনিক পঞ্চাশ মার্ক এবং কাজের দিন ব্রেকফাস্ট ও লাঞ্চের জন্য দশ মার্ক।
কাজে লেগে যায় হাসান। একেক দিন একেক মার্কেটে যায়, মাঝে মধ্যে কোনও উৎসবে। ভালো কাজ করতে থাকে হাসান; যেহেতু ড্রেসডেন থেকেই মোটামুটি অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে সে। এইসব আইটেমের চাহিদা প্রচুর; নিজ নিজ প্রিয় ক্লাব, অথবা শিল্পির কোনও জিনিস দেখলেই বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সবাই খুশী হয়ে যায়, কিনতে চায়। আবার এই ব্যবসার লাভ ও যে প্রচুর, হাসান তা অল্পদিনের মধ্যেই বুঝতে পারে। কিছু দিনের মধ্যে হাসান তার দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে খান সাহেবের প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়; এবং পুশিং সেল দেবার ক্ষেত্রে তার যে তুলনা নাই, সেটা মুখে মুখে হয়ে যায়।
হাসানের রুমমেটরা সবাই প্রায় সমবয়সী; বাট ও আলী পাকিস্তানি, কুমার ভারতীয় (খুব সহজ-সরল); আলী আবার খান সাহেবের শালা। বাট সারাক্ষণ হাসি-ঠাট্টা নিয়ে ব্যস্ত; সবকিছু নিয়ে মজা করা তার স্বভাব। হাসানের সাথে বাটের ঘনিষ্টতা সবচেয়ে বেশি, দু’জনে একসাথে কাজে যায়। প্রতিদিন রাতে বাট বলে, বন্ধু, কাল থেকে আমি আর বিয়ার পান করবো না। কিন্তু পরদিন সুপার মার্কেটে বাজার করতে গেলে, বাটই এক কেস বিয়ার ট্রলিতে রাখে, আর ভাব করে, এটা কী জিনিস তা সে জানে না; বেচারা, আর সবাই মুখ চেপে হাসে। এদিকে মার্কেটে গিয়ে হাসান, আর সে কী কী মজা করে, তা রাতে রান্না করার সময় অভিনয় করে দেখায় বাট; বাকি সবাই বাটের কথা শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। সাথে বিয়ার পান করা ও রুটি বানানোর কাজ চলতে থাকে। কোনও দিন মুরগির মাংস, আবার কোনও দিন গরুর মাংস ভুনা, ডিনারটা ভালোই জমে। বাট বলে, হাসান, সকাল সকাল উমা (জার্মানিতে উমা বলতে বুঝায় দাদী বা নানী) যাচ্ছিল রুটি কিনতে, কিন্তু তুই কেন উমার ত্রিশ মার্ক খসিয়ে দিলি?
আমি কোথায় খসালাম? আমি তো শুধু উমাকে বলেছিলাম, জামাটা একটু গায়ে দিয়ে দেখতে। তুই তো উমার সামনে আয়না ধরে বল্লি, ছেয়া শোন, উমা (খুব সুন্দর উমা)। সবাই বিয়ারে চুমুক দেয় আর বলে, বেচারী উমা।
ক্রিসমাস (জার্মানিতে যাকে বলে বাইনাখ্ট) উপলক্ষে প্রচুর বিক্রি করে বাট ও হাসান; বোনাসও পায় তারা। এই মার্কেট ঐ মার্কেট ঘুরতে ঘুরতে কেটে যায় শীতকাল । বাট ও হাসানের মতো ইতালির বৈধতার ঘোষনার অপেক্ষায় আছে। হাসান খেয়াল করে এখানেও প্রচুর ভিয়েতনামী। খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, পূর্ব জার্মানি যখন সোভিয়েত ব্লকে ছিল, তখন অনেক ভিয়েতনামী এখানে পড়তে আসে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে; কিন্তু পরে যখন দুই জার্মানি এক হয়ে যায়, তখন কেউ আর ভিয়েতনামে ফেরত যায়নি।
এখন মে মাস। হাসান একদিন কাজ করতে করতে খেয়াল করে গুঁড়া গুঁড়া বরফ পড়ছে চারিদিক; যদিও সকাল থেকে আকাশ মেঘলা ছিল। হাসান অবাক হয়ে ভাবে, এখন এই সময় কী পরিমাণ গরম বাংলাদেশে! মনে পড়ে এই সময় জামার বোতাম খুলে রেস্টুরেন্টের ফ্যানের নীচে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারার আনন্দময় দিনগুলোর কথা। অথচ এখানে এখন জামা-জুতা-জ্যাকেট পরে ঠান্ডায় কাঁপছে সে। ছোট্ট একটা দুনিয়ায় অবস্হান ভেদে আবহাওয়ার রূপ কত ভিন্ন। রাতের আকাশে অজস্র তারার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে হাসান ভাবে, দূরে বহুদূরে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ পেরিয়ে কোনও এক নক্ষত্রমণ্ডলীতে পৃথিবীর মত যে গ্রহগুলো ঘুরছে তার নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে সেখানে কি এখন বরফ পড়ছে? হাসানের মতো কেউ কি সেখানে এখন জ্যাকেট পরে কাজ করে চলেছে আপন মনে!
এই সময় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটি কারণে কাজের ছন্দপতন ঘটে। ভারত পরীক্ষামূলক পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। সেই বোমার মনস্তাত্বিক আঘাত লাগে সুদূর জার্মানে; সব পাকিস্তানি মুষড়ে পড়ে। হাসান বুঝতে পারে পাকিস্তানিরা ভিতরে ভিতরে লজ্জায়-অপমানে জ্বলে-পুঁড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারছে না। হাসানও সবার মতো নীরবে কাজ করতে থাকে। অনেক কারণ, অনেক বিতর্ক এবং অনেক বিরুদ্ধ মত থাকতে পারে; একজন বাংলাদেশী হিসাবে পাকিস্তানকে সমর্থন করা বিপজ্জনক হতে পারে, কিন্তু তবুও হাসান পাকিস্তানিদের প্রতি সহানুভূতি অনুভব করে; যদিও সে বিশ্বাস করে ৭১ সালের ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের মাফ চাওয়া উচিত। আর দশ জন পাকিস্তানির মতো হাসানও চায়, পাকিস্তানও পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাক, ভারতের উপযুক্ত জবাব দিক। বাতাসে অনেক কথা ভাসতে থাকে; অবশেষে আসে পাকিস্তানিদের সেই কাঙ্খিত দিন। ভারতীয়দের জবাব হিসাবে পাকিস্তান পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়, কিন্তু পাকিস্তানিদের গর্বের কারণ যেটা, তা হলো পাকিস্তান ভারতের তুলনায় একটি বোমা বেশি ফোটায়। বাট ও হাসান কাজ শেষে লাগারে ফিরে দেখে বিশাল পার্টি চলছে। উত্তেজিত হয়ে আলী বলে, ‘পাকিস্তান ধামাকা কার দিয়া, ইয়ার।’ যদিও ওরা মার্কেটে থাকতেই খবর পেয়েছে। পাকিস্তানিদের আনন্দ দেখে হাসান ভালোই অনুমান করে জার্মানে যদি এই অবস্হা হয়, তবে পাকিস্তানের শহর গুলোতে এখন উৎসবের উৎযাপন কেমন চলছে! ‘পাকিস্হানীরা প্রয়োজনে ঘাস খেয়ে থাকবে, তবু পারমানবিক বোমা বানাবেই’ জুলফিকার আলী ভুট্টোর এই আবেগের তাৎপর্য এখন বুঝতে পারে হাসান। ইসলামী বোমার সুস্বাস্হ্য কামনা করে রাতে পার্টি দেয় বাট; অতিথী একজন ভারতীয় এবং একজন বাংলাদেশী। ইসলামী বোমার দীর্ঘায়ু কামনা করে সারারাত চলে পান উৎসব।
অক্টোবরের শেষে আসে সেই কাঙ্খিত সুসংবাদ। ইতালির সরকার সে দেশে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করে নেবার ঘোষণা দিয়েছে। হাসানকে ইতালি চলে আসতে বলে রবি মামা। খান সাহেব ইতালি যাবার সব ব্যবস্হা করে দিয়েছে। বাট, হাসান ও আর একজন পাকিস্তানি সহ মোট তিনজনকে এরফুর্তে স্হায়ী বসবাসকারী অন্য এক পাকিস্তানি ইতালি পৌছে দেবে; খরচ জনপ্রতি দুই হাজার মার্ক। খান সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সবাই রওনা দেয়। দামি মডেলের একটা বি এম ডব্লিউ গাড়িতে যাচ্ছে তারা। সবাই কে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে, পথে পুলিশ চেক করলে সবাই যেন বলে, তারা সবাই লিফ্ট নিচ্ছে; এখানে টাকা-পয়সার কোনও লেনদেন নাই। এরফুর্ত শহর ছাড়িয়ে গাড়ি ছুটছে মিউনিখের দিকে; আল্পস পর্বতমালার মধ্য দিয়ে এঁকে-বেঁকে চলে গেছে হাইওয়ে। এই আল্পস পর্বতমালা পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু হয়ে জার্মান, অস্ট্রিয়া, ইতালি, সুইজারল্যান্ড হয়ে ফ্রান্সে গিয়ে শেষ হয়েছে।
অদ্ভুত-সুন্দর প্রকৃতি দেখে হাসানের মন ভরে যায়। কোথাও পাহাড়ের এক পাশ দিয়ে টানেলে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে তারা; আবার কোথাও পাহাড়ের কিনার ঘেষে রাস্তা, মনে হয় পিলার দিয়ে দাঁড করিয়ে রাখা হয়েছে পাহাড়। কোথাও আবার পাহাড়ের অনেক উপর দিয়ে ব্রিজ, যাবার পথে মেঘ ছুঁয়ে যাচ্ছে গাড়ি; সত্যি অদ্ভুত, হাসান দু’চোখ ভরে উপভোগ করে আল্পস পর্বতের সৌন্দর্য। মনে মনে সালাম জানায় সেই সব শ্রমিক এবং ইজ্ঞিনিয়রদের, যাদের পরিকল্পনা ও পরিশ্রমে তৈরী হয়েছে এই সৌন্দর্যমন্ডিত হাইওয়ে। অস্ট্রিয়ান বর্ডার বিনা বাঁধায় পার হয়ে যায় তারা। কোনও চেক নেই, শুধু পুলিশ বক্সে বসে দুইজন পুলিশ গল্প করছে, আর রাস্তার দিকে খেয়াল রাখছে। একটানা অনেকক্ষণ গাড়িতে বসে থেকে সবাই ক্লান্ত, তাই গাড়িতে তেল নেওয়া এবং কিছু খাবার জন্যে হাইওয়ের উপরে একটা বড় পেট্রল পাম্পে (এইসব পেট্রল পাম্পের সাথেই থাকে রেস্টুরেন্ট ও সুপার সপ) গাড়ি থামালো ওসমান ভাই, ইনি সবাইকে ইতালি নিয়ে যাচ্ছেন। সকালে রওনা দিয়েছে তারা, আর এখন প্রায় বিকাল, অতএব ক্ষুধা লাগাটাই স্বাভাবিক।
অস্ট্রিয়া থেকে ইতালির হাইওয়ে আরও সুন্দর; আল্পস পর্বতমালার বিশাল বিশাল পাহাড়ের মধ্য দিয়ে রাস্তা চলে গেছে ইতালি পর্যন্ত। ইতালিতে ঢুকতেও কোনও অসুবিধা হলো না। হাইওয়ের তিনটা লেন, পুলিশের দুইটা গাড়ি দিয়ে দুইটা লেন বন্ধ করা, শুধু একটা লেন খোলা রেখেছে ইতালিয়ান পুলিশ। গাড়ি দুইটাতে হেলান দিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে চারজন পুলিশ; খোলা লেন দিয়ে গাড়ির গতি কমিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবে ইতালি ঢুকে গেলেন ওসমান ভাই। সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচলো। রবি মামা ব্রিক্সেন শহরে আগে থেকে অপেক্ষা করছিলেন হাসানের জন্যে। শহরটা ইতালিয়ান অল্পসের অন্তর্গত এবং সুদ টিরোল (সাউথ টিরোল) প্রদেশের একটি ছোট শহর; আবার ভৌগোলিক ভাবে এটাকে নর্থ ইতালি বলে। কারণ, সুদ টিরোল হচ্ছে ইতালির সর্ব উত্তরের প্রদেশ, আর ব্রিক্সেন আর অস্ট্রিয়ার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ছোট একটি শহর, নাম ব্রেনার। হাসানকে রবি মামার কাছে নামিয়ে দিয়ে বাট বিদায় নিয়ে চলে যায়। ইউরোপের মাটিতে মামাকে পেয়ে হাসানের মনে হলো, যেন মায়ের কোলে ফিরে এসেছে সে। মামার গাড়িতে করে মামার বাসার দিকে যাত্রা করে হাসান।
সাত
চারিপাশে পাহাড় বেষ্টিত, মধ্যখানে ছোট্ট একটা সমতল ভূমিতে ব্রিক্সেন শহরটি অবস্হিত। একটা ফুটবল স্টেডিয়ামের চারিদিক থেকে যেমন মাঠ দেখা যায়, ঠিক তেমনি চারিদিকের পাহাড়ের উপরের গ্রামগুলো থেকে শহরটাকে স্পষ্ট দেখা যায়। পাথরের ছোট ছোট ব্লক বসিয়ে শহরের রাস্তাগুলো তৈরী; পথ চলার সময় অতীতের শব্দ শোনা যায়। শহরের মাঝ বরাবর বিশাল চত্তর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি গির্জা। পুরাতন আমলের জার্মান ধাঁচের বাড়িগুলোর নিচে দিয়ে পায়ে হাঁটার পথ; কয়েকটা বার, কয়েকটা পিজ্জার দোকান, জামা-কাপড়ের দোকান, সুপার মার্কেট এইসব নিয়ে ব্রিক্সেন শহর। শহরের বুক চিরে একটা খাল বয়ে গেছে; সারা বছর অল্প-বিস্তর পানি থাকলেও গ্রীষ্মকালে পাহাড়ের বরফ গলা জলে খালে লাগে যৌবনের জোয়ার। পাথরের সাথে পানির দ্বৈরথ দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি অবিরাম ঝিরিঝিরি শব্দ শুনতেও মধুর। খালের দুই পাড় সুন্দর করে বাঁধানো; চাইলে রেলিং এর উপরে বসে গল্প করা যায় ঘন্টার পর ঘন্টা। খালের উপর কিছু দূর পরপর সেতু; এখানে জল এবং মানুষের গতি অবাধ।
ব্রিক্সেন সুদ টিরোল প্রদেশের অন্তর্গত একটি ছোট শহর, এর রাজধানীর নাম বোজেন, ইতালিয়ান নাম বোলজানো; আর ব্রিক্সেনের নাম ব্রিজানোনে। সুদ টিরোল প্রদেশের জনগণের মাতৃভাষা জার্মান, তাই জার্মান এবং ইতালিয়ান দুটোই এখানকার অফিসিয়াল ভাষা। স্হানীয় মানুষ নিজেদের মধ্যে জার্মান ভাষায় কথা বলে, শুধু বাহিরের মানুষের সাথে প্রয়োজনে ইতালিয়ান ভাষা ব্যবহার করে; তাই এখানকার সব কিছুর দুইটা নাম, একটা জার্মান, অন্যটা ইতালিয়ান। স্হানীয় ভাষা জার্মান হওয়াতে হাসানের জন্য সুবিধাই হয়, কারণ সে ইতিমধ্যে জার্মান ভাষা মোটামুটি রপ্ত করে নিয়েছে। তবে এই সুদ টিরোল প্রদেশের একটা করুণ ইতিহাস আছে; যে ইতিহাসের সাথে হাসান তার নিজ দেশের ইতিহাসের মিল খুঁজে পায়। সমগ্র টিরোল এক সময় অস্ট্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল; প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালি এর কিছু অংশ দখল করে নেয়, যেটা আর কখনো ফেরত দেয়নি। যদিও অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম, এমন কি গেরিলা যুদ্ধ করেছে টিরোলবাসী, তবুও ইতালির হাত থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ, অর্থাৎ অস্ট্রিয়ার সাথে একাত্ব হতে পারেনি তারা। এখন এটা ইতালির সর্ব উত্তরের সায়ত্বশাসিত প্রদেশ। কিন্তু যেহেতু অস্ট্রিয়ার দক্ষিনে, তাই ইতালির অংশের নাম সুদ (সাউথ) টিরোল এবং অস্ট্রিয়ার অংশের নাম নর্দ (নর্থ ) টিরোল। বাংলাদেশের ইতিহাস এমন না হলেও, কিছুটা মিল তো আছে। ভারত ভাগের সময় ব্রিটিশরা কার পরামর্শে, কার সার্থে বাংলা এবং পাঞ্জাব প্রদেশ দুই ভাগ করেছিল তা এখন আর বিবেচ্য নয়, কিন্তু সে ক্ষত রয়ে গেছে এখনো; হয়ত বা শুকাবে না কোনও দিন।
এক সপ্তাহ ব্রিক্সেন থাকার পর পাসপোর্ট বানানোর জন্যে রোমের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় হাসান। জার্মানির নিরিবিলি পরিবেশ ছেড়ে, হঠাৎ রোম শহরের কোলাহলের মধ্যে পড়ে বিচলিতবোধ করে সে; মানিয়ে নিতে কয়েকদিন সময় লাগে। রোমের বাংলাদেশ এম্বেসিতে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিয়েছে হাসান; পাসপোর্ট পেতে সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। হাতে অফুরন্ত সময়; একা একা সারা শহর ঘুরে বেড়ায়, আর ইতিহাসের পাতা উল্টাতে উল্টাতে কয়েক হাজার বছর পিছনে চলে যায় হাসান।
এই সেই রোম। মহান রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী। মহান জুলিয়াস সিজার যে পথে ঘোড়ার গাড়িতে চলাফেরা করতেন, সেই পথ ধরে প্রচুর টুরিস্টের সাথে হাসান হেঁটে যায়, আর অতীতের ছোঁয়া অনুভব করে। হয়ত-বা এমনই এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে শেষবারের মতো সিনেট অধিবেশনে হাজির হয়েছিলেন সিজার সেটা কি গতকাল, না কি হাজার বছর আগের একদিন? কলোসিয়াম দেখতে যায় সে। হাজার বছরের অভিমান বুকে নিয়ে নিঃসঙ্গ-নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলোসিয়াম; সময় এখানে স্হির, কান পাতলেই ভিতর থেকে ভেসে আসে জনতার কোলাহল ও গ্লাডিয়েটরদের আত্মার আহাজারি। এখানে এখন কোনও যুদ্ধ নেই, আছে সময়ের শাশ্বত নীরবতা। ভ্যাটিকান সিটি না দেখলে রোমে আসার কোনও মানে হয় না; তাই ভ্যাটিকান দেখতে যায় হাসান। চত্তরের কবুতর মাথায় নিয়ে ছবি তোলে সে; কবুতরগুলো খুব মিশুক প্রকৃতির, হাতে চিপস্ বা কোনও কিছু ধরলেই খাবার জন্য হাতের উপরে চলে আসে; হাত থেকে খুঁটে খুঁটে খাবার খায়; ছবি তোলার সময় মাথার উপরে উঠে বসে। ওরা ভালো করেই জানে এখানে কেউ ওদের কোনও ক্ষতি করবে না। এই শহরের সড়ক, ইট-কাঠের ইমারত, আর সব মহান ভাস্কর্যের সাথে মিশে আছে অতীতের বলা ও না বলা গল্প। অতীতের হাত ধরে বর্তমানের রোম চলেছে ভবিষ্যতের পানে।
রোম শহরের কেন্দ্র ভিক্টোরিয়াতে (কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও ট্রাম স্টেশনের কাছে) আরও একটা রোমের সাথে পরিচিত হয় হাসান। যেখানে গেলে কেউ বুঝতেই পারবে না, এটা গুলিস্তান না রোম শহর; প্রচুর বাঙালির কোলাহলে মুখর এমন এক পরিবেশ। বিদেশীদের ভিড়ে ইতালিয়ানারা যেখানে কোণঠাসা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাঙালিদের আড্ডা, সাথে পাকিস্তানি ও চাইনিজ মিলে পরিবেশটা অন্যরকম। বাংলাদেশের সব কিছু পাওয়া যায় এখানে; রোমে যে এতো বাঙালি বাস করে, সেটা হাসান কল্পনা করেনি। এই বিপুল সংখক মানুষের অধিকাংশ অবৈধ; আবার হাসানের মতো ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে ছুটে এসেছে বৈধতার আশায়। সবার ভিতরে ঈদের আনন্দের মতো খুশী কাজ করছে; ইতালির বৈধ কাগজ নিয়ে দেশ থেকে ঘুরে আসার জন্য সবাই উন্মুখ।
অধিকাংশ অবৈধ বাংলাদেশীরা রাস্তার সিগনালে দাঁড়িয়ে গাড়ির গ্লাস পরিস্কার করে, সিগনাল পড়লে যখন গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকে; এটাকে তারা ডান্ডা মারা বলে। কেউ সিগনালে দাঁড়িয়ে পকেট টিসু, সিগারেট লাইটার বিক্রি করে। অনেকে প্রতিদিন সকালে বাজারে ছোট ছোট পুটলি করে মহিলাদের কাছে রসুন বিক্রি করে; অনেকে রাতে রেস্টুরেন্ট, বার, পাব ও ডিস্কোতে ঘুরে ঘুরে ফুল বিক্রি করে, জার্মানির মতো। এই সবগুলোই খুব নিকৃষ্ট ও অপমানজনক কাজ, যেটা একমাত্র বাংলাদেশীরা করে। ইতালিয়ানরা এই সব মানুষকে করুণার চোখে দেখে এবং ভিক্ষুক মনে করে। অল্প পরিশ্রমে বেশি টাকা উপার্জন করা যায় বলে অনেক বৈধ বাংলাদেশীও এই কাজ করে; ভালো কাজ করার সুযোগ থাকা সত্বেও। আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক গরিব দেশের লোক ইতালিতে আছে, যারা বাংলাদেশীদের চাইতেও গরিব; কিন্তু তাঁরাও এই কাজগুলো করে না, তাদের আত্ম সন্মানে বাঁধে। অথচ বাংলাদেশীদের মধ্যে কোনও অপমানবোধ নাই; বরং তাদের হাব-ভাব দেখে হাসান নিজেই অবাক।
দুই সপ্তাহ রোমে থাকার পর পাসপোর্ট নিয়ে ব্রিক্সেন ফিরে যায় হাসান। ব্রিক্সেন শহরের পূর্ব দিকে পাহাড়ের অনেক উপরে ছোট্ট একটি গ্রামের নাম রাস। এই রাসে মামার এক ইতালিয়ান বন্ধুর বাড়ি; বন্ধুটির নাম মিখাইল। অনেক আঙুর ও আপেল বাগানের মালিক মিখাইল। মামা মিখাইলের বাড়ি ভাড়া নিয়েছে থাকার জন্য। সবচেয়ে বড় কথা মিখাইলের মাধ্যমে বোলজানোতে হাসানের বৈধ হবার কাগজ জমা দেবার ব্যবস্হা করেছে মামা, তাই বিশেষ করে মিখাইলের বাড়িতে হাসানের থাকাটা জরুরী। হাসান মিখাইলের বাগানে কাজ করবে, এই কারণ দেখিয়ে হাসানের কাগজ জমা দিয়েছে মিখাইল। হাসানের সব সমস্যার সমাধান করে দিয়ে, মামা দুই মাসের জন্য দেশে বেড়াতে যায়। যাবার আগে যথেষ্ট বাজার করে দেয় মামা, যাতে হাসানের কোনও কিছুর অভাব না থাকে এবং মিখাইলকে হাসানের খেয়াল রাখতে অনুরোধ করে মামা। হাসানের কাছে যথেষ্ট টাকা আছে, সেটা সমস্যা নয় সমস্যা হলো পাহাড়ের উপরে নির্জন একটা বাড়িতে এই শীতের দুই মাস একা থাকতে হবে হাসানকে! হাসানের সমস্যা এটাই; পৃথিবীর কোনও কিছু ভয় না পেলেও, একটা জিনিসকে হাসন প্রচুর ভয় পায়; আর সেটা হচ্ছে ভূত!
উত্তর থেকে দক্ষিণ বরাবর প্রধান সড়কটি গ্রামের মধ্য দিয়ে গিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এঁকে-বেঁকে নেমে গেছে ব্রিক্সেন শহরে। রাস্তার দুই দিক দিয়েই শহরে যাওয়া যায়; তবে দক্ষিন দিক দিয়ে শহর কাছে। রাস্তার দুই পাশে ছড়ানো ছিটানো গ্রামের বাড়িগুলো; দক্ষিণ দিকের শেষ বাড়িটি মিখাইলের, তারপর আর কোনও বাড়ি নেই। বড় একটা উঠানের মাঝে পৃথক দু’টি বাড়ি; রাস্তার দিকে মুখ করা প্রথম বাড়িটিতে মিখাইল থাকে তার পরিবার নিয়ে; উঠানের শেষ মাথার কাঠের দোতলা বাড়িটি সারা বছর প্রায় খালি পড়ে থাকে, শুধু আপেল পাড়ার সময় এবং শীতের শেষে ক্ষেতে সালাত চাষ করার জন্য যে শ্রমিক কাজে আসে, তারা কিছু দিন থাকে এই বাড়িতে; এই বাড়ির পিছন থেকে শুরু আপেল বাগান। কিন্তু এখন এই বরফ পড়া শীতে এই বাড়ির একমাত্র বাসিন্দা হাসান।
আপাতত কোনও কাজ নেই হাসানের; সারাদিনে একবার কিছু রান্না করে, অথবা রাঁধতে মন না চাইলে গ্রামের একমাত্র বার ও পিজ্জারিয়াতে গিয়ে পিজ্জা খেয়ে দিন কাটিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে দুপুরে বাসে করে ব্রিক্সেন যায়, কিছু কেনাকাটা করে সন্ধ্যা সাতটার শেষ বাস ধরে আবার ফিরে আসে। পাহাড়ের বিশালতার মাঝে নীরবে তুষারপাত দেখে সময় কাটে তার; মাঝে মাঝে তুষারপাতের তীব্রতায় তার মনে হয়, যেন সাদা বন্যায় ভেসে যাচ্ছে প্রকৃতি, সমস্ত পৃথিবী ডুবে যাবে নরম তুলোর মত বরফে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশে থাকতে জীবনে যে হাসান পাহাড় দেখেনি, এখন তার সময় কাটে পাহাড়ের সাথে গল্প করে। বিকালে যখন মিখাইল আপেল গাছের ডাল ছাঁটে, তখন মিখাইলের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটায় হাসান; প্রতিদিন সন্ধ্যায় একবার বারে যায় সে। ইতিমধ্যে বার মালিকের সাথে ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে তার এবং শনি ও রবিবার পিজ্জারিয়াতে পার্ট টাইম কাজ করে সে; কারণ, এই দুই দিন প্রচুর কাস্টোমার হয় দোকানে; আবার যখন প্রচুর বরফ পড়ে তখন দোকানের সামনে বরফ পরিস্কার করে দেয় হাসান; বিনিময়ে ঘন্টা প্রতি ইতালিয়ান দশ মিলা লিরা (প্রায় জার্মান দশ মার্ক)। হাসানের হিসাবে বসে না থেকে কিছু করে সময় কাটানো অনেক ভালো।
আকাশ ঘন মেঘে আচ্ছন্ন থাকে প্রায়, আর যখন বরফ পড়ে তখন পড়তেই থাকে; মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মেঘ ছুঁয়ে যায় হাসানের শীতল শরীর; তখন আকাশের প্রতি দু’হাত প্রসারিত করে সে মায়াকোভস্কির কবিতা আবৃত্তি করে, ‘আমিতো মানুষ নই, পোষাকে ঢাকা একখন্ড মেঘ।’ তবে হাসান খেয়াল করে বরফ পড়ার সময় তেমন ঠাণ্ডা লাগে না, ঠাণ্ডা লাগে পরে। সন্ধ্যায় ঘরের হিটার চালিয়ে দিয়ে বিয়ার পান করে আর সিডি প্লেয়ারে গান শোনে, মান্না দে’র গান, ‘যদি হিমালয় আল্পসের সমস্ত জমাট বরফ একদিন গলেও যায়, তবুও তুমি আমার।’ এই গান হাসান জীবনে কতবার শুনেছে তার কোনও হিসাব নাই, কিন্তু এখন এই নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় মদিরার মায়ায় এই গান অন্তরে এক অন্য অনুভূতি জাগায়; সে মনে মনে বলে, আল্পসের বরফও কোনও দিন গলবে না, আর তুমিও কোনও দিন আমার হবে না। এই ভাবে হাসানের দিন যায়, সন্ধ্যা যায়, কিন্তু সমস্যা শুরু হয় রাতে। গাড়ি চলাচলের আওয়াজ এক সময় থেমে যায়, রাতের শুনসান নীরবতায় হাসানের শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে; ভয়ে সে লাইট বন্ধ করতে পারে না, তাই রাতে লাইট জ্বালিয়ে ঘুমায়। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো, সারা জীবনে যতো ভূতের সিনেমা দেখেছে সে, সবগুলো স্মৃতি রাতেই মনে আসে; যদিও সে চায় ভুলে যেতে, তবু জোর করে তারা মনে আসে।
দুই মাস পর দেশ থেকে রবি মামা ফিরে আসে। মামার সাথে সুদ টিরোলের বিভিন্ন শহর ঘুরে বেড়ায় হাসান। মামা একদিন বলে, ‘চল, তোকে জুলিয়েটের বাড়ি দেখিয়ে নিয়ে আসি।’
মামা, এটা কি সেই শেক্সপিয়রের জুলিয়েট?
হ্যাঁ।
হাসান খুব উত্তেজিত, তার আর দেরি সইছে না। পাশেই ভেরোনা শহর, হাইওয়ে ধরে গেলে কয়েক ঘন্টার পথ; এখানে জুলিয়েটের বাড়ি। ভেরোনা শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে ছিল জুলিয়েট (ইতালিয়ান উচ্চরণ জুলিয়েত্তা), বাকি গল্প সমস্ত পৃথিবীর জানা। একদিন সকালে মামা তার বন্ধু ইসলামকে নিয়ে তিন জনে বেরিয়ে পড়ে জুলিয়েট দর্শনে। ঘন্টা চারেকের মধ্যে ওরা ভেরোনা পৌছে গেলো। শহরে ঢুকে অনেক অলি-গলি পেরিয়ে, পুরাতন আমলের পাথর বসানো পথ ধরে হাসান এসে দাঁড়ালো জুলিয়েটের ব্যালকনির নিচে; যেখানে একদিন রোমিও এসে দাঁড়াতো জুলিয়েটের ভালোবাসার টানে। খুব সরু গলি, পুরাতন ঢাকার গলির মতো; বাড়িটি আগের মতোই আছে; যেমন ছিল জুলিয়েটের সময়ে। হয়ত বা সময়কে এভাবে ধরে রাখা হয়েছে, ভবিষ্যতের জন্য। এখানে যত মানুষ আসে প্রেমিক অথবা প্রেমিকা, সবাই ব্যালকনির সামনের দেয়ালে নিজেদের নাম লেখে (ওমুক+তমুক), এটাই নাকি রেওয়াজ। হাসানও তার নাম লেখে, কিন্তু সমস্যা হয় পাশে কার নাম লিখবে সে? কারণ, পাশে লেখার মতো কোনও নাম তো হাসানের জানা নাই; তাই জায়গাটা খালি পড়ে থাকে। হাসান খালি জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকে; খালি জায়গাটাও তাকে অনেক প্রশ্ন করে, যার উত্তর হাসানের জানা নাই। মামা হাসতে হাসতে বলে, কেন, তোর ছোটবেলার বান্ধবীর নাম লিখে দে।
মামা, ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে।
চল, এবার যাই।
এতো দূর থেকে আসলাম, জুলিয়েটকে না দেখেই চলে যাবো মামা? হাসান মাথা উঁচু করে ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘জুলিয়া, দোভে ছেই?’(জুলিয়া, তুমি কোথায়?) যৌবনের পাগলপারা আর কী। কিন্তু উপস্হিত সকল দর্শনার্থী হাসানের এই পাগলামী দেখে মজা পায় এবং হাসতে থাকে। গলিতে ঢোকার মুখে জুলিয়েটের একটা ব্রোঞ্জের মূর্তি আছে; সেই মূর্তির বাঁম স্তন স্পর্শ করে কোনও কিছু মানত করলে নাকি মনোবাসনা পূর্ণ হয়; সবাই তাই করছে, হাসানও জুলিয়েটের স্তন স্পর্শ করে, কিন্তু কী যে সে কামনা করে তা সে নিজেও জানে না, এবং এই ব্যাপারে তার কোনও মাথা ব্যাথাও নাই; সে তো জুলিয়েটের জগতে হারিয়ে গেছে।
[চলবে]



