মুক্তমত

শুভ হোক নতুন গ্রেগরিয়ান বছর

শাহ্‌ জে. চৌধুরী


সূর্যকে মাঝখানে রেখে সবগুলো গ্রহ ক্রমাগত ঘুরছে। সূর্যকে পুরোটা ঘুরে আসতে যে সময়টা পৃথিবী খরচ করে, সেটিই বছর। আরেকটা মজা আছে। বাংলা বছরটা শুরু হয় ভোর বেলায়। কিন্তু ইংরেজি বছর শুরু হয় মাঝরাতে- কেন? এর সহজ উত্তর হলো, বাংলা বছরের হলো চন্দ্র মাস। মানে আরবির মতো করে বাংলা মাসের হিসে-নিকেশের সবই চাঁদকে কেন্দ্র করে। কিন্তু ইংরেজি বছরের হিসেবটা সূর্যকেন্দ্রিক। একারণে ইংরেজি বছরের দিন, মাস, বছর- সকলই মধ্যরাতে। মধ্যরাতে হওয়ার কারণ হলো, সূর্যাস্ত আর সূর্যোদয়ের মাঝবরাবর সময়টাকে ধরে নেওয়া হয়েছে মাঝরাত। কারণ, এর পর থেকেই পূর্ব দিগন্তে সূর্যোদয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইংরেজি নতুন বছর শুরুর হিসাব ঠিক রাখার জন্য রাত ১২টা থেকে নতুন দিনের শুরু হলো বলে ধরা হয়।

আরেকটা মজা আছে। যাকে আমরা এখন ইংরেজি বছর বলে আখ্যায়িত করছি তার পরিচয়টি কিন্তু ইংরেজি বছর নয়। বস্তুত ‘ইংরেজি বছর’ বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। এর পরিচয়টি খ্রিস্টীয় সাল। নানান তথ্য উপাত্ত ঘেঁটে জানা যায়, খ্রিস্ট ধর্মের প্রবর্তক যিশুখ্রিস্টের জন্মের বছর থেকে যে বছর গণনা করা হয়, সেটিই খ্রিস্টা-অব্দ বলে। যিশুখ্রিস্টের জন্ম, জীবন, সেবা কাজ, মৃত্যুকে অবিস্মরণীয় করে রাখার জন্য পোপ গ্রেগরি খ্রিস্ট বছর নাম দিয়ে গণনা শুরু করেন। বর্তমান পৃথিবীতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও প্রচলিত।

দিনকাল তো একটার সঙ্গে অন্যটার বিশেষ ফারাক নেই। সকল দিনই পৃথিবীর হিসেবে এক। যেমন ধরুন, আপনি বলে দিলেন, আজকে খুব ঠাণ্ডা পড়েছে। কিংবা আজ অনেক গরম। আপনি কিন্তু এখানে আবহাওয়ার খবরটি জানালেন। মহাকালের এর কিন্তু কোনো প্রভাব নেই। সূর্যকে কেন্দ্র করে যে কক্ষপথটি ধরে পৃথিবী ঘুরেই চলেছে, সেখানে ঠাণ্ডা গরম শীত বসন্ত বলে তো কিছু নেই। সে পথটি মিলিয়ন বছর আগেও যেমন ছিল, আজও ঠিক তেমনই আছে। তার কিছুই বদল ঘটে নি।

ব্যাপারটা তবে কি দাঁড়াল? ব্যাপারটা এই দাঁড়াল যে, আমরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে এই পৃথিবীর হাওয়া মাটি জল ঋতু- সকলই নিজের করে নিয়ে ফেলেছি, নামকরণ করছি এবং ইচ্ছেমতো ব্যবহারও করছি। এইটি করছি আমরা- মানুষেরা। জগতের আর কোনো প্রাণী এই কাজটি করছে না। কেননা জগতের আর কোনো প্রাণীর এই কাজটি করবার যোগ্যতাও নেই। এবং নেই নেই যে, সেই খবরটিও আমরা খুব করে রাখি। রাখি বলেই এইভাবে নিশ্চিত ঘোষণায় দাবি তুলি।

আচ্ছা, এইটি কি আমাদের অহংকার?

অহংকার তো বটেই। অহংকার যে তার প্রমাণ আছে। প্রমাণ হলো ‘আমি’। আমরা আমাদের চারপাশ ‘আমি’ময় করে ফেলতে চাইছি। আমরা ‘আমাদের’ বলতে পছন্দ করি না। আমাদের পছন্দ আমরা ‘আমার’ বলে দেয়া। স্থান কাল পাত্র- পৃথিবীতে, বহির্বিশ্বে যা যা কিছু আছে, সকলই আমরা সমষ্টির নয়, ব্যক্তির মালিকানায় দিতে-নিতে আগ্রহী। চাঁদটা পৃথিবীর উপগ্রহ। চাঁদকে আমরা নারীর উপমা বানিয়েছি। পৃথিবীর প্রাণের জন্যে চাঁদ বড় দরকারি। চাঁদ না থাকলে দিনরাতগুলো বদলে যাবে, নদী মরে যাবে, জোয়ার-ভাটা হবে না। সমুদ্রে ঢেউ গর্জে উঠবে না। চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক হবে সূর্য। চাঁদ যদি নারীর উপমা হয় তবে সূর্য পুরুষের মতো কর্কশ। কেননা সূর্য বড় স্বেচ্ছাচারী। চাঁদ না থাকলে ক্রমাগত হতে থাকবে সুনামি। বেড়ে যাবে জলোচ্ছ্বাস। বড় বড় দুর্যোগগুলো নিয়মিত হবে পৃথিবীতে। এবং পৃথিবী আস্তে আস্তে এগিয়ে যাবে ধ্বংসের দিকে। আমরা এখন সে চাঁদকে দখল করে ফেলেছি। এবং দখল প্রতিষ্ঠিত হতে না হতেই চাঁদকে নিজের পৈত্রিক সম্পদ ভাবতে শুরু করেছি। এবং লোকেদের কাছে নগদ অর্থের বিনিময়ে চাঁদের জমি বেচা-বিক্রি শুরু করে দিয়েছি।

এই রকমের নির্বোধ কাজ আমরা দারুণ অবলীলায় করে ফেলতে পারছি আমরা অহংকারী বলেই। তাহলে মানেটা কি দাঁড়াল। মানেটা দাঁড়াল, নির্বোধ লোকেরাই অহংকারী হয়।

না না, আত্মসন্মানবোধ আর অহংকারকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। দুটো আলাদা জিনিস। আত্মসন্মানবোধসম্পন্ন মানুষ দখলদারিত্ব চালায় না। তার দিকে কেউ আঙুল তুলবে- এই সুযোগ সে রাখে না। আত্মসন্মানবোধসম্পন্ন মানুষ ক্ষতি বা ধ্বংস করে না। গড়ে তারা। নির্মাণ করে। আসুন, নতুন এই বছরে আমরা অহংকারকে ভুলে গড়তে শুরু করি। বড় বড় কল-কারখানা অট্টালিকা ভবন কিংবা স্থাপত্য নয়। পৃথিবীটাকে নতুন করে নির্মাণ করি আমরা। আজকে আমাদের স্বার্থেই এই পৃথিবীকে নতুন করে নির্মাণ করা জরুরি। খুব জরুরি। নয়ত পৃথিবীর নয়, আমাদেরই অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই অস্তিত্ব আমাদের হুমকিতে পড়েছে, দেখতে পাচ্ছেন তো?

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension