মুক্তমত

খবরের সঙ্গেই ছিল যার আত্মিক প্রেম

জাকির হোসেন

আতাউস সামাদ ছিলেন খবরের মানুষ। খবরের সঙ্গেই তার ছিল আত্মিক প্রেম ও অন্তরঙ্গ যোগাযোগ। খবরই ছিল তার ধ্যান, জ্ঞান ও প্রাণ। খবরের খোঁজে তিনি স্কুল পালানো বালকের মতো নিরন্তর ঘুরে বেড়িয়েছেন শহরের অলি-গলি-রাজপথ, চায়ের দোকান, সভা-সমাবেশ, অফিস-আদালত, হোটেল-রেস্তোরাঁ, রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, গ্রামের মেঠো পথ, ক্ষেত-খামার সর্বত্র।

আপদমস্তক সাংবাদিক ছিলেন আতাউস সামাদ। এ ভিন্ন তার অন্য কোনো পরিচয় নেই। কেননা ৭২ বছরের জীবদ্দশায় তিনি দীর্ঘ ৫৫ বছর খবরের পেছনে ছুটেছেন, ছুটেছেন খবরের পেছনের খবরের সন্ধানে, আবিষ্কার করেছেন খবরের নানা রূপ ও স্বরূপ। তার অঙ্গীকার ছিল ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্র, সমাজ ও জন-মানুষের মুক্তি। প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। তার এই অঙ্গীকার কখনো স্থূলভাবে প্রকাশ পায় নি, হৃদয়ের গভীর থেকে অনুপ্রাণিত হতেন বলেই পেশাদারিত্বের সঙ্গে তিনি দেশপ্রেমের মহান ব্রতকে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। সারা জীবনের কর্মকাণ্ডে তিনি বুঝিয়েছেন, ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমষ্টির স্বার্থে আত্মনিবেদনের মধ্যেই নিহিত আছে মানুষের প্রকৃত মনুষ্যত্ব ও মহত্ত্ব।

একজন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কিভাবে ক্রমশ সমষ্টির কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করার বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে কিভাবে জড়িয়ে পড়েন আতাউস সামাদ তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তার রুচি ছিল উন্নত ও পরিচ্ছন্ন, সেই রুচি প্রকাশ পেত তার প্রতিটি লেখায়, কথাবার্তায়, আচার-আচরণে এবং জীবনযাপনে। জীবনের শেষ দিকে তিনি নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তার এই কলামও ছিল বস্তুনিষ্ঠ এবং গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার সহায়ক। এতে তিনি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের মাধ্যমে এদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের চিরায়ত সঙ্কট ও অন্তসারশূন্যতাকে তুলে ধরেছেন, পাশাপাশি সমসাময়িক সমাজনীতির গতিধারাকে প্রকাশ করেছেন। তার লেখা পড়লে সহজেই বোঝা যেত কি ব্যাপক ছিল তার অধ্যয়ন, কেমন তীক্ষ্ন ছিল তার পর্যবেক্ষণ শক্তি।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা’ বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। পেশাগত জীবনে তিনি কখনই ক্ষমতাসীনদের কাছে কোনো দায় অনুভব করেন নি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ হন নি। প্রভাবিত হন নি কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের দ্বারা। যথাযথভাবে অনুসন্ধান শেষে নিঃসংশয় হয়ে তবেই মতামত প্রকাশ করেছেন। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কাজটি যে গোষ্ঠী, সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়েও জরুরি এটা তিনি দেখিয়ে গেছেন জীবনব্যাপী সাধনার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় আতাউস সামাদের অবদান যে কোনো পরিমাপে অনেক বড়। আকাশছোঁয়া তার খ্যাতি। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য ছিলেন। আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে বিবিসি বলতে মার্ক টালির নামের পাশে উচ্চারিত হতো তার নাম। স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিবিসি বাংলার খবর ছিল এক ধরনের লাইফ-লাইনের মত, যেখানে প্রধান তথ্য সরবরাহকারী ছিলেন তিনি।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন আতাউস সামাদ। তিনি সামরিক ও বেসামরিক উভয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেই লড়াই করেছেন। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি সবসময় ছিলেন সামনের কাতারে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানসহ এদেশের মানুষের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গণতন্ত্রের বার্তাবাহকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আতাউস সামাদ ঢাকাতেই আত্মগোপন করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেন। তিনি নিজের গাড়িতে করে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্র গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আগমুহূর্তে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার আলবদররা ঢাকায় যে বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু করে, তারই অংশ হিসেবে আলবদরের কমান্ডার চৌধুরী মাঈনউদ্দিন তাকেও খুঁজে বেড়িয়েছে। তাকে হত্যা করার জন্য একদিন টেলিফোন করে বাসায় থাকতেও বলেছে। তিনি সেদিন বাসা থেকে দ্রুত সরে না গেলে তার নামও হয়তো শহীদের তালিকায় থাকত।

আতাউস সামাদ আশি ও নব্বইয়ের দশকের প্রথম কয়েক বছর বিবিসির ঢাকা সংবাদদাতা হিসেবে যে রিপোর্টিং করেছেন, তা পেশাদার সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে আছে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক শাসন জারির পর স্বৈরাচারী এরশাদ মানুষের সবধরনের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার হরণ করে। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে; প্রথমে ছাত্র-তরুণেরা, পরে রাজনীতিকেরা এগিয়ে আসে। সে সময় তথ্যপ্রযুক্তির সীমিত সুযোগের মধ্যে তিনি যথাসময়ে সঠিক খবরটি শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। একসময় সরকার স্থানীয় গণমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করে, সংবাদপত্রে হরতাল-ধর্মঘটের কথা লেখা যেত না। এ সময় এদেশের মানুষের প্রধানতম ভরসা ছিল বিবিসি এবং ভয়েস অব আমেরিকা থেকে সম্প্রচারিত বাংলা সংবাদ। রাজনৈতিক আন্দোলনের খবর জানতে মানুষ বিশেষভাবে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বিবিসির অনুষ্ঠানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। তারা হাটে, বাজারে, রাস্তার মোড়ে, রেস্তোরাঁর সামনে জড়ো হতো। মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন।

বিগত ওয়ান-ইলেভেনের অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রথম দিন থেকেই যে ক’জন লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী বিরোধিতা করেছিলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, সাংবাদিক আতাউস সামাদ ছিলেন তাদের একজন।

 

জাকির হোসেনঃ সাংবাদিক

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension