মুক্তমত

মিটফোর্ডের নৃশংসতা যে বার্তা দেয়


হাসান মামুন

মিটফোর্ড এলাকায় এক ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আইন উপদেষ্টা বলেছেন, এর বিচার হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, নাকি চাঁদা দাবি এর নেপথ্যে– এখনও অস্পষ্ট। যে কারণেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটুক, এ জন্য দায়ীদের কঠোরতম শাস্তি হতে হবে। রাজধানীর বুকে যে নজিরবিহীন নৃশংসতায় ওই ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছে, তার সুবিচার না হলে জনমনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ আরও গভীর হবে।

দিনের বেলায়, অনেক মানুষের সামনে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও তা রোধে কেউ এগিয়ে আসেনি। ভয়াবহ অপরাধ ঘটতে দেখেও মানুষ এগিয়ে না এলে বুঝতে হবে, তারা অসহায় বোধ করছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এটাকেই হয়তো বলতে চেয়েছিলেন, ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধ’। দুর্ভাগ্যবশত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা সরকারের আমলেও সাধারণ মানুষ এভাবে জিম্মি। প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনার বিবরণ দিতেও অনিচ্ছুক।

এ ঘটনায় মাঠে থাকা প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির তিন সহযোগী সংগঠনের কিছু লোক জড়িত। এদের চারজনকে দলটি বহিষ্কার করেছে আজীবনের জন্য। পুলিশ বলছে, কোনো দলের দিকে না তাকিয়ে তারা ব্যবস্থা নেবে। সেটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক দল কোনো ব্যবস্থা না নিলেও প্রশাসনকে নিজের মতো এগোনোর কথা। অতীতে এমন ঘটনায় রাজনৈতিক মহল থেকে সত্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তদন্তও হয়েছে বিপথগামী। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেসব ঘটা উচিত নয়; কিন্তু মাঠে থাকা সব দল সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকায় সেটা ঘটছে।
বর্তমান শাসনামলে সংঘটিত অন্যান্য অপরাধের বিচারে কতটা কী অগ্রগতি হচ্ছে– এ প্রশ্ন তোলাও এখন জরুরি। একই সময়ে খুলনায় বিএনপির এক কর্মী নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছেন। তিনি ছিলেন দল থেকে বহিষ্কৃত। কারও বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও তাঁর হত্যাকে হালকা করে দেখা যায় না। পুলিশ অন্তত এটা করতে পারে না। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ কী পরিস্থিতিতে রয়েছে, সেটাও জানা। এক বছর হতে চলল, সরকার তাদের যথেষ্ট সক্রিয় করতে পারেনি। মনোবলটুকুও ফিরে পায়নি; উল্টো তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে এখনও। একক কোনো দল এ জন্য দায়ী নয়। যারা যেখানে ক্ষমতাবান, তারাই সেখানে এসব ঘটাচ্ছে।

এ অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দল তার বেপরোয়া নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে এগিয়ে এলে পুলিশের পক্ষে কাজ করা সহজ হয়। মাঠে থাকা সব পক্ষই এমন অবস্থান নিলে অপরাধ কমে আসার কথা। তবে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবাইকে একই অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে না। গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ মনোবলহীন হয়ে পড়ায় মব বেড়েছে, সন্দেহ নেই। এ অবস্থায় মবের বিরুদ্ধে সব দলের জোরালো অবস্থানের পাশাপাশি সরকারের দৃঢ় ভূমিকাও প্রত্যাশিত। মব সন্ত্রাস দমনে সরকার শুরু থেকে এগিয়ে এলে মিটফোর্ডের মতো ঘটনা ঘটানোর সাহস কেউ পেত বলে মনে হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শুরু থেকেই মাঠে রয়েছে সেনাবাহিনী। তবে অভিযোগ, তারাও যথেষ্ট সক্রিয় নয়। সেটা কেন– এর সদুত্তর নেই।

এক বছরেও পুলিশকে সক্রিয় করতে না পারা নিঃসন্দেহে সরকারের বড় ব্যর্থতা। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেও অগ্রগতি নেই। এর এলিট ফোর্সকে বিলুপ্ত করারও দাবি উঠেছিল। সরকারকে এসব ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিতেও দেখা যাচ্ছে না। সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার অনিচ্ছুক নয়। অনেকে বরং ‘অতিউৎসাহী’ আখ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু সংস্কারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর করতে সরকারকে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ঘটে চলেছে শান্তি-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। ‘বৈশ্বিক শান্তি সূচকে’ এক বছরে ৩৩ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ।
গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়তে দেখা যায়। পুরোনো ব্যবস্থা তছনছ হওয়াতেই এমনটি ঘটে থাকে। বাংলাদেশেও সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটেছে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে। এতে বিশেষত পুলিশ নামক প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে পড়েছে নজিরবিহীনভাবে। সাধারণভাবে প্রশাসনও কম সক্রিয়। গণঅভ্যুত্থানের শক্তিগুলোও দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করছে না। এতে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র-তরুণদের একাংশের বিরুদ্ধেও উঠেছে অনিয়মে জড়ানোর অভিযোগ। মব উস্কে দেওয়ার অভিযোগও কম নেই। সব পক্ষের বিরুদ্ধেই রয়েছে প্রশাসনসহ রাষ্ট্র ও সমাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। এরই অংশ হিসেবে তৃণমূল পর্যন্ত চাঁদাবাজি ঘটছে।

