মুক্তমত

কাজল পাঁড়ে: সাফল্যের চেয়ে বড় যে প্রশ্ন

তুরি জনগোষ্ঠীর একজন তরুণের বিচারিক সার্ভিসে সুপারিশ কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; শিক্ষা, প্রকৃত সুযোগ-সমতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন সামনে এনেছে

জহিরুল ইসলাম

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাই গ্রামের কাজল পাঁড়ে এখন অনেকের কাছে পরিচিত নাম। ভূমিহীন কৃষক পরিবারের সন্তান এই তরুণ ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশ পেয়েছেন; ২০০ সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর মধ্যে তাঁর অবস্থান ১৪০তম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়ার সময় টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন, পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা করেছেন। সংবাদে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ মসৃণ ছিল না; বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খরচ জোগাড় করতে পরিবারকে গরু বিক্রি করতে হয়েছিল এবং গ্রামে তিনি ছিলেন বিরল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের একজন।

এটি নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত অধ্যবসায়ের সাফল্য। পরিবার ও নিজের জন্য এটি আনন্দের সংবাদ। কিন্তু কাজল পাঁড়ের গল্পটি যদি কেবল একজন তরুণের সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর গভীরতর সামাজিক তাৎপর্যের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে।

কারণ তাঁর সাফল্যের ভেতরেই একটি বড় প্রশ্ন আছে—একজন কাজল সফল হয়েছেন; কিন্তু সুযোগের অভাবে কতজন কাজল প্রতিযোগিতার মাঠে পৌঁছাতেই পারেন না?

এই প্রশ্নই ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত অর্জনের সীমা ছাড়িয়ে শিক্ষা, সামাজিক গতিশীলতা, দারিদ্র্য, প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্রের সুযোগ-সৃষ্টির কাঠামো নিয়ে ভাবার উপলক্ষ করে।

কাজল তুরি জনগোষ্ঠীর একজন তরুণ। সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর গ্রামের অধিকাংশ পরিবার কৃষিকাজ ও দিনমজুরির সঙ্গে যুক্ত; উচ্চশিক্ষার পথ সেখানে খুব পরিচিত নয়। আগের এক প্রতিবেদনে তাঁকে গ্রামের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোই ছিল একটি দীর্ঘ সামাজিক ও অর্থনৈতিক যাত্রার ফল।

এই জায়গায় কাজলের গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। মেধা শুধু শহর, সচ্ছল পরিবার কিংবা সুবিধাজনক শিক্ষাপরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মেধা গ্রামেও আছে, দরিদ্র পরিবারেও আছে, সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেও আছে। পার্থক্য তৈরি হয় অনেক সময় মেধা বিকশিত হওয়ার সুযোগে।

সুতরাং প্রশ্নটি শুধু—কে কত মেধাবী? প্রশ্ন হওয়া উচিত—কার মেধা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেল, আর কার মেধা সুযোগের অভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল?

এখানেই আনুষ্ঠানিক সমতা ও প্রকৃত সমতার পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে সমতা, বৈষম্যহীনতা এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সুযোগের সমতার নীতি স্বীকার করেছে—২৭, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে। একই সঙ্গে অনগ্রসর অংশের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষ বিধান প্রণয়নের সুযোগও রাখা হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক সমতা এবং বাস্তব জীবনের সুযোগ এক বিষয় নয়।

ধরা যাক, একজন শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থী এবং একজন ভূমিহীন কৃষকের সন্তান একই বিচারিক সার্ভিস পরীক্ষায় বসছেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দুজনের জন্যই একই; নিয়মও একই। কিন্তু পরীক্ষার প্রস্তুতির আগের দীর্ঘ সময় কি তাঁদের জন্য একই ছিল?

একজন হয়তো ভালো বিদ্যালয়, শিক্ষাসামগ্রী, প্রযুক্তি, আলাদা পড়ার ঘর এবং পরিবারের পূর্ণ আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। অন্যজনকে হয়তো পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে লড়তে হয়েছে, টিউশনি করতে হয়েছে, সীমিত সম্পদে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। পরীক্ষার হলে এই পার্থক্য দেখা যায় না; কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথেই পার্থক্যটি তৈরি হয়।

এই বোঝাপড়াটি অমর্ত্য সেনের ‘সক্ষমতা’ ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমান সুযোগ মানে কেবল বাধা না থাকা নয়; বরং প্রত্যেকের সামর্থ্য ও স্বাধীনতাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো পরিবেশ থাকা। রাষ্ট্র যদি শুধু একই প্রশ্নপত্র দেয়, কিন্তু শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, আবাসন, প্রযুক্তি ও আর্থিক নিরাপত্তার অসমতা রেখে দেয়, তাহলে সেটি প্রকৃত সুযোগ-সমতা নয়—সেটি আনুষ্ঠানিক সমতার একটি অংশমাত্র।

এখানে মেধাতন্ত্রের কুহকও মনে রাখা দরকার। আমরা প্রায়ই ভাবি, পরীক্ষা সবার জন্য সমান, তাই সাফল্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত যোগ্যতার ফল। কিন্তু মেধা নিজে থেকে জন্মায় না; পরিবার, বিদ্যালয়, ভাষা, সামাজিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তাকে লালন করে। পিয়ের বোর্দিয়ুর ভাষায়, সাংস্কৃতিক পুঁজি ও সামাজিক পুঁজি প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরিত হয়। যে শিক্ষার্থী এই পুঁজি পায়, তার কাছে প্রতিযোগিতা সহজ হয়; যে পায় না, তাকে একই লক্ষ্যে পৌঁছাতে দ্বিগুণ পথ হাঁটতে হয়। কাজলের ক্ষেত্রে সেই দ্বিগুণ পথটাই দৃশ্যমান।

আরও একটি প্রশ্ন আসে বিচারব্যবস্থায় সামাজিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে। বিচারকের সিদ্ধান্ত অবশ্যই আইন, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের নীতির ভিত্তিতে হতে হবে। কোনো বিচারকের সামাজিক বা জনগোষ্ঠীগত পরিচয় তাঁর বিচারিক সিদ্ধান্তের পূর্বনির্ধারক হতে পারে না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে যোগ্য মানুষের প্রবেশের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে।

কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বৈধতা শুধু আইন ও বিধির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; নাগরিকেরা সেই প্রতিষ্ঠানকে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিজেদের প্রতিনিধিত্বশীল মনে করেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিনিধিত্ব মানে যোগ্যতার শিথিলতা নয়; প্রতিনিধিত্ব মানে সুযোগের বৃত্তকে প্রশস্ত করা, যাতে যোগ্যতা সব জায়গা থেকেই উঠে আসতে পারে।

একজন তুরি জনগোষ্ঠীর তরুণ যখন কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বিচারিক সার্ভিসে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করেন, তখন তাঁর সাফল্য তাঁর নিজের পরিচয়ের বাইরেও একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। গ্রামের কোনো শিক্ষার্থী হয়তো প্রথমবার ভাবতে পারে—বিচারক হওয়াও আমার জন্য সম্ভব। সামাজিক পরিবর্তনের একটি পথ এভাবেও তৈরি হতে পারে; একজন মানুষের অর্জন অন্য মানুষের কল্পনার সীমা বদলে দিতে পারে।

তবে একজন কাজলের সাফল্যকে পুরো ব্যবস্থার সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। কারণ ব্যতিক্রম কখনো পুরো কাঠামোর চিত্র নয়; বরং ব্যতিক্রম আমাদের কাঠামোকে নতুন করে পরীক্ষা করার সুযোগ দেয়।

যদি একজন ভূমিহীন কৃষকের সন্তান প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বিচারিক সার্ভিসে পৌঁছাতে পারেন, তাহলে প্রশ্ন হবে—আরও কত মেধাবী তরুণ-তরুণী এমন সুযোগের অপেক্ষায় আছেন? তাঁদের কতজন মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের পর ঝরে পড়ছেন? কতজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সামর্থ্য হারাচ্ছেন? কতজন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির আগেই অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাছে থেমে যাচ্ছেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু কাজলের গল্পে পাওয়া যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, দারিদ্র্য, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার, সরকারি চাকরিতে প্রতিনিধিত্ব এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য, গবেষণা ও নীতি-বিশ্লেষণ। প্রয়োজন—প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও উপবৃত্তি, গ্রামীণ লাইব্রেরি ও ইন্টারনেট, মানসম্মত বিদ্যালয়, মেন্টরশিপ, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সহায়তা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তি মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা।

তবু কাজলের গল্প আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেয়—প্রতিভা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, শহর বা জনগোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পদ নয়।

রাষ্ট্রের কাজ শুধু সফল মানুষের সাফল্য উদযাপন করা নয়; সম্ভাবনাময় মানুষ যাতে সফল হওয়ার সুযোগ পায়, সেই পরিবেশ তৈরি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কাজল পাঁড়ের সাফল্য তাই আনন্দের সংবাদ, একই সঙ্গে একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা শুধু একজন তরুণের মুখ দেখতে পারি; আবার চাইলে দেখতে পারি আমাদের শিক্ষা, অর্থনীতি ও সুযোগের কাঠামোকেও।

একজন কাজল আজ বিচারিক সার্ভিসে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায়। তাঁর সাফল্যকে সম্মান করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হয়তো শুধু তাঁকে অভিনন্দন জানানো নয়; বরং এমন একটি সমাজ নির্মাণের চেষ্টা করা, যেখানে আরেকজন কাজলকে নিজের সম্ভাবনা প্রমাণ করার আগে দারিদ্র্য, প্রান্তিকতা ও সুযোগের অসমতার সঙ্গে অতিরিক্ত লড়াই করতে না হয়।

মেধা কোথায় জন্ম নেবে, তা রাষ্ট্র ঠিক করতে পারে না। কিন্তু মেধা যাতে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়, সেই পরিবেশ রাষ্ট্র ও সমাজ তৈরি করতে পারে। কাজলের গল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত সেখানেই।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension