
দৃশ্যপটঃ দৃশ্যের পর দৃশ্য, দৃশ্যের পর দৃশ্য …দৃশ্যের অন্তর্ধান
লুৎফুল হোসেন
দৃশ্যঃ এক
দীনবন্ধু মিত্র যখন নীলচাষীদের কান্নার ধ্বনিকে শব্দের সৌকর্যে সাজালেন কালোত্তীর্ণ সাহিত্য উপস্থাপনায় তখন রাজা রামমোহন বললেন ‘নীলচাষের জমির নিকটবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবনযাত্রার মান অন্যান্য অঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের তুলনায় উন্নততর। নীলকরদের দ্বারা হয়ত সামান্য কিছু ক্ষতি সাধিত হতে পারে, …নীলকর সাহেবগণ এদেশীয় সাধারণ মানুষের অকল্যাণের তুলনায় কল্যাণই করেছেন বেশী।’
দ্বারকানাথ বাবু বললেন, ‘নীলচাষ এদেশের জনসাধারণের পক্ষে সবিশেষ ফলপ্রসূ হয়েছে। জমিদারগণের সমৃদ্ধি ও ঐশ্বর্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষকদের বৈষয়িক উন্নতি সাধিত হয়েছে’।
বৃটিশ শাসনের কল্যাণে এভাবে পশ্চিমা সুবাতাসে যখন আধুনিক ভারত জন্ম নিচ্ছিল গ্রাম্য কৃষকদের জীবন-শ্রম-ঘামের বিনিময়ে। তখন বঞ্চিত, বিধ্বস্ত, লুণ্ঠিত কৃষকরা আধুনিকতার মোহমগ্ন লাভবান বাবু আর রাজাদের পেছন থেকে সরে দাঁড়াবার মতন একটা অবস্থায় কোণঠাসা হতে থাকলো।
সংগ্রাম আর লড়াইয়ের পেছনে চিরকালীন উৎস শ্রেণীস্বার্থ তাই অচিরেই খুঁজে নিলো তাদের নব্য নেতৃত্বকে। সংখ্যাগুরু মধ্যবিত্ত যখন স্বার্থের টানাপোড়েনে হুঁশ জ্ঞানে সম্বিত পেলো, সরব হলো- তখন অচিরেই নেতৃত্ব সমর্পিত হতে চললো সংখ্যার বেদীতে। রাজাবাবুদের পেছন থেকে সরে মানুষ সারিবদ্ধ হতে থাকলো সোচ্চার মধ্যবিত্তের পেছনে। কৃষক বিদ্রোহ আর সচেতন মানুষের স্রোত সাধারণের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলো শিক্ষিত বাবুদের। অসহায়, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, চাষী, মজুর যখন বুঝলো বাবুদের শোষণের খড়গ হাত থেকে নিস্তার নেই, তার দুঃখ যন্ত্রণার গান শোনার জন্যেও কেউ অপেক্ষায় নেই, আকুতি জানাবার জন্য পাথরের দেবতা ছাড়া আর কেউ নেই, সমর্পণের স্রষ্টা ছাড়া বিকল্প নেই, তখন ধর্ম আর ধর্মের আলখাল্লায় মোড়ানো অন্ধবিশ্বাসে তাদের আস্থার শিকড় প্রোথিত হতে শুরু করলো। অনায়াসে ছিন্নমূল মানুষের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠতে থাকলো ধর্মীয় নেতাদের।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসব প্রেক্ষিতের চাপে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন যখন ব্যাপকতা লাভ করছিল। তখন ইংরেজরা সেই বিখ্যাত ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসির সুকৌশলী প্রয়োগে সচেষ্ট হল। ইংরেজদের অস্ত্র ভান্ডারে এবার তারা যোগ করল হিন্দু-মুসলিম বিভেদ বৈষম্যের কলকাঠি। চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ এই তিন বিভাগের সাথে আসামকে যুক্ত করে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের সাম্প্রদায়িক বোধকে অখণ্ড ভারত বিভাগের নিউক্লিয়াস হিসেবে সৃষ্টি করা হল। ক্রমশ দুর্বল হিন্দু রাজাদের বাদ দিয়ে মুসলমানদের দলে টানবার জন্য লর্ড কার্জন ১৯০৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী ঢাকা এসে মুসলমানদের জন্য নানান প্রলোভনের ফাঁদ পাতলেন। বললেন বঙ্গভঙ্গ হলে মুসলমানদের স্বার্থ প্রাধান্য পাবে, ঢাকা হবে নতুন প্রদেশের রাজধানী।
চাকরি-বাকরি-শিক্ষা-প্রতিষ্ঠা সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া মুসলমানরা প্রভাবিত হল অনেকটা। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ খুব উৎসাহী হলেন। শিক্ষিত মুসলমানরা যেন সৌভাগ্যের সকাল দেখলেন। সর্বাগ্রে তাদের নিজেদের স্বভাবেই সুবিধাভোগী অবস্থানপুষ্ট হিন্দুরা করল বিরোধিতা। সত্য আর আপাত সত্যের দ্যোদুল্যমানতায় অনেক হিন্দু অনেক মুসলমান তারপরও চাইলেন অখণ্ডতা।
সূত্রপাত হল স্বদেশী চিন্তার, বিকাশ ঘটল চরম পন্থার, চরমপন্থীরা বিদেশী দ্রব্য বয়কটের ডাক দিল। কংগ্রেস হল দ্বিধাবিভক্ত। স্বদেশী আন্দোলনে সমর্থন দিলেও বয়কটের আন্দোলনকে সমর্থন দিলেন না সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এমনি অনেকে। দরিদ্র হিন্দু-মুসলমানদের অনেকেই কম দামী বিদেশী পণ্য বাদ দিয়ে দেশী পণ্য ব্যবহারের বাস্তবতায় আসতে পারলেন না।
শুরু হলো সুবিধা-অসুবিধা, লাভ-ক্ষতির টানাপোড়েন। শুরু হলো শ্রেণী বৈষম্যের রূপরেখায় পরিস্ফুটন। তখনও এদেশের মানুষের সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না যে, শ্রেণীবিভক্ত সমাজে বিদ্রোহ কখনও সুশৃঙ্খল পথে আগায় না। স্বদেশী আন্দোলনোর ভেতর থেকেই ক্রমান্বয়ে অহিংসতা ছাপিয়ে জন্ম নেয় সহিংসতা। স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর বৃটিশ শাসককূলের কল্যাণে মরিয়া হয়ে আপামর জনসাধারণ যখন সহিংসতার পথ বেছে নিতে বাধ্য হল, তখন, শাসক-শোষকতন্ত্রের ভাষায়, জন্ম নেয় ‘সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন।’ সময়ের চক্রে চরমপন্থীদের শ্লোগান ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় আন্দোলনও দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। হিন্দু বিপ্লবীরা এর মধ্য দিয়েও চাইলেন হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণ ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা; বিপ্লবী দলের সদস্য হবার জন্যে চালু হল কালীমূর্তির সামনে প্রতিজ্ঞা, গীতা স্পর্শ করে শপথ গ্রহণ। সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে অংশগ্রহণে মুসলমানরা হল অসুবিধার সম্মুখীন। ক্রমশ নেতৃত্ব কুক্ষিগত করতে থাকল হিন্দুরা।
মাওলানা আবুল কালাম, যিনি প্রথম মুসলিম হিসেবে সন্ত্রাসবাদী দলের সদস্যপদ লাভ করেন, তিনি লিখেছেন, ‘বিপ্লবী দলগুলোর সদস্য সংগ্রহ করা হতো হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী থাকে। প্রকৃতপক্ষে তখন সবগুলো বিপ্লবী দল ছিল সক্রিয়ভাবে মুসলিম বিরোধী। …বিপ্লবীরা অনুভব করতো যে, ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পথে মুসলিমরা বাধাস্বরূপ। আর তাই অন্যান্য বাধার মত তাদেরকেও অবশ্যই অপসারণ করতে হবে’।
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শিক্ষিতরাও এভাবে হিন্দু মুসলমান বিরোধ সৃষ্টি করল। ১৯০৬-০৭ সালে দাঙ্গা এই সাম্প্রদায়িক সমস্যাকে তীব্রতর করল। দেশপ্রেমের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত অথচ ভিন্ন সম্প্রদায়কে সহ্য করতে অপারগ!
‘দেবী চৌধুরানী’ আর ‘আনন্দমঠ’ লিখে বৃটিশ শাসনমুক্ত রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছিলেন তা ছিল অন্য অর্থে হিন্দু রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রেরণায় বিকৃত এক সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনার নথিবদ্ধতা। প্রাজ্ঞ আহমদ ছফা তাই লিখেছিলেন, ‘শতবর্ষের ফেরারী; বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।’ মুসলমান সমাজকে ইতিহাসবঞ্চিত করার এক প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টা এভাবে মুসলমান সম্প্রদায়কে আরেকটি ধর্মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছে। শাসক শক্তির বিরুদ্ধে পরাজিত সাধারণ মানুষ যখন একদিকে ধর্মীয় চেতনার কাছে সমর্পিত হচ্ছে অন্যদিকে শোষিতের সংগ্রামে সাহসী শরীয়ত উল্লাহ আর তীতুমীরেরা সামগ্রিকতার অভাবে সাহসের সৌকর্য হারালেন পরাজিতের এপিটাফে। মানুষ তখন আলোড়িত হল, কাঁদলো। কিন্তু জয়ী হতে পারলো না।
ইংরেজ রাজকর্মচারী, গোয়েন্দা প্রধান হিউম শিক্ষিত শ্রেণীকে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনে নিপীড়িত কৃষক ও দরিদ্র মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রয়াসে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা হলেন। কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় তাই ভারতের বাহাত্তর জন প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে বৃটিশ ন্যায়পরায়ণতা ও মহানুভবতার প্রতি আস্থা ব্যক্ত করেন। ওই সভার প্রত্যেক বক্তাই ছিলেন এই বক্তব্যের সমর্থক ও অনুসারী। পরবর্তীতে ধর্মীয় দ্বন্দ্ব আর ইংরেজ প্রেরণায় হিন্দু রাজনৈতিক আবেদনের যুগে মুসলিমদের স্বার্থ সংরক্ষণ আর অবস্থান গঠনের দাবীতে সৃষ্টি হয় মুসলিম লীগ। এই দলও ছিল ইংরেজ শাসকদের আশীর্বাদ পুষ্ট।
ইংরেজরা সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টিতে সফল হলেও দীর্ঘ সহিংস সংগ্রামের পথ থেকে সরে গান্ধীর অহিংস মতবাদ আর জিন্নাহর সংখ্যালঘু মতবাদের কল্যাণে উভয় দলই জমিদার শ্রেণী, ব্যবসায়ী আর ইংরেজ শাসনের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে থাকে। সাম্যবাদীদের কৃষক সমর্থনপুষ্ট ও অধিকার সচেতন আন্দোলন তাই বার বার গান্ধী আর জিন্নাহর রাজনৈতিক মতবাদের চাপে মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর তাই স্বভাবতই ক্রমশ শোষিতের ও বঞ্চিতের স্বার্থে গড়ে উঠতে থাকে বামপন্থী রাজনীতি।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মুসলিম জোতদার আর অন্যান্য মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা গঠন করে প্রজা সমিতি। পরিণতিতে মুসলিম লীগ অনেকটা শক্তি হারায়। বামপন্থীরা জমায়েত হয় প্রজা সমিতির সমর্থনে। বামপন্থীদের চাপে ১৯৩৩ সালে প্রজা সমিতির নাম পরিবর্তিত হয় ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ নামে।
অনেক বিরোধের পরও নির্বাচনের স্বার্থে কৃষক প্রজা পার্টি আর মুসলিম লীগ এক হয়ে শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে প্রধানমন্ত্রী করে মন্ত্রীসভা গঠন করে। মন্ত্রীসভা গঠনের পর কৃষকদের পক্ষে কিছু আইনও পাশ করে। বিষয়টা এ পর্যায়ে কৃষক প্রজা পার্টিকে দুর্বল করে দেয়। মুসলিম লীগ নেতৃত্বের করায়ত্বে ধরাশায়ী ফজলুল হক ক্রমান্বয়ে ম্রিয়মান ও মুসলমান জমিদারদের স্বার্থ ক্রমশ জোরদার হতে থাকে। বাঙালি চেতনার ধারক ও অসাম্প্রদায়িক হিসেবে পরিচিতি লাভ করা ফজলুল হক এভাবেই হয়ে ওঠেন সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রস্তাবক। পাথর চাপা পড়লো বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা।
