
ওয়াশিংটন ডিসিতে জমজমাট দুই দিনব্যাপী ‘ডিসি বইমেলা’
নূরজাহান বোসকে আজীবন সম্মাননা
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলা কেন্দ্রের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হলো দুই দিনব্যাপী ‘ডিসি বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব’। রিভার রোডের মনোরম ও সবুজ পরিবেশে অবস্থিত বেথেসডা ইউনিটারিয়ান ইউনিভার্সালিস্ট কনগ্রিগেশনের নান্দনিক কারুকার্যময় অডিটোরিয়ামে বসেছিল প্রবাসের এই বইপ্রেমীদের মেলা।
গত ২৬ জুন বিকেলে এক আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে ফিতে কেটে ও প্রদীপ জ্বালিয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক তসলিমা নাসরিন।
উদ্বোধনী বক্তৃতায় লেখক তসলিমা নাসরিন বলেন, “আজ এই ডিসি বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে আমি সত্যিই আনন্দিত, কৃতজ্ঞ এবং কিছুটা আবেগাপ্লুত। আমাকে এই বইমেলার উদ্বোধন করতে বলা আমার জন্য শুধু সম্মানের নয়, গভীর ভালোবাসার ব্যাপার। কারণ যে ভাষায় এই মেলা, সেই ভাষাতেই আমি লিখি, ভাবি, স্বপ্ন দেখি, প্রতিবাদ করি এবং ভালোবাসি। অন্য কোনো ভাষায় লেখার কথা আমি ভাবতেও পারি না। বাংলা ভাষা শুধু আমার লেখার ভাষা নয়—বাংলা ভাষাই আমার আশ্রয়, আমার দেশ।”
তিনি তার নির্বাসিত জীবনের স্মৃতি চারণ করে বলেন, “আমার জীবনে রাষ্ট্র বদলেছে, ভূগোল বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে। ইউরোপে এক দশক বাস করার পর হাঁপিয়ে উঠে ভাষার টানে ছুটে গিয়েছিলাম পশ্চিমবঙ্গে। ভেবেছিলাম সেখানে একটু ঘর খুঁজে পাবো। কিন্তু সেখানেও আমাকে থাকতে দেওয়া হলো না। তবু আমি যেখানেই থাকি, আমার সংগ্রাম থেমে থাকে না। ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে, অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল সমাজের জন্য, নারীর সমান অধিকার ও বাকস্বাধীনতার জন্য আমি লিখে চলেছি। কারণ লেখাই আমার শ্বাস নেওয়া, লেখাই আমার বেঁচে থাকা।”
প্রবাসে বইমেলার আয়োজনকে এক ধরণের ‘প্রতিরোধ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন,
“রাষ্ট্র মানুষকে নির্বাসিত করতে পারে, কিন্তু ভাষা থেকে নির্বাসিত করতে পারে না। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া যায়, ভিসা বন্ধ করা যায়, কিন্তু মাতৃভাষার দরজা কেউ বন্ধ করতে পারে না। প্রবাসে যারা বাংলা বইমেলার আয়োজন করেন, তারা আসলে ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে এবং শিকড় হারানোর বিরুদ্ধে এক ধরণের প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন।” বর্তমান প্রযুক্তির যুগে বই পড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি নতুন প্রজন্মকে বাংলা সাহিত্যের সাথে যুক্ত করার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।
মেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. নূরুন নবী। তিনি তার বক্তব্যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,
“বাংলাদেশ আজ গভীর সংকটে উপনীত। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে দেশকে পাকিস্তানি শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছিল। অথচ আজ বাংলাদেশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিলে নির্যাতন ও গ্রেফতারের শিকার হতে হয়। চব্বিশের পাঁচ আগস্টের পর বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অবস্থা নাজুক। সিনেমা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, একুশে বইমেলার স্টলে হামলা হচ্ছে। মব সন্ত্রাস, শিশু নির্যাতন ও অপরাধ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কি এই বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলাম?”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক নঈম নিজাম, শাবান মাহমুদ, শিশুসাহিত্যিক হুমায়ূন কবীর ঢালী, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদ আহসান রাসেল, নজরুল ইসলাম বাবু এমপি, জাকারিয়া চৌধুরী এবং নূরুল আমিন বাবুসহ আরও অনেকে।
এছাড়াও মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত ছিল লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের উপস্থিতিতে। তাদের মধ্যে ছিলেনকবি আনিস আহমেদ, আশরাফ আহমেদ, লুতফুন নাহার লতা, কবি ফকির ইলিয়াস, ফারহানা ইলিয়াস তুলি, ছড়াকার খালেদ সরফুদ্দিন, আবু সাঈদ রতন এবং কবি মিশুক সেলিম, গোপাল স্যানাল, আনোয়ার সেলিম, মিনহাজ আহমেদ,আসলাম আহমেদ খান, গোপন সাহা, পিনাকী তালুকদার, নুপুর চৌধুরী, সন্তোষ বড়ুয়া প্রমুখ।
বইমেলায় ঢাকা ও নিউইয়র্কের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। যার মধ্যে ছিলো— অন্বয় প্রকাশ, অনন্যা, সময়, নালন্দা, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব-যুক্তরাষ্ট্র, কালিক, বীণাপাণি বুক স্টলসহ স্থানীয় বই বিক্রেতা।
বইমেলার উল্লেখযোগ্য দিক নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি তাদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ। ডিসি বইমেলায় এবছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত বিশিষ্ট লেখক নূরজাহান বোসকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়।
দুই দিনব্যাপী এই মেলায় প্রতিদিন ছিল শিল্প-সাহিত্য ও নতুন বই নিয়ে আলোচনা, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্থানীয় শিল্পী ছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে আসা আমন্ত্রিত শিল্পীরা গান গেয়ে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। সঙ্গীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী শাহ মাহবুব, রেশমি মির্জা, দিনার মনি, ইবরার টিপু ও বিন্দুকনা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী মৌসুমী ও পিনুসেন দাস।
পুরো উৎসবটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক দস্তগীর জাহাঙ্গীর, সামিনা আমিন ও মনি দিনা। আর অত্যন্ত সাবলীল উপস্থাপনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত করে রাখেন মৃদুল আহমেদ। দেশ ও মাটির টানে প্রবাসের মাটিতে আয়োজিত এই বইমেলা ওয়াশিংটন ডিসির বাঙালিদের মাঝে এক টুকরো বাংলাদেশ এনে দিয়েছিল।



