
আজ আমার বন্ধুর জন্মদিন
শাহ্ জে. চৌধুরী
আজ আমার বন্ধুর জন্মদিন। আজকে আমার বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের জন্মদিন।
জর্জ হ্যারিসন বাঙালির বন্ধু। আর আমিও মনেপ্রাণে বাঙালি। এই যে আমি পরিচয়টি বাঙালি বলে দিলাম, আমার এই বলে দেয়ার পেছনে জর্জ হ্যারিসন নামের মানুষটির আশ্চর্য রকম অবদান রয়েছে। জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে আমার কখনো মুখোমুখি দেখা হয় নি। আসলে কোনো বাঙালির সঙ্গেই দেখা হয় নি। অথচ সম্পূর্ণ অচেনা অজানা মানুষটি মাত্র একটি কথায় নিজের সবটা নিয়ে বাঙালির জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
অবশ্য জর্জ হ্যারিসনের পরিচয়টি এখন বাঙালি জানে। কতটা জানে প্রশ্নটা না হয় উহ্য থাকুক। নামটি জানে বটে। জর্জ হ্যারিসন বিংশ শতাব্দীর খুব প্রতিভাবান একজন সঙ্গীত শিল্পী। একই সঙ্গে গিটার বাদকও। পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যান্ড সঙ্গীতের দল ‘দ্য বিটলসের’ এর চার সদস্যের একজন তিনি। তো জর্জ হ্যারিসনের আরেকজন বন্ধু ছিলেন। তাঁর নাম রবি শংকর। তাঁর পরিচয়টি হলো তিনি ছিলেন সেতার বাদক। তবে শুধু সেতার বাদক বললে অন্যায় হবে। রবি শংকর ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় ও ধ্রুপদী রাগসঙ্গীতের এক কিংবদন্তী।
১৯৭১ সালের মাঝামাঝি। বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে। চারপাশ জুড়ে কেবলই ধ্বংসযজ্ঞ। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্র নেই, খাবার নেই, নেই চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা। মানুষ মরছে, যেন মানুষ নয়, পোকামাকড়। কোটি কোটি মানুষ ভিটেমাটি থুয়ে পালিয়ে গেছে। ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে এক কোটি মানুষ। শরণার্থী হয়েছে তারা। ভারত সরকারও হিমশিম খাচ্ছে। তখন ভারতের সেসময়ের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি পণ্ডিত রবি শঙ্করকে ডাকলেন। ডেকে বললেন, একটা কিছু করুন।
জর্জ হ্যারিসন ছিলেন রবি শঙ্করের ছিল ভীষণ বন্ধু। তিনি গেলেন আমেরিকায় জর্জ হ্যারিসনের কাছে। গিয়ে বললেন বাংলাদেশের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের অত্যাচার, নির্যাতন আর গণহত্যার কথা। জানালেন স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা। বর্ণনা দিলেন ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থীদের করুন জীবন যাপনের কথা। জর্জ হ্যারিসন শুনলেন। ভাবতে লাগলেন কি করা যায়। রবি শংকর বললেন, ছোট করে একটা কনসার্ট করলে কেমন হয়? টিকেট বিক্রির টাকা দিয়ে সাহায্য করা যেতে পারে
শুনে জর্জ হ্যারিসন বললেন, কনসার্টই যদি করি তো ছোট করে লাভ কি? বড় করেই করব।
এরপর দু’জনে মিলে আয়োজন করলেন ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ । নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত হলো বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যার্থে প্রথম চ্যারিটি কনসার্ট – ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। এখন পর্যন্ত বিশ্বে যত চ্যারিটি কনসার্ট হয়েছে তার মধ্যে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ প্রভাবে অন্যতম। সেদিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট। সেদিন দুপুরে নিউ ইয়র্ক সিটির ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে দু’টি বেনিফিট কনসার্ট, দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আয়োজন করে। এতে অংশ নিয়েছিলেন বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীদের এক বিশাল দল। এদের মধ্যে বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, জর্জ হ্যারিসন, বিলি প্রিস্টন, লিওন রাসেল, ব্যাড ফিঙ্গার এবং রিঙ্গো রকস্টার ছিলেন উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৪০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে এই কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। কনসার্টে জর্জ হ্যারিসন তার নিজের লেখা বিখ্যাত সেই মর্মস্পর্ষি ‘বাংলাদেশ’ গানটি পরিবেশন করেন। কনসার্টের টিকেট, ক্যাসেট হতে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ ইউনিসেফের ফান্ডে জমা করা হয়।
কনসার্টে সংগৃহীত আড়াই লক্ষ ডলার ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের জন্য দেয়া হয়েছিল।
কনসার্টের মূল আকর্ষণ ছিলেন বব ডিলান ও জর্জ হ্যারিসন। অনুষ্ঠানের শেষ পরিবেশনা ছিল জর্জ হ্যারিসনের অবিস্মরণীয় গান ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। গানটি লেখা ও সুর জর্জের নিজের। যুদ্ধ পীড়িত বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সকরুণ আহ্বান ছিল গানের মূল কথা। এটি ছিল মানবতার কল্যাণে আয়োজিত সর্ব প্রথম এবং সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠান।
বাংলাদেশের মানুষদের কাছে বিশ্বের অন্য সকল বিদেশি সঙ্গীত শিল্পীদের তুলনায় জর্জ হ্যারিসনের গুরুত্ব অনেক উচ্চতায়। আর এর কারণটি জর্জ হ্যারিসনের নিঃস্বার্থ আয়োজন ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ।’
আজ এই নিঃস্বার্থ প্রতিভাবান মানুষটির জন্মদিন।
জর্জ হ্যারিসন জন্মেছিলেন ১৯৪৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। আমেরিকায় নয়, যুক্তরাজ্যে। তিনি সঙ্গীত পরিচালনা, রেকর্ড প্রযোজনা আর চলচ্চিত্র প্রযোজনা- প্রায় সবক্ষেত্রে সমান দক্ষতায় পদচারণ করে গেছেন। মূলত লিড গিটারিস্ট হলেও বিটলসের প্রতিটি অ্যালবামেই জর্জ হ্যারিসন নিজের লেখা আর সুরে একটি দুটি গান করতেন। ১৯৭০ সালের পরবর্তী সময়গুলোতে জর্জ হ্যারিসনের গান প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
জর্জ হ্যরিসন মারা যান ৫৮ বছর বয়সে। ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর। তিনি মেটাস্টাটিক নন-স্মল সেল লাং ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁকে হলিউড ফরএভার সিমেট্রিতে ভারতে হিন্দুরীতিতে দাহ করা হয়। ধর্মবিশ্বাস সর্ম্পকে জর্জ হ্যারিসনের মতামত ছিল, ‘সকল মতবাদই একটি বৃহৎ বৃক্ষের শাখা। তুমি তাকে কি নামে ডাকবে এটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।’



