
হাসনাত মোবারক
আমাদের দেশে মেলার অন্ত নেই। মেলা মানে অনেক। সব মেলাতেই বাণিজ্যের ব্যাপারটি থাকে। একমাত্র বইমেলাতে শুধু হয় হৃদয়ের বাণিজ্য। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮। গ্রন্থমেলায় প্রদর্শিত হয় বই।
হাজারে হাজারে, লাখে লাখে বই। অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাঙালি কৃষ্টি ও সংস্কৃতির এবং জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে। বইমেলার মতো এত বড় সাংস্কৃতিক উৎসব আর নেই। কিন্তু এই সাংস্কৃতিক উৎসবে কি পরিমাণ মানুষের উপস্থিতি! এটা কি একবার ভেবেছেন। তারা বাণিজ্যমেলাকে সাধারণের মাঝে নিয়ে যেতে পেরেছে। বইমেলার ঢেউ কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে পৌঁছাতে পারে নি।
এজন্য আমাদের রাষ্ট্র ও বিদ্ধমান সমাজব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বই পাঠের অভ্যাস ও বই সংগ্রহের মনমানসিকতা খুব প্রয়োজন।
যা শোভাবর্ধন করে তাকেই অলংকার বলে। শরীরকে চাকচিক্যময় রাখতে দামি পোশাক পরিধান করা হয়। মনের দরোজাকে খুলতে বই পড়তে হয়। আমরা যেমন দামি আসবাবপত্র থরে থরে সাজিয়ে রাখি।
বই যদি আপনার পড়ার সময় না থাকে, বাসায় থরে থরে সাজিয়ে রাখুন। দেখবেন আপনার সময় না হলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা সময় সুযোগে বই পড়ছেন। প্রত্যেক পরিবারে ছোট হলেও একটি লাইব্রেরী থাকুক।
এমন একটি স্লোগান এই দেশের ষোল কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। মানুষের আর যত সব বিষয়ে আপত্তি থাকলেও বইয়ের ব্যাপারে তেমন কার্পণ্য দেখি না। তবে বই সবার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ ও সীমাবদ্ধতার কারণে বই একটা দুর্লভ বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
আমি এই দেশের চৌষট্টি জেলার পথে-প্রান্তরে ঘুরে-ফিরে দেখেছি, যে মানুষটি অক্ষরজ্ঞানহীন, সেই মানুষটিকেও দেখেছি, বই হাতের কাছে পেলে, বই নেড়ে দেখে। বইয়ের সাদা পাতার মুদ্রিত কালো অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দু-একজন ব্যতিক্রম থাকতে পারে!
বইমেলা ও বইয়ের বিপণন নিয়ে কতিপয় প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘূরপাক খাচ্ছে। কেন এত সব প্রশ্ন মাথায় আসছে, এর উত্তর একবাক্যে বলে দেওয়া যায়। দীর্ঘদিন বই নিয়ে কাজ করি, তাই। আমাদের দেশে বেশ কয়েক বছর হল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে ও জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় জেলা এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আবার কিছু কিছু জেলা শহরের সাংস্কৃতিক জোট ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। যেমন বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রের সাত মাথায় বইমেলা এত জাঁকজমক নিয়ে বসে সেটা বাংলা একাডেমি আয়োজিত মেলার মতো ভিড় পড়ে যায়। একটা ইমেজ তৈরি হয় বইমেলার। এটা নিঃসন্দেহে একটি ভালো কাজ। অন্যান্য পণ্যের প্রদর্শনীর মাধ্যমে পণ্যের বিপণন বৃদ্ধি পায়। নতুন উদ্যোক্তা বাড়ে।
