
গ.
দেখতে দেখতে পনেরো দিন কেটে গেল; ওমর এখন বাড়ি থেকে আত্মিক এবং শারীরিক উভয় দিক দিয়ে অনেক দূরে। দলের অন্য বালকেরা এখন ওমরের বন্ধু, তার সুখ-দুঃখের সাথী। অনেক গ্ৰাম ঘুরে গুরুদেব মলয় বর্মন সবাইকে নিয়ে আবার ধলেশ্বরীর এক তীরে এসে দাঁড়ালেন। এটা একটা বড় খেয়াঘাট ও বাণিজ্য কেন্দ্র; বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নৌকা বোঝাই পণ্য আসছে, আবার নৌকা বোঝাই হচ্ছে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। ছোট বড় মিলিয়ে ঘাটে প্রচুর নৌকা বাঁধা; মানুষের কর্ম চাঞ্চল্যো মুখরিত চারিদিক। বালকেরা হঠাৎ এই জনারণ্যে এসে খেই হারিয়ে ফেলেছে; অবাক হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখছে, কিন্তু তাদের কাছে সবই নতুন। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দেখে একজন মাঝি এগিয়ে এসে জানতে চাইলো,—’নদী পার হবেন বুঝি, গুরুদেব?
—আজ্ঞে, যদি আপনার দয়া হয়।
—সারাদিন তো সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকি, ধর্মের কাজ করার সুযোগ কপালে খুব কমই জোটে; এতদিন পরে নারায়ন আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন—চলুন, আপনাদের পার করিয়ে দেই। আপনাদের কৃপায় হয়ত নারায়ন আমাকেও একদিন পার করে দেবেন।
—ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।
কয়েকটি নৌকা পার হয়ে সবাই মিলে হরেন মাঝির নৌকায় উঠে বসেছে; হরেন মাঝি নৌকা ছেড়ে দিলো; পিছনে পড়ে থাকলো কর্মব্যস্ত খেয়াঘাটের জাগতিক কোলাহল। হরেন মাঝির গানের সুরে ঢেউয়ে দুলতে দুলতে নৌকা এগিয়ে যেতে লাগল; ঝাঁপসা হতে লাগল খেয়াঘাট, সেই সাথে আজীবনের জন্য ছিন্ন হয়ে গেল ওমরের নাড়ির বন্ধন মুরাদনগর।
বালকেরা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে; এই প্রথম তাদের নৌকা ভ্রমন, তাই নৌকার দুলুনিতে সবার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে আতঙ্কের ছাপ। নদী পার হয়ে নৌকা থেকে নেমে সকলে যেন প্রাণ ফিরে পেলো; হরেন মাঝিকে সবাই প্রণাম জানিয়ে হাঁটতে শুরু করল। ওমর একবার পিছনে ফিরে তাকালো, আর মনে মনে ভাবলো—বাড়ির সাথে তার বন্ধন চিরদিনের জন্য ছিন্ন করে দিলো এই নদী।
নদীর তীর থেকে নেমে বিলের মধ্যে দিয়ে মেঠোপথ সোজা চলে গেছে গ্ৰামের দিকে; ভিক্ষুদের দলটি সেই পথ ধরে হাঁটতে লাগল। গ্ৰামের ঢোকার মুখে তিন রাস্তার মোড়ে চলে এসেছে তারা; ডান দিকে একটা পথ চলে গেছে শাল-মেহগনি গাছের সারির ফাঁক দিয়ে। গ্ৰামে না গিয়ে ডান দিকের পথ ধরে হাঁটতে লাগলেন গুরুদেব মলয় বর্মন। সবাই যতই হাঁটছে ততই ঘন হচ্ছে গাছের সারি, সাথে এঁকে-বেঁকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পথ ধীরে ধীরে উঠে গেছে উপরে। সন্ধ্যার আগে আগে সবাই এসে উঠলো বট-অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় ঘেরা সুন্দর এক বৌদ্ধ বিহারে। বিহারের পুরোহিত ধর্মপাল মহাশয় সবাইকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলেন।
মসৃণ পাথরের টুকরো একটার সাথে একটা জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই মঠ; মঠের চারপাশ ঘিরে পোড়া ইটের সাহায্যে বানানো হয়েছে সুবিশাল চত্বর। সেই চত্বরের এক কোণে পুরাতন এক অশ্বত্থ গাছের তলে বসানো আছে ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধের চিরায়ত মূর্তি; একটার উপরে আর একটা হাত দিয়ে পদ্মাসনে বসে আছেন প্রভু সিদ্ধার্থ গৌতম। ওমর এতদিন শুধু বুদ্ধের গল্পই শুনেছে, কিন্তু আজ পরিচিত হলো তার আবয়বের সাথে; মনে মনে ওমর ভাবলো—আচ্ছা, ইনিই তবে মহাপ্রভু বুদ্ধ!
সাব্যস্ত হয়েছে হিমালয়গামী ভিক্ষুদের দলটি আগামী তিন দিন এই মন্দিরে বিশ্রাম নিয়ে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করবে। বালকেরা এই সিদ্ধান্তে ভীষণ খুশি; কারণ, এই সুযোগে তারা তাহলে খেলাধুলা করে আনন্দে সময় কাটাতে পারবে। সন্ধ্যার পুরোহিত ধর্মপাল সবাইকে নিয়ে বুদ্ধের বাণী ও তার তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা করতে বসলেন। তিনি শুরু করলেন,—’প্রভু বলেছেন, এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে একটি দিন; এবং একটি দিনের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে একটি গোটা জীবন।’
তারপর তিনি ব্যাখ্যা করতে লাগলেন, কীভাবে প্রভু মুহূর্তের সিদ্ধান্তে—এক রাতে সংসার, রাজত্ব, স্ত্রী-সন্তান পরিত্যাগ করে সত্যান্বেষণে ঘর ছেড়ে বের হয়ে গিয়েছিলেন। প্রভু কীভাবে বাকি জীবন সত্য ও সুন্দরের বাণী প্রচার করেছেন। আমরা যদি প্রভুর পথ অনুসরণ করি, তবে আমরাও পারবো হিংসা ও হানাহানি পরিহার করে এই পৃথিবীকে একটি আনন্দপুর্ণ বসবাসযোগ্য পূণ্যভূমিতে পরিণত করতে। আলোচনা শেষে গুরুদেব মলয় বর্মন ওমরকে এক পাশে ডেকে নিয়ে গেলেন।
—ওমর, তোমার বিষয়ে পুরোহিত ধর্মপাল মহাশয়ের সাথে আলাপ করেছি; তিনি তোমার একটা ব্যবস্থা করে দেবেন বলেছেন।
—আপনি আমার পিতৃতুল্য গুরুদেব। আপনি আমার জন্য যে ব্যবস্থা করবেন, নিশ্চয়ই আমার জন্য সেটা মঙ্গলজনক হবে।
—এখান থেকে হেঁটে গেলে প্রায় এক পক্ষকাল লাগে উদয়নগর গ্ৰামে পৌঁছাতে; উদয়নগর হচ্ছে সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণদের গ্ৰাম, সেই গ্ৰামের বিখ্যাত কালি মন্দিরের পুরোহিত শঙ্করাচার্য হচ্ছেন আমাদের গুরু ধর্মপাল মহাশয়ের প্রিয় বন্ধু। উদয়নগর গ্ৰামে একটি নামকরা পাঠশালা আছে, শঙ্করাচার্য সেই পাঠশালারও অধ্যক্ষ; তিনি যেমন ধর্মপ্রাণ, তেমনি আবার বিদ্যানুরাগী। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিবছর বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ ছাত্র উদয়নগর পাঠশালায় শিক্ষা গ্রহণ করতে আসে। পুরোহিত ধর্মপাল মহাশয় একটি চিঠি লিখে দেবেন তার প্রিয় বন্ধু শঙ্করাচার্য মহাশয়কে—তিনি যেন তোমাকে তার বিদ্যাপিঠে অন্তর্ভুক্ত করে নেন।পুরোহিত মশাই এর দৃঢ় বিশ্বাস বন্ধু শঙ্করাচার্য তাকে নিরাশ করবেন না।
গুরুদেবের সব কথা ওমর মন দিয়ে শুনলো।
কথাবার্তা শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক রাত হয়ে গেল। গুরুদেব মলয় বর্মন আজ একটু শান্তি পেলেন ওমরের একটা ব্যবস্থা করতে পেরেছেন বলে। ওমর শুয়ে শুয়ে ভাবছে—মুহূর্তের সিদ্ধান্ত বুদ্ধের মতো তার জীবনও চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে; সে এবং বুদ্ধ এখন একই পথের পথিক। বুদ্ধের সাথে নিজের জীবনের মিল খুঁজতে খুঁজতে ঘুমিয়ে পড়ল ওমর।
ঘ.
তিন দিন বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে বহু দূরে চলে এসেছে ওমর; দেখতে দেখতে আরও এক পক্ষকাল কেটে গেল, ওমরের বিদায় সন্নিকটে। শিশুরা যেখানে ভালোবাসা পায়, সেখানে থেকে যেতে চায়—ওমরও এর ব্যতিক্রম নয়। এতদিন একসাথে কাটিয়ে গুরুদেব এবং অন্যদের কাছে যে স্নেহ, ভালোবাসা ওমর পেয়েছে তা তার জন্মদাতা পিতার কাছে কোনদিন পায়নি; যদি পেতো, তবে তাকে হয়ত ঘর ছাড়তে হতো না। বন্ধুদের ছেড়ে, গুরুদেবের স্নেহ ত্যাগ করে তার মন যেতে চাইছিল না; তার মন চাইছিল এখানেই এদের সাথে থেকে যেতে; তবু একদিন না একদিন সবাইকে চলে যেতে হয়, বিদায় নিতে হয়। জ্ঞানের প্রতি অদম্য আগ্রহ ও আম্মার উৎসাহে ওমর ঘর ছেড়েছে; অতএব তাকে তার উদ্দেশ্য ও আম্মার অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করতেই হবে।
আসন্ন শীতের এক বিকেলের শেষ আলোয় দলটি একটি শীর্ণ নদীর খেয়া ঘাটে এসে দাঁড়িয়েছে; গুরুদেব ওমরকে স্বস্নেহে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন,—’ওমর, এই নদী পার হয়ে হেঁটে গেলে প্রথমে যে গ্ৰাম পড়বে সেটাই উদয়নগর; চিনতে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না; গ্ৰামে ঢুকলেই দেখতে পাবে বিশাল এক কালী মন্দির। এখানেই তোমাকে বিদায় জানাতে হচ্ছে; কিন্তু তুমি যদি তোমার পাথে থাকো, আর আমরা আমাদের, তবে অবশ্যই তোমার সাথে আবার দেখা হবে।’
অশ্রু সজল চোখে গুরুদেবকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল ওমর; ওমরের দেখা দেখি সবার চোখে বিদায়ের বেদনার অশ্রু; যাদের সাথে জীবনেও দেখা হওয়ার কথা ছিল না, আজ তাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছে ওমর; অথচ মুরাদনগরের রক্তের সম্পর্কের কথা ভুলে গেছে সে—কী অদ্ভুত এই মানুষের মন। সবাইকে সান্ত্বনা দিয়ে গুরুদেব বললেন,—’এই সংসার আমাদের মায়ার বাঁধনে বেঁধে রাখতে চায়; তবে এ বাঁধন ছিন্ন করেই আমাদের সত্য ও সুন্দরের পথে এগিয়ে যেতে হবে।’
সবাই ওমরকে বিদায় জানিয়ে নৌকায় উঠিয়ে দিলো।
—ওমর, চিঠিটা সাবধানে রাখবে এবং শঙ্করাচার্য মশাইকে দেবে।
—আজ্ঞে, গুরুদেব।
ওমরকে নদী পার করে দিয়ে, গুরুদেব মলয় বর্মন অন্যদের নিয়ে নৌকায় উত্তর দিকে যেতে লাগলেন; এই নদী বহুদূরে গিয়ে বিশাল ইছামতি নদীর সাথে মিশেছে; ইছামতি পার হয়ে এই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দল মগধ পেরিয়ে নালন্দা মহা বিদ্যাপিঠের পাশ কাটিয়ে চলে যাবে হিমালয়ের দিকে।
নদী পার হয়ে ওমর উদয়নগরের পথে হাঁটতে লাগল; তার মনের ইচ্ছা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সন্ধ্যার আগে উদয়নগরে পৌঁছে যাওয়া। সে এখন একা, মন্দিরের অশ্বত্থ গাছের তলে ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের মতো একা; কিন্তু সে ঘাবড়ালো না, এখন ভয় পেলে চলবে না। এই কয়দিনে সে অনেক পরিণত হয়েছে, অনেক কিছু শিখেছে, অনেক সাহস সঞ্চয় করেছে; তাই সে নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে লাগল।
নির্বাণ লাভ করতে চাইলে আমাদের আমিত্বকে জলাঞ্জলি দিতে হবে; অহংকার, লোভ, ঘৃণা পরিত্যাগ করতে হবে; সর্বদা অন্যের মঙ্গল কামনা করতে হবে—অন্যের মঙ্গলের মাঝেই নিজের মঙ্গল নিহিত। বুদ্ধের এই সব বাণী ওমরের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। মসজিদের ইমাম সাহেবও তো এই একই কথা বলতেন। আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে; অহংকার, লোভ-লালসা মানুষকে পাপের পথে পরিচালিত করে—সব ধর্মের বাণীই তো এক ও অভিন্ন। এখানে কোনো হিংসা নেই, বিভেদ নেই, আছে মানুষের প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা; সত্য ও সুন্দরের প্রতি একাত্মতাবোধ। তবে পৃথিবীতে কেন এতো ধর্ম, এবং এতো বিভেদ? এই সব ভাবতে ভাবতে হাঁটতে লাগল ওমর।
ওমর যখন উদয়নগরে পৌঁছালো তখন অনেক রাত হয়ে গেছে; গ্ৰামের একটা কাকপক্ষীও জেগে নেই; সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন। কোনো বাড়িতে আলো জ্বলার কোনো চিহ্ন দেখতে পেলো না ওমর; কেউ জানতে পারলো না, তাদের গ্রামে এসে উপস্থিত হয়েছে এক অনাহূত আগন্তুক।
নিস্তব্ধ রাত, নির্ঘুম নক্ষত্র, শীতের শবনম, আর অপার অন্ধকার মিলে ওমরকে অভ্যর্থনা জানালো উদয়নগর। উদয়নগরে তো আসা গেল, কিন্তু এখন একটা আশ্রয় তো দরকার—রাত কাটাতে হবে। আরও একটু গ্ৰামের ভীতরে ঢুকতেই, হঠাৎ ক্ষীণ এক আলোর উৎস দেখতে পেলো ওমর; এটা যেন প্রকৃত অর্থেই অন্ধকারের সীমাহীন গোলক ধাঁধার মধ্যে তাকে তার জীবনের আলোর সন্ধান দেবার জন্য এখনো জ্বলছে।
আলোর উৎস ধরে ওমর কাছে গিয়ে দেখতে পেলো একটা মন্দির; গুরুদেব মলয় বর্মন তবে এই মন্দিরের কথাই তাকে বলেছিলেন। মন্দিরের ভিতরে একটি প্রদীপ তখনো জ্বলছে, হয়ত নিরাশ্রয় ওমরকে দুহাত বাড়িয়ে কে যেন ডাকছে; গভীর রাতে প্রদীপ জ্বেলে বসে আছে কেউ ওমরের প্রতীক্ষায়। ক্লান্ত ওমর মন্দিরের দেউলে উঠে, চাদর গায়ে জড়িয়ে পরম শান্তিতে শুয়ে পড়ল।
তিন.
ক.
—বালক, কে তুমি? আর কোথা থেকেই বা এসেছ?
ভোর বেলা পূজা দিতে এসে, ওমরকে মন্দিরের দেউলে শুয়ে থাকতে দেখে পণ্ডিত শঙ্করাচার্য বেশ অবাক হলেন; তাই ওমরকে জাগিয়ে প্রশ্ন করলেন। ওমর ভয় তাড়িত হরিণ শাবকের মতো উঠে বসলো, তারপর উত্তর দিলো,—’আজ্ঞে আমার নাম মোহাম্মদ ওমর; আমি মুরাদনগর থেকে এসেছি পণ্ডিত শঙ্করাচার্যের পাঠশালায় বিদ্যা অর্জন করার উদ্দেশ্যে।’
—আমিই শঙ্কর।
—প্রণাম, গুরুদেব।
ওমর পণ্ডিতকে প্রণাম করে দাঁড়িয়ে থাকল। এতটুকু এক বালক, এতো দূর থেকে তার পাঠশালায় পড়তে এসেছে, তাও আবার একা—পণ্ডিত অভিভূত হয়ে গেলেন। প্রথম দেখাতেই ওমরের মায়া ভরা মুখ তার মনে স্নেহের ছাপ ফেলে দিয়েছে। ওমর অতি যত্নে গুছিয়ে রাখা চিঠিটা ভক্তি ভরে গুরুদেবের হাতে দিলো।
চিঠি পড়ে পণ্ডিত বললেন,—’ও আচ্ছা, পুরোহিত ধর্মপাল মহাশয় তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন; ঠিক আছে তুমি বসো, আমি পূজো সেরে নেই, তারপর তোমার বাকি কথা শুনবো।
বৌদ্ধ ধর্মের পুরোহিত ধর্মপাল মহাশয় যত না পণ্ডিতের বন্ধু, তার চাইতে বেশি দার্শনিক প্রতিপক্ষ। ছ’মাস, অথবা বছরে দুই বন্ধু যখন একত্রিত হয়, তখন ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের আলাপের চাইতে তাঁরা দিন-রাত এক করেন তাঁদের ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচারে অথবা খণ্ডনে। দুজনেরই ধারণা মূর্খ ভক্তের চাইতে, দার্শনিক প্রতিপক্ষ অনেক শ্রেয়। ধর্মপাল যেখানে অনাত্মায় বিশ্বাসী, পণ্ডিতের আস্থা সেখানে অদ্বৈত বেদান্তে। চিন্তার এই বিশাল বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও—দুই বন্ধু ব্যক্তিগত জীবনে যেমন উদার, তেমনি জনহিতৈষীও বটে।
শঙ্করাচার্যের সাথে অষ্টম শতকের বেদান্ত দার্শনিক শঙ্করাচার্যের শুধু নামের মিলই একমাত্র মিল নয়—পণ্ডিত শঙ্কর অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের প্রবক্তা আদি শঙ্করাচার্যের অনুরাগী, এবং তার দার্শনিক মতাদর্শের অনুসারী। শঙ্করের কাছেও এই জগত শুধুমাত্র কিছু নাম, রুপের পার্থক্যের দ্বারা সৃষ্ট এক ‘মায়া’—আত্মা এক ও অদ্বৈত; প্রকৃত অর্থে শাশ্বত আত্মা সবকিছুতেই বিরাজমান; এটাই ব্রহ্ম। কেবলমাত্র জ্ঞানের মাধ্যমেই ‘মায়া’ রূপ এই জগতের বন্ধন ছিন্ন করে, আমরা প্রকৃত আত্মার সন্ধান পেতে পারি। আদি শঙ্করাচার্যের মতো পণ্ডিত শঙ্কর কবি না হলেও—তার হৃদয়টা কবিতার মতো এবং তার মনে মরমীবাদের বাসস্থান।
পণ্ডিত শঙ্কর যখন মন্দিরের ভিতরে কালী মায়ের পূজায় ব্যস্ত, ওমর তখন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠ নিয়ে দেউলে বসে আছে; পুরাতন এই কালী মন্দির ঘিরে গড়ে উঠেছে উদয়নগর গ্রাম। জনশ্রুতি আছে এক ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, তাঁর নামানুসারে এই গ্রামের নাম হয়েছে উদয়নগর। বিশাল এক প্রাচীন বট বৃক্ষের নিচে ধূসর মার্বেল পাথর দ্বারা নির্মিত এই মন্দির দাঁড়িয়ে আছে; বট গাছটি যেন পরম যত্নে, সমস্ত বিপদের হাত থেকে আগলে রেখেছে মন্দিরকে। বট বৃক্ষটি আজ যেন এক জীবন্ত ধাঁধা; কেউ বলে এর বয়স দুই শত বছর, কেউ বলে পাঁচ শত বছর তো হবেই।
যাই হোক প্রশ্নের উত্তর আজ বিলুপ্ত, কিন্তু বীরদর্পে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে আজও দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এই বৃক্ষ—দূর-দূরান্ত থেকে আগত মানুষের কাছে উদয়নগরের নিশানা বলতে—এই গাছ। গাছের গোড়া লাল পোড়া ইট দিয়ে বাঁধানো; গ্ৰামের বয়োবৃদ্ধরা সকাল-বিকাল এখানে বসে গল্প গুজব করে; মন্দিরের সামনে বড় একটি চাতাল—গ্ৰামের বড় কোনো আয়োজন যেমন, বিবাহ, শ্রাদ্ধ, অথবা অন্নপ্রাসন সব এই চাতালে মন্দিরের দেবী কালী মায়ের সামনে, তাকে সাক্ষী রেখেই হয়। হিন্দু অধ্যুষিত এই গ্রামে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বলতে আছে কেবল পাঠশালার কিছু বৌদ্ধ বালক এবং এখন ওমর—বর্তমানে মন্দিরের দেউলে বসে থাকা এই গ্রামের একমাত্র মুসলমান বালক। মন্দিরের এক পাশে খেলার বড় একটি মাঠ, আর মাঠ পার হলে গ্ৰামের উত্তর প্রান্তে উদয়নগর পাঠশালা; পাঠশালার সাথে বহিরাগত ছাত্রদের থাকার জন্য আবাসিক ভবন।
পূজা শেষে পণ্ডিত শঙ্কর ওমরের পাশে এসে বসলেন; স্নেহের সুরে বললেন,—’বালক, এবার বলো; একা এতো দূর তুমি কীভাবে এলে?’
পণ্ডিতের কথার মাঝে লুকিয়ে ছিল মায়া মমতায় ঘেরা এক দরদী হৃদয়; ওমর তাই নির্ভয়ে তার মনের সমস্ত কথা খুলে বলল। কিছুই বাদ রাখলো না ওমর—আম্মার মৃত্যু, আব্বার দ্বিতীয় বিয়ে, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে কাটানো একটি মাস, আর জ্ঞানের প্রতি তার অদম্য আগ্রহ। সব কথা শুনে পণ্ডিতের মন আদ্র হয়ে উঠলো, ওমরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,—’ঠিক আছে ওমর, দেখি কী করা যায়?’
যে পণ্ডিত শাশ্বত আত্মায় বিশ্বাসী, যার কাছে পরমাত্মা হচ্ছে ব্রক্ষ্ম; আর কেবলমাত্র জ্ঞানের মাধ্যমেই সেই ব্রক্ষ্মর উপলব্ধি পাওয়া সম্ভব—সে কীভাবে দূর থেকে আগত জ্ঞানানুরাগী এক বালককে ফিরিয়ে দেবে? ওমরের মুখের দিকে তাকিয়ে পণ্ডিত আবার বললেন,—’কাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি বুঝি?’
ওমর কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো। পণ্ডিত পূজার থালা থেকে একটা কলা ও কিছু ফল ওমরের হাতে দিলেন।
মাটির মানুষ বলতে যা বোঝায়, পণ্ডিত শঙ্কর আসলে তাই; কুলীন ব্রাহ্মণ, অথচ তার মনের ভিতরে জাতের কোনো অহঙ্কার নেই; নিজের কাজটুকু বাদে আশপাশের দুই দশ গ্রামের মানুষের উপকার করে বেড়ানোই তার স্বভাব। দানশীল, নিরহঙ্কার, উদার মনের পণ্ডিত শঙ্কর সকলের মাথার মুকুট; তার কথা এবং কাজ সকলে বেদবাক্যের মতো ভক্তি করে, এবং শ্রদ্ধার সাথে গ্ৰহণ করে। স্ত্রী অর্চনা দেবী, ও সাত বছরের একমাত্র কন্যা পার্বতীকে নিয়ে পণ্ডিতের সোনার সংসার।
কথায় আছে—সোনার স্পর্শে মাটিও সোনায় পরিণত হয়; তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ যেন অর্চনা দেবী; স্বামীর মতোই কোমল তার হৃদয়, আর মাতৃস্নেহ সবাইকে মা দুর্গার মতো দশ হাত দিয়ে আগলে রাখতে পারলে যেন তিনি শান্তি পান। তবে অর্চনা দেবীর প্রধান সমস্যা হলো, কাউকে কাঁদতে দেখলে তিনিও তার সাথে কাঁদতে শুরু করেন—সাত বছরের পার্বতী তখন চুপটি করে মায়ের কোলে বসে থাকে।
—তোমার গ্ৰামে কোনো পাঠশালা ছিল না, ওমর?
—আজ্ঞে না, গুরুদেব; মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে পড়তাম আমি। বাংলা লিখতে ও পড়তে পারি; আরবী-ফার্সীও শিখতাম ইমাম সাহেবের কাছে; কুরআন পড়ে শেষ করেছি, আমি আরও পড়তে চাই গুরুদেব; কিন্তু মুরাদনগরে তা সম্ভব না, তাই আম্মা মৃত্যুর আগে বিদ্যা অর্জনের জন্য আমাকে মুরাদনগর ত্যাগ করতে বলেছিলেন। আমি আরও একটা জিনিস পারি গুরুদেব।
—কী সেটা?
—আমি প্রহরের পর প্রহর ধ্যান করতে পারি, বৌদ্ধদের সাথে থেকে শিখেছি; ধ্যান করতে আমার ভালো লাগে—ধ্যান করলে মনে কোনো ভয় থাকে না।
—তাই নাকি?
—আজ্ঞে হাঁ, গুরুদেব।
পণ্ডিত শঙ্কর বারো বছরের মাতৃহীন অনাথ বালকের কথায় খুব আকৃষ্ট হলো। ইতোমধ্যে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্ৰামের মানুষ মন্দিরের বটতলায় জড়ো হতে শুরু করেছে; চীবর পরিহিত একটা ছোট ছেলের সাথে পণ্ডিত মন্দিরের দেউলে বসে কথা বলছে দেখে সবাই কৌতূহলবশত এগিয়ে গেল। বালকের চেহারায় আভিজাত্যের অমলিন ছাপ—দেখেই বোঝা যায় এ কোনো সাধারণ চাষার ঘরের সন্তান নয়।
সবার মাঝে কখন যে ইন্দ্রনাথ ব্যানার্জি এসে দাঁড়িয়েছে শঙ্কর তা খেয়াল করেনি; ইন্দ্র শঙ্করের পিসতুতো ভাই, আবার বাল্যবন্ধু। জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত দুই বন্ধু ছায়ার মতো একে অপরের সাথে মিশে আছে; দুজনের মধ্যে গলায় গলায় ভাব—এই গ্ৰামে কেউ যদি আপাদমস্তক শঙ্করকে চিনে থাকে, তবে সে ইন্দ্র ছাড়া আর কেউ নয়। নিজের ছোট ছেলে কৃষ্ণের বয়সী এক অপরিচিত বালকের সাথে মন্দিরের দেউলে শঙ্করকে বসে থাকতে দেখে সে জিজ্ঞাসা করল,—’শঙ্কর, বালকটি কে?’
—ওর নাম ওমর, আমাদের পাঠশালায় পড়ার জন্য এসেছে।
—মুসলমান?
—হাঁ।
—আমাদের গ্ৰামে তো কোনো মুসলমান নেই; ও কার সাথে এসেছে, আর কোথা থেকেই বা এসেছ?
—ওর বাড়ি মুরাদনগর; আর এতো দূর থেকে ও এক বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দলের সাথে এসেছে। আমার বন্ধু ধর্মপাল ওমরকে আমার কাছে পাঠিয়েছে।
—এতোটুকু বালক, একা এসেছে লেখাপড়া শিখতে, তাও আবার মুসলমান—আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না শঙ্কর।
—আমিও ভাবছি, ইন্দ্র।
এই পৃথিবীতে অনেক ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা থাকে না, আবার যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করাও সম্ভব নয়; এই জন্যই পৃথিবীটা এতো সুন্দর ও রহস্যময়। মন্দিরের দেউলে যখন ওমরের ভাগ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে—সে তখন নিরুদ্বেগ-নির্বাক, মাথা নিচু করে পণ্ডিতের দেওয়া পূজার প্রসাদ খাচ্ছে; দেখলেই বোঝা যায় ওমর ভীষণ ক্ষুধার্ত।
গ্ৰামের প্রায় সবাই মোটামুটি একমত—ব্রাক্ষ্মণের গ্ৰামে একজন অপরিচিত মুসলমান বালককে আশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না; কিন্তু পণ্ডিত সবার সাথে একমত হতে পারলো না, সে বলল,—’আমার কাজ বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া—কোনো শিক্ষা প্রার্থীকে তাড়িয়ে দেওয়া নয়; তা ছাড়া বিদ্যা অর্জনের অধিকার হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান সবারই আছে। আজ যদি আমি ওমরকে তাড়িয়ে দেই, তবে কাউকে বিদ্যা-বঞ্চিত করার অপরাধে আমার উপর মায়ের অভিশাপ নেমে আসতে পারে।’
ইন্দ্রের পাশ থেকে একজন বৃদ্ধ বললেন,—’কিন্তু পণ্ডিত, যে মুসলমানরা আমাদের রাজা লক্ষণ সেনকে রাজ্যচ্যুত করেছে, সেই মুসলমানের ছেলেকে তোমার কি শিক্ষা দেওয়া উচিত হবে?’
—কাকা, এটা আমাদের ভুল ধারণা; মুসলমানরা রাজা লক্ষণ সেনকে রাজ্যচ্যুত করেনি; এটা নিমিত্ত মাত্র। প্রজাদের প্রতি তার অত্যাচারই তাকে রাজ্যচ্যুত হতে বাধ্য করেছে। দেবদত্ত ক্ষমতা একজন রাজাকে তার প্রজাদের প্রতি ন্যায় বিচার করতে শেখায়; দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা একজন রাজার কাজ, অত্যাচার করা নয়। বৌদ্ধদের প্রতি সীমাহীন অত্যাচার করার ফলে, বৌদ্ধরা দিল্লির দরবারে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে লক্ষণ সেনের অত্যাচারের প্রতিকার কামনা করার ফলশ্রুতিতে দিল্লির সুলতান শাহী তার বিশ্বস্ত সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজিকে গৌড়ে পাঠালেন অত্যাচারী রাজা লক্ষণ সেনকে সায়েস্ত করার জন্য; আর এই খবর কানে পৌঁছাতেই, ভীরু ও কাপুরুষ রাজা বিনা যুদ্ধে রাজপ্রাসাদের পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। কাকা, আমরা তখন ছোট ছিলাম, শুনেছি তিনি আমাদের গ্ৰামের উপর দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।’
পণ্ডিতের সত্যভাষণের মুখোমুখি দাঁড়াবার ক্ষমতা এই গ্রামে কারও নেই। কারণ, পণ্ডিতের কথাগুলো সত্য, আর সত্য বলেই কঠিন। ইন্দ্র বুঝতে পেরেছে পণ্ডিতের ইচ্ছা নয় ওমরকে তাড়িয়ে দেওয়া—এমন কী তারও মন চাইছে না, সন্তানতুল্য ওমরকে পণ্ডিত বিদায় করে দিক।
ইতোমধ্যে নির্মল ভট্টাচার্য্য সকালের এই অনাহুত জটলায় পৌঁছে গেছেন। ইন্দ্র যেমন শঙ্করের বন্ধু, তেমনি নির্মল কাকা ছিলেন শঙ্করের পিতা শেখর ব্যানার্জির জানের জান; দুই বন্ধুর কিংবদন্তি এখনো গ্রামের লোকের মুখে মুখে। জন্ম থেকেই শঙ্কর নির্মল কাকাকে পিতৃতুল্য জ্ঞান করে এসেছে; পণ্ডিতের কথা যেমন এই গ্রামের শেষ কথা, তেমনি নির্মল কাকার কোনো উপদেশ শঙ্করের পক্ষে অমান্য করা অসম্ভব। শঙ্করের পাশে বসে তার গায়ে হাত দিয়ে কাকা শঙ্করকে বলেলেন,—’পণ্ডিত, তোমার উদ্দেশ্যে মহৎ তা আমি জানি; কিন্তু বাবা, যাদের সাথে তুমি বসবাস করো, তাদের মতামতটাও তো তোমাকে বিবেচনায় নিতে হবে।’
—কাকা, অতিথি তো নারায়ন; আর আশ্রয় প্রার্থীকে তাড়িয়ে দেওয়া কি ধর্মের কাজ?
—না, তা তো নয়।
—কাকা, আমি রোজ মায়ের পুজো করি; বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবাই তো আমরা একই মায়ের সন্তান। শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে একটা অনাথ বালককে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা তো অন্যায়; আর কোনো ধর্মই তো মানুষের প্রতি অবিচার করাকে সমর্থন করে না।
যাকে নিয়ে এতো তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা—সেই ওমরের কিন্তু কোনো ভাবান্তর নেই; সে চুপচাপ বসে করুণ দৃষ্টিতে পণ্ডিতের দিকে তাকিয়ে আছে—দেখলে সত্যি মায়া লাগে। পাষাণ হৃদয়ের মানুষের পক্ষেও এমন নিষ্পাপ ছেলেকে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব না, আর পণ্ডিতের পক্ষে সেটা তো আরও কঠিন। কারণ, পণ্ডিতের হৃদয়টা তো ঠিক মানুষের হৃদয় নয়, যেন দয়ার সাগর।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে ওমরের আগমনের খবর সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে বিদ্যুতের বেগে; সে খবর পাঠশালা পর্যন্ত পৌঁছাতে দেরি হয়নি। পাঠশালা থেকে অনেক ছেলে ছুটে এসেছে ওমরকে দেখার জন্য।
পণ্ডিত শঙ্কর নির্মল কাকাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,—’কাকা, জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত আমি জ্ঞানতো গ্রামবাসীর সাথে কোনো অন্যায় করিনি; যেখানে গ্ৰামের সকলের মঙ্গল—আমি মনে করি, আমার মঙ্গলও সেখানে। সব দিক বিবেচনা করে আমি এই বালকটিকে আমার কাছে রাখতে চাই; যদি আপনারা, আমার পিতৃতুল্য গুরুজনেরা আমাকে অনুমতি দেন।’
পণ্ডিতের কথায় মুহূর্তে নীরবতা নেমে এলো, কারও মুখে কোনো কথা নেই। কিছুক্ষণ চিন্তা করে নির্মল কাকা বললেন,—’আমার কোনো আপত্তি নেই শঙ্কর; কারণ তোমার সিদ্ধান্তের প্রতি আমার বিশ্বাস আছে।
সবাই চুপ, কেউ কোনো প্রতিবাদ করল না; পণ্ডিতের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করাটা এক হিসাবে আবার অমানবিক; তাই সবার নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়া হলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ওমর থাকবে কোথায়? ইন্দ্র বলল,—’কিন্তু শঙ্কর, পাঠশালার ছেলেরা যদি ওমরের সঙ্গে থাকতে না চায়, তবে ও থাকবে কোথায়?’
—আপাতত ওমর আমার বাড়িতে থাকবে; তারপর না হয় দেখা যাবে কী করা যায়?
অতঃপর পণ্ডিত ওমরকে বললেন,—’চলো ওমর, বাড়ি যাই।’
পণ্ডিত কথাটা এতো স্বাভাবিকভাবে ওমরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যেন মনে হলো এটা তাদের একটা প্রাত্যহিক আলাপের অংশ—পিতা তার পুত্রকে বাড়ি ফেরার তাগাদা দিচ্ছেন। আজ ভোরে যে ওমর উদয়নগর গ্রামে এক অপরিচিত অনাহুত আগন্তুক ছিল, সে এখন পণ্ডিত শঙ্করের সাথে তার বাড়ির দিকে রওনা হয়ে গেল।
মাঝে মাঝে পৃথিবীতে কিছু স্বর্গীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়ে থাকে; মঞ্চায়িত হয় অপার্থিব নাটকের পার্থিব ঘটনাবলী; কিন্তু এই নাটকের পাত্র-পাত্রী স্বর্গের দেবতা নয়—মর্তের মানুষ। মানুষ যখন তার কথা ও কাজে দেবতার পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়, কেবল তখনই সৃষ্টি হয় অপার্থিব সেই সব দৃশ্যের—মানুষের পক্ষে যা কল্পনাতীত। কুলিন ব্রাহ্মণ, মন্দিরের একমাত্র পুরোহিত শঙ্কর ব্যানার্জি অপরিচিত এক মাতৃহীন অনাথ মুসলমান বালককে আপন সন্তানের স্নেহে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন—এই দৃশ্য স্বর্গীয় দৃশ্যের চাইতে কোনো অংশে কম নয়। সবাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে শঙ্করের পিছনে পিছনে ওমরের হেঁটে যাওয়া—শঙ্করের পক্ষে যা সম্ভব, অন্যদের কাছে তা ভাবনা-চিন্তার বাইরে।
(চলবে)