দৃশ্যঃ দুই
বঙ্গভঙ্গকে যারা মানেন নি ১৯০৫ সালে, অভাবনীয় হলেও সত্যি যে, তারাই ১৯৪৭ এর বিভাজনকে স্বাগত জানালেন। ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে মুসলমানদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক হিন্দুর মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। হিন্দুদের কেউ কেউ মনে করলেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে হিন্দুরা নির্বাচনে বরাবরই মুসলমানদের সাথে পেরে উঠবে না।
১৯৪৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতির মধ্য দিয়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বঙ্গভঙ্গের দাবি তুললেন। নিখিল ভারত কংগ্রেসের সভাপতি আচার্য কৃপালিনী ১৯৪৭ সালের মার্চে প্রকাশ্যে বঙ্গভঙ্গ দাবির সমর্থন করেন। একই বছর ৫ এপ্রিল তারকেশ্বরে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে হিন্দুবঙ্গ প্রদেশ গঠনের দাবী উত্থাপিত হয়। কংগ্রেসের হিন্দু-মুসলমান সব নেতারা ক্রমান্বয়ে এই একই দাবিতে সোচ্চার হলেন।
১৯০৫ সালে অখণ্ড ভারতের কর্তৃত্বের দাবিদার হবার আশা-আকাঙ্ক্ষা যে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য হন্যে করেছিল, সেই মানুষগুলোই নিজেদের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে সোচ্চার হলেন এবার বিভাজনের দাবিতে। উভয় সময়েই অগ্রণী হলেন শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায়। বঙ্কিমচন্দ্র আর শ্যামাপ্রসাদের স্বপ্ন ঠিক ঠিক না ফললেও অখণ্ড ভারত ভাগ হল। সৃষ্টি হল বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের গৌরবের(!) রাষ্ট্র পাকিস্তান। ইংরেজ শাসক আর স্বার্থান্বেষী মহলের কৃপায় অনেকটা বিনা কষ্টেই জন্ম হল পাকিস্তানের। যেনবা এক রকম অনায়সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের অবয়ব পেলো ‘লাড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ আন্দোলন।
দৃশ্যঃ তিন
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবার নব্য জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাতলেন নতুন নেশায়। দুই শতকের গোলামীর রেশ ধরেই সম্ভবত, ইংরেজি ভাষায় দিলেন এক অভিনব বক্তৃতা, বললেন, উর্দুকে করতে চান রাষ্ট্রভাষা। স্বাধীন পাকিস্তান সৃষ্টির দুই-তিন বছরের মধ্যেই ঘটে গেল এমনটা। বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরাই সংগ্রাম করে প্রতিষ্ঠা করল যে পাকিস্তানের, সেখানে তাদের স্বাধীনতা অচিরেই হতে শুরু করল কন্টকিত। বাংলার মানুষ এবার আবার জাগলো নতুন সংগ্রামে। অবাক হবার মত হোক আর নাইবা হোক, বাঙলার দাবি নিয়ে উর্দু শব্দ ধার করে সৃষ্টি হলো নতুন রাজনৈতিক পরিচয়, ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’।
আবারো সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ইস্যু বাঙালি হিন্দুদের মতন গ্রাস করল উর্দুভাষী পাকিস্তানিদের; সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের চাপিয়ে রাখার জন্য তাই রাজধানী ইসলামাবাদকে ঘিরে উর্দুভাষীরা চালু করতে থাকল একের পর এক শোষণ নীতি।
চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দুদের সাথে পিছিয়ে পড়া বাঙালিরা এবার অবদমিত হতে থাকল উর্দুভাষী পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছে। বঞ্চিত হতে থাকল বাঙলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক। ধর্মের কড়িকাঠ ছেড়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ জায়গা করে নিতে থাকল সব বাঙালির মনে। শিক্ষিতরা চাকরি-ব্যবসা-প্রশাসন কোথাও স্থান না পেতে পেতে কোণঠাসা হল। কল-কারখানা-ব্যাংক-বীমা সব পশ্চিমাদের দখলে। কৃষকের ঘাম ঝরা শ্রমের ফসল সোনার পাহাড় জমাতে থাকল পশ্চিমাদের ঘরে। খাদ্য-বস্ত্র-আবাসনের বঞ্চনার পীড়নে মানুষের যখন দিশেহারা হবার যোগার, তখন যুক্ত হল মাতৃভাষা কেড়ে নেবার মতন দমন নীতি।
অনেকটা অবধারিতভাবেই ধর্মের বদলে সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা হল শ্লোগান। ধর্মকে পুঁজি করে হাজার বছর পৃথিবীময় শাসনের ইতিহাস বাঙালিকে বিক্ষুব্ধ না করলেও, ধর্মের নামে নতুন রাষ্ট্রযন্ত্রের মায়ের ভাষা কেড়ে নেবার মতন দুঃসহ অপচেষ্টা রুখে দাঁড়াতে সোচ্চার হতে থাকল আপামর মানুষ।
১৯৫০ এর ৭ জুন মুক্ত এলাকা দিবস পালিত হল, পোস্টারে উঠে আসলো হাতুড়ি ও কাস্তে। স্পষ্ট হতে থাকল বিভেদের নতুন রূপেরেখা – বাঙালি আর অবাঙালি।
দৃশ্যঃ চার
নতুন রাষ্ট্র, নতুন স্বাধীনতা চার বছর না পেরোতেই স্বাধীন দেশের রাজপথ রঞ্জিত হল স্বদেশী নব্য শাসকের ঘাতক হাতে। শোষণ-বঞ্চনা-নিপীড়ন-অত্যাচার নতুন করে আবারও জাগালো সমগ্র বাঙালি জাতিকে। বাঙলার মাটি বাঙালির রক্তে ভিজে যেন আরও বলীয়ান হল তেজে।
এভাবেই দানা বাঁধতে থাকলো পৃথিবীর বুকে মাতৃভাষার জন্য একটি জাতির ব্যতিক্রমী নতুন আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯০৪, ১৯৪৭’র পর আবারও আরেক ফেব্রুয়ারি এলো ১৯৫২ সালে এই বাঙলায়। ইতিহাসের পাতায় সৃষ্টি করে গেল আরেক অমর অধ্যায়। বাঙলা ভাষার জন্যে আন্দোলনে উদ্বেল সারা বাঙলা, সমগ্র বাঙালি জাতি। অভাবনীয় উন্নাতাল আন্দোলন ‘রাষ্ট্রভাষা উর্দু’ প্রতিরোধে সরব রাজপথ, জনপদ, গ্রাম, বন্দর। পোষ্টারে, ফেস্টুনে, ব্যানারে, শ্লোগানে, মিছিলে, মিটিঙে, ঘরে, বাইরে বাঙালির আকাশ কাঁপানো দাবি– ‘রাষ্ট্রভাষা বাঙলা চাই’। মুখরিত জনপদ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতায়। অক্ষম-অপারগ শোষক ও শাসনযন্ত্র বেছে নিল অত্যাচার, নিপীড়ন, গ্রেপ্তার, জেল, হত্যার মতন অকথ্য হাতিয়ার।
দৃশ্যঃ পাঁচ
একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। সকাল থেকে মিছিল শ্লোগানে প্রতিবাদ মূখর বাঙালি। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ, ব্যারিকেড, টিয়ার গ্যাস। শ্রান্ত দুপুরের ঢাকা শহরময় কাঁদানে গ্যাসে ভারী বাতাস, ক্লান্তিহীন মানুষেরা তখনও রাজপথ ছাড়ে নি। মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাঠে-রাস্তায় আলাপ-তর্কে মশগুল ছাত্র, নানা বয়সের মানুষ, পথচারী। রাজপথের দখল নিতে যেন নেমে এলো সবুজ হেলমেট আর খাকী পোষাকে সজ্জিত সশস্ত্র পুলিশ। মনে হয় গুলির সহজ দূরত্বে নেই বলে কাছে ডাকবার ছলে দূরত্ব কমিয়ে তারপরই পুলিশ ছঁড়তে শুরু করলো গুলি। মুহুর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল সব ছাত্র-জনতা। ছুটলো যে যার মতন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। ভয় আর বিহবলতা না কাটতেই আবিস্কৃত হল ছাত্রাবাসের ব্যারাকগুলোর দক্ষিণ দিকে শোকার্ত মানুষের জটলা। লম্বা, শ্যামলা, ক্লীনশেভ একটা মানুষ তলপেটে রক্তের কল খুলে দিয়ে তৃষ্ণা-কাতর হা করা যন্ত্রণাবিদ্ধ কন্ঠে আধো স্পষ্ট উচ্চারণে বলছে, ‘পানি! পানি!’
টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া থেকে বাঁচার জন্যে ভেজানো রুমাল নিংড়ানো কয়েক ফোঁটা পানি হয়তো রাখতে পারে, রাখলো, তার শেষ একটি ইচ্ছা পূরণের দাবির কিয়দংশ! শেষ উচ্চারণে দেবশিশু দিয়ে যায় নিজ পরিচয়– ‘আমার নাম আবুল বরকত। পল্টন লাইন… আমার বাড়িতে… খবর দিবেন…’
ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগে যখন পৌঁছালো এই দেবশিশু। তখন পাশেই ক্যানভাসের স্ট্রেচারে শায়িত আরেক স্বর্গের সাথী- যার মাথার খুলির ওপরটা নিখোঁজ।
চারপাশ ঘিরে আছে আহত মানুষের আর্তনাদ। আর যাঁরা হত বা আহত নয়, তাঁরা ভাষাহীন রুদ্ধবাক, দৃষ্টি অস্পষ্ট, হৃদয় ভাষাহীন আকুলতায় দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। আকাশে বাতাসে নিঃশব্দ আবেগে ছড়াচ্ছে অমোঘ ডাক- ‘জাগ্, বাঙালী জাগ্।’ মাতৃভাষার দাবী তোদের সংগ্রামে-সংকল্পে অনিমেষ সফলতা পাক। এই সব দেবশিশু এ মাটির বুকে চেতনার অনির্বাণ হয়ে থাক।
দৃশ্যঃ অযুত
হাসান হাফিজুর রহমানের একুশের সংকলনের পথ ধরে বাঙলার আবেগ বহমান। কবিতায়, গানে, গল্প ও কথকতায় বাঙলা আবহমান। বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারির বপিত বীজে আজ স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন দেশ বিশ্ব ভাষা দিবসের সৌকর্যে দীপ্ত দীপ্যমান। সেই থেকে রক্তে রক্তে নদী স্রোতস্বিনী এদেশ, মানুষ, সকলই স্বাধীন। অভিবাদন- সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত তোমাদের। তোমরা জানো কী এ বাঙলা মাটিতে কতটুকু তোমাদের অবদান! তোমরা দুঃখী- তোমরা এটুকু জানো না। আর তোমরা সুখী- কেননা জানো না, অমন ত্যাগের অর্ধ শতাব্দী পরও আমরা আদপে কতটা সুখ, কতটা অসুখ পেলাম।
দৃশ্যঃ নিযুত
মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা, সজাগ সত্তা, সচেতন বিবেক যাদের আছে তারা বুঝি ক্রমাগত কোণঠাসা। তাদের কলম ও কণ্ঠস্বর বুঝি ক্রমশ নিরব ও নিশ্চল হবার পথে হাঁটছে। তাদের বর্তমান নোনাজল ও রক্তে ভাসছে। তাদের উত্তরাধিকার হতবিহ্বল। মাটি ও শেকড়ের বন্ধন আজ যেন তাদেরই শ্বাস রুদ্ধ করতে তৎপর।
জন্ম কি এতটাই অভিশাপ! বেঁচে থাকবার জন্য কি আজ মা-মাটির বন্ধন ছিন্ন করে তাদের পালাতে হবে! এমন জীবন তবে কেনইবা যাপন!
আচ্ছা এসব ভাবনাগুলোও কি সমাজ সমষ্টির কাছে অবান্তর প্রসঙ্গ আজ ! না হয় কোথাও কেউ কিছু বলছে না কেন! কিছু করছে না কেন! আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্নগুলোর গায়ে যেন দ্রুত জমছে ছত্রাক। তবে এই দৃশ্যই জেগে থাক। মানুষ ঘুমাক।
দৃশ্যঃ অনাগত
এদেশে এখন জনশূন্য মাঝরাতেও বাতি ধরে নিয়ম মেনে চলে সব গাড়ী। কোথাও ঘুষ খায় না কেউ। নেতারা পকেটের পয়সা দিয়ে জনতার উপকার করে। কোথাও রাজকোষের একটা কড়িও অপচয়ে অকাজে ব্যয় হয় না। মানুষ সাগ্রহে ট্যাক্স ভ্যাট দেয়, সরকার তাদের স্বার্থ দেখভাল করে ভালো, তাই তা বাড়লেও কারো কোন প্রশ্ন নাই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এদেশে সব নাগরিকদের জন্য মিলছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। বইয়ের ওপর কোন কর নেই, মানুষ যেখানেই যাক হাতে একটা বই তার থাকেই। দেশের স্বার্থ ডিঙিয়ে ব্যক্তি বা পরিবার কি গোষ্ঠী কি দল কারো স্বার্থই প্রাধান্য পায় না কারও কাছেই। জাতীয় আয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে উর্ধ্বগতিতে ছুটছে জাতীয় সুখের সূচক। শুধু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা সমুদ্রতট শুধু নয় সবচেয়ে সুখী মানুষ দেখবার জন্যও লেগে থাকে পর্যটকদের ভীড়।
লেখকঃ কবি, কথাকার, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।