আমাদের দেশেও মাসব্যাপী বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। বইমেলাকে যদি বলা হয় প্রচারের মহিমা। হ্যাঁ। ঠিক আছে প্রচারে প্রসার। বইমেলা শেষে পরবর্তী বইমেলায় প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু উদ্যোক্তা বাড়তে দেখি নি। কোয়ান্টিটি বেড়েছে, কোয়ালিটি বাড়ে নি। এ বিষয়ে দ্বিমত থাকতে পারে। প্রকাশনা অন্যান্য দেশে সবচেয়ে সম্মানজনক একটা পেশা। প্রকাশনার বিষয় এবং কার্যক্রম অবশ্যই চৌকস ও মেধাসম্পন্ন কাজ।
যাই হোক বইমেলা পরবর্তী সময়ে বইয়ের বিপণন তেমন একটা হয় না। গুটিকতক প্রকাশনা সংস্থা ব্যতীত আরও যত সব নামেমাত্র প্রকাশনা যারা বই শুধু প্রকাশ করে।
তাদের প্রকাশিত বইগুলো পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য বাজারজাত করতে হয়, সেটা তারা জানে না। বা জেনে থাকলেও সেই পদ্ধতি সম্পর্কে তেমন আগ্রহ নেই। আগ্রহ না থাকার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটা যুক্তি খুব জোরালো। সেটা হল বেশিরভাগ প্রকাশকই সাইড বিসনেস বা শখের বসে প্রকাশনা খুলে বসেছেন।
আমাদের দেশে প্রকাশনা তো এখনও শিল্পে রূপান্তরিত হয় নি। সে প্রশ্ন ভিন্ন। এই যে হাজার হাজার গজানো প্রকাশনা হওয়ার অন্যতম একটা কারণ খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারছি। সেটা হল নামেমাত্র লেখকের সংখ্যা এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
তাদের বই বইমেলায় বের হতেই হবে। যত্রতত্র একটা বই প্রকাশ হলেই তিনি লেখক। ২০১৭ সালে বইমেলায় ৪১০০ নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল। এত সব বইয়ের মধ্যে কয়জন মানসম্মত লেখক আছেন! একবার ভাবুন তো! আমাদের দেশে এত সব লেখকের বই প্রকাশ হওয়া দেখে অনেকে নাক সিটকায়। আবার কেউ কেউ একে এপ্রেশিয়েট করে।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কারভাবেই বলতে হয়, আইবুড়ো নামটি ঘুচানোর জন্য যেমন বিয়ে দরকার হয়। তেমনি অনেক লেখক নিজেকে লেখক নামটি ফুটিয়ে তোলার জন্য বই প্রকাশ করে। এতে শিল্পের মান খোয়া যাচ্ছে। কাগজের অপচয় হচ্ছে।
লেখক ও প্রকাশক সমাজের কাছে যে কারণে একশ্রেণীর প্রকাশক গজিয়ে উঠছে। এতে শিল্পের মান নষ্ট হচ্ছে। এতে অনেক শিল্পজনকে আফসোস করেতে দেখি। বাংলা একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত একুশে গ্রন্থমেলায় মোট বই বিক্রি অর্থমূল্যতে কেউ কেউ সন্তুষ্ট। কিন্তু একটি জাতির রূপান্তরের জন্য এই পরিমাণ বই বিক্রি যথেষ্ট নয়।
প্রতিবছর চার হাজারের অধিক প্রকাশিত বইয়ের তালিকা দেখা যায়, বিজ্ঞাপন আর প্রচারের তালিকায় গুরুত্বহীন বইগুলোই শীর্ষে থাকে। যাতে করে সেই গুণ মানহীন বইগুলো পাঠকরা সংগ্রহ করেন।
পাঠ অনুপযোগী বই পাঠকের হাতে যখন পৌঁছে। পাঠক যখন কোনও বই পড়ে সাহিত্যরসে সমৃদ্ধ হতে না পারবে, পরবর্তীকালে সেই পাঠক বই পাঠের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এ জন্য বইয়ের মান নির্ধারণের সেন্সর বোর্ড প্রকাশনা সংস্থাগুলো শক্তিশালী সম্পাদনা বোর্ড থাকতে হবে।