নির্বাচনে ক্ষমতার রদবদল হলেও চাঁদাবাজির ক্ষেত্রগুলো হাতবদল হতে দেখা যায়। গণঅভ্যুত্থানে একটি পক্ষ কার্যত পলায়ন করায় নতুন চাঁদাবাজদের আবির্ভাব ঘটেছে নির্বিঘ্নে। ‘চাঁদার হার’ বাড়ানোরও খবর মিলছে। গোপনে রফা হয়ে গেলে বড় চাঁদাবাজির খবর জানার সুযোগও থাকছে না। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা মাঝে সভা করে এমনকি পণ্য পরিবহনে পরিকল্পিত দস্যুতার কথা জানিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরই মিটফোর্ডে ঘটে গেল ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা। এ ক্ষেত্রেও চাঁদার হার কমিয়ে গোপনে রফা করার চেষ্টা ছিল বলে শোনা যাচ্ছে।

বীভৎস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা থাকে অপরাধীদের মধ্যে। বিকারগ্রস্ত অপরাধীরাও এটা ঘটিয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং অপরাধীদের শাস্তির খবর ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়বে। অপরাধ মোকাবিলায় এগিয়ে আসার প্রবণতাও বাড়তে পারে। তবে ছোট-বড় সব অপরাধ দমনেই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
একই সময়ে চাঁদপুরে মসজিদে ঢুকে ইমামকে হত্যাচেষ্টার খবরও আমাদের আতঙ্কিত করেছে। ধর্মের বয়ান পছন্দ হয়নি বলে এক মুসল্লি তাঁকে হত্যার উদ্যোগ নেয়। এমন অসহিষ্ণুতা অতীতেও ছিল বলে এসব ঘটনাকে হালকা করে দেখার সুযোগ কিন্তু নেই। সাধারণ রাজনৈতিক অপরাধের চাইতেও বেশি গুরুত্ব দিয়ে এ ধরনের সহিংসতা রোধের কথা বলা হয়। দেশের ভাবমূর্তির জন্যও এটা জরুরি।
মিটফোর্ড এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দল বিএনপি চাপে পড়েছে। দলের দুর্বৃত্ত অংশটি নিয়ন্ত্রণে দলটির নেতৃত্ব উদাসীন নয় অবশ্য। কয়েক হাজার অভিযুক্ত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নিয়েছেন। তার পরও মিটফোর্ডের ঘটনায় বোঝা গেল, আরও কার্যকর কিছু করার রয়েছে। নজিরবিহীন পদক্ষেপের দিকেও যেতে হতে পারে তাদের। মব সন্ত্রাস যারা বন্ধ করেনি, তাদেরও নব-উপলব্ধি প্রয়োজন। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে এর কোনোটাই দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ মেনে নেবে না।

অন্তর্বর্তী সরকারকেও নৈরাজ্য দমনে এগিয়ে আসতে হবে। সেনাবাহিনীকে জোরালোভাবে ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে অনেক দিন ধরে। সেনাপ্রধান নিজেও মব সহ্য করা হবে না বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন। মব সন্ত্রাস দমানো গেলে অন্যান্য অপরাধ দমনও সহজ হতো। একটির আড়ালে অপরটির বিস্তার ঘটাই স্বাভাবিক। কোনো পক্ষের দুর্বৃত্তদের কর্মকাণ্ডকেই হালকা করে না দেখার মনোভাব ধারণ করা তো অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য কঠিন নয়।
অতীতে সব তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই আমরা দেখেছি দ্রুত জননিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নত হতে। দেরিতে হলেও এ অগ্রগতি প্রয়োজন। কারণ বর্তমান সরকারকেই একটি স্থিতিশীল পরিবেশে নির্বাচন সেরে গণতন্ত্রে উত্তরণের দিকে যেতে হবে। সে লক্ষ্যে দ্রুত এগোনোর চেষ্টা নেই বলেও সব ধরনের অপরাধী আরও বেপরোয়া হচ্ছে, বললে ভুল হবে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension