কবিতাসাহিত্য

রোদনে ভরা বসন্ত

প্রবীর কুমার চৌধুরী


প্রবীর কুমার চৌধুরী

মাগো, বিনি সুতোয় মালা গেঁথে পরাতে চেয়েছিলাম জীবনের গলায়,
এখন ছায়াহীন তপ্ত দুপুর। কয়লা কালো অন্ধকার ঘরে শুধু তোমায় মনে পড়ে
তোমার লালপেড়ে শাড়ি, আলতা পায়ে, তোমার বুকের স্পর্শে—
স্নেহের চাদরে মুখ ঢেকে কেটে যেত আমার সারা বেলা।
আর এখন—
বন্ধ্যা সময়ের অভিশপ্ত রাত্রে ঘৃন্য প্রেমের খেলা,
প্রতিবিম্বহীন নিষ্ঠুর সময়ের ঘূর্ণিপাকে কেটে যায় অনুভূতিহীন অশ্রুময় অবহেলায়।
এখন অহল্যার মতো মৌন্য তপস্যা, কালিমালিপ্ত যৌবনে শুধুই অমাবস্যা।
রাতের ক্ষুধার্ত নিশাচরেরা এ আঙিনায় দেয় হামাগুড়ি—
নৃশংস দৃষ্টি, ঘন নিঃশ্বাস, বুকের পাঁজরে নখাঘাতে
আমার দেহের হাড়-মজ্জা ছিঁড়ে চুষে চুষে, শুষে শুষে—
চলে যায় আমাকে পয়সায় কিনে নিশীথের অতিথি।

মাগো, এখনও বেঁচে আছি, মৃত্যুরা স্পর্শ করেনি আমাকে,
চরকের মেলায় কেউ করেনি ধর্ষণ, কেউ নিয়ে যায়নি তুলে গোপনে,
তুমি জানতেও পারোনি মীনাবাজারে বিকিয়ে গেছি।
এই রূপ, এই শরীর, এই যৌবনের দাম মাত্র পঞ্চাশ হাজার।
মাল চেনাচিনি, দর জানাজানি, হাজার হাতের ছোঁয়ায়—
দেহহাটের পণ্য আমি, ফেরার পথ রুদ্ধ আমার কঠিন কালো ধোঁয়ায়।
আজও রয়ে গেছি— বসন্ত সেনা, বাসবদত্তার স্মৃতি বুকে আঁকড়ে,
এখন প্রতিটি রাতে আমার নিত্য নতুন ফুলশয্যা।
প্রেমের পসরা সাজিয়ে আসে নকল প্রেমিকের দল—
আমার অস্থি-মজ্জার নরম বারোয়ারি বিছানায়,
তখনও হয়তো ছড়িয়ে আছে সেখানে, আগের প্রেমিকের তপ্ত নিঃশ্বাস।
ওরা আমায় উল্টেপাল্টে ঘাঁটে, রক্ত নদীতে স্নান করায়,
ব্যথা, যন্ত্রণা আর চোখের জলের বিনিময়ে ঝটাফট তবিল উজার করে দেয়।
আমার শিবরাত্রির জল ঢালা, উপোস করা কেমন সার্থক হলো বলো তো?

মাগো এখন আমি পুরুষদের ঘৃণা করি,
কোনো পুরুষ যেন না পায় মায়ের গর্ভ। ,
ভাবতে ব্যথায় ব্যথায় মন ভরে যায়—
এই পুরুষই কারুর সন্তান, কারুর স্বামী, আবার কারুর পিতা।
এই পুরুষই আবার বাড়ি ফিরে পবিত্রতার কথা বলে, প্রেম বিলায়, কোলে নেয় নিষ্পাপ সন্তান।
একি অভিশপ্ত প্রেম দিল বিধাতা আমায়? একি নিষ্ঠুর ছলনার মায়াজাল?
আমার পুরুষ চেনা রইল বাকি, চিনলাম তার অঙ্গ—
মা হওয়া আর হোল নাগো, হলাম ভোগের সঙ্গ।

মা তোমরা এখন সুখে আছো তো?
বাবুর পড়াশুনা, বাবার চিকিৎসা, তোমার সাতনরীর বন্ধকী হারটা বাবা এনে দিয়েছে?
আমি হারিয়ে যাওয়ার পরদিন বাবা পঞ্চাশ হাজার টাকার আনন্দ কিনে দিয়েছিল তোমাদের ?
ওইটাই আমার সান্ত্বনা, , আমার জীবনের বিনিময়ে তোমাদের হাসি ফুটেছে।
সত্যি আমার চিন্তায় বাবা আর গ্রামের গোবিন্দ কাকু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল—
এ গ্রাম সে গ্রাম উজার করেছিল পাত্রের সন্ধানে, তখন আমার মাত্র পনেরো বছর।
গোবিন্দ কাকু বাড়ি এসে আমার পিঠে হাত বোলাত, আর—
বলত রানি তুই আমার মেয়ের মতো, তোকে ভীষণ ভালোবাসি।
পনেরো বছরের মেয়ে সে ভালোবাসার মানে বুঝে ঘৃণায় রি রি করত—
সন্ধ্যাবেলায় বিবিতলার রাস্তা দিয়ে আসার সময়,
কাকু দাঁড়িয়ে থাকত, আমাকে কাছে ডেকে আদরের ছলে বুকে হাত দিত, লজ্জায় কুঁকড়ে যেতাম,
কি অদ্ভুত না পৃথিবীটা মা, সব পুরুষরাই এক ছাঁচে তৈরি।
এদের কাছে মেয়ে, বউ, নাতি, এমন কি মা সবাই ভোগের সামগ্রী।
গোবিন্দ কাকু আজও আমার কাছে আসে,
ভালোমন্দ খায়, রাত জাগে, তন্ন তন্ন করে আমার শরীর ঘাঁটে।
আজও আমায় ভালোবাসে, না না মেয়ের মতো নয় …
সংসারের টাকা মা আমি নিয়মিত কাকুর হাতে পাঠাই।

মাগো, দোহাই বেশ্যার টাকা বলে ফিরিয়ে দিও না,
ওটা আমার ভালোবাসা, ওতে আছে চোখের জল,
আর আছে ঘামের মধ্যে জমাট বাঁধা রক্ত।
ছেলের মতো ভাই যে আমার বড় হবে, মানুষ হবে এইটুকু আজ স্বপ্ন।
আর একটাই অনুরোধ যে দিন আমি চলে যাব—
সেদিন তুমি দু’ফোটা চোখের জল ফেলো,
একবার আগের মতো সারা গায়ে হাত বুলিয়ে বলো,
আবার আসিস ফিরে কোলে, মেয়ে হয়ে। বর দেবো,
সিঁদুর দেবো, দেবো সুখের সংসার,
স্বামী ঘর করিস সুখে, করিস অহংকার।
আর বাবুকে বলো আমার মুখে আগুন দিয়ে আমাকে যেন বৈতরণী পাড় করে।

মাগো ভীষণ যন্ত্রণা,
বুকের ভেতরে কে যেন চিরেচিরে দেয় লংকাবাটা,
ক্লেদ মাখা জীবনে ঘুম হীন রাত, আবর্জনায় ভরেছে আমার পথঘাট।
এ যেন প্রেমহীন প্রাণ কোনো মতে ক্ষয় করে ফেলা।
কত বন্ধু এগিয়ে আসে বাড়িয়ে দেয় সান্ত্বনার হাত-
বলে আমরা মেহনতি, আমরা খেটে খাওয়া মানুষ,
গণিকা নই, বেশ্যা নই, নই বারাঙ্গনা, আমরাও মানুষ— যৌনকর্মী।
যদি প্রশ্ন কর—যৌনকর্মীর পরিচয় কি?
তবে বলতেই হয়-
শরীর বিক্রি করি, সেই টাকায় বেঁচে থাকি, বাঁচিয়ে রাখি তোমাদের।
না শুধু শরীর বেচি না, সাথে—
লজ্জা, আঘাত, অপমান, শোষণ, ঘৃণা, মাতালের অত্যাচার—
এগুলোর দাম পাই না, বিনামুল্যে দিতে হয়, বাঁচার নজরানা
মনের জ্বালা জুড়াতে নেশা করি, মেটে না বুকের আগুন-
প্রেম শূন্য, কোল শূন্য, বুক শূন্য, যেন বাড়ে শতগুন।
আমি যেন প্রেমের ফেরিওয়ালা, প্রতিটি রাতে প্রেম ফেরি করি—
হা হা হা অথচ আমার ঘরেই নেই আমার জন্যে একফোঁটা প্রেম।

মাগো, চারিদিকে শুধুই কামসাগর,
তার মধ্যে মানুষ সাঁতার কাটছে।
এর মধ্যেই জন্ম, মৃত্যু, লালসা, কত পাপ,
অতৃপ্তরা ভাবে—এর মধ্যে যদি মণি মুক্ত পেয়ে যাই।
যদি অশান্ত মনে সান্ত্বনার ঠিকানা মেলে, মৃত্যুসুখের— আগে যদি ক্ষণিক মেলে বাঁচার অমৃত!
মাগো আমরা এমন মেয়েমানুষ—
ভগবান যাদের স্তন দিয়েছেন, যোনি দিয়েছেন, শুধু গর্ভ দেয়নি।
তাইত গর্ভের সন্ধানে ছুটে বেড়াই,
পূর্ণাঙ্গ মেয়ে হতে গিয়ে যাকে সামনে পাই আঁকড়ে ধরতে গেলেই ফস্কে যায়।
আবার ধরি, ফসকায়। এইভাবেই চলে বাকি জীবনের দুঃসহ সারাবেলা।
একসময় নেমে আসে কালরাত্রি, খেলা ফুরিয়ে যায় মাগো।

ওই যে একটা গান আছে না—
‘মনের গহনে তোমার মুরতিখানি- ভেঙ্গে ভেঙ্গে যায়, মুছে যায় বারে বারে—’।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension