
ছড়ার কথা
জাকির হোসেন
ছড়া দিয়েই ফয়েজ ভাইয়ের লেখালেখির শুরু। নিষ্ঠাবান ছড়াকার ছিলেন তিনি। সারাটা জীবন গভীর মনোযোগে ছড়া লিখেছেন। তাঁর প্রতিটি ছড়া অতিযত্নে গড়া। এক সময় পূণ্যবান নারীরা যেমন সংসারের সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে পরম মততায় প্রিয়জনদের জন্য স্যুয়েটার বুনতেন, নানারকম নকশা ও সেলাইয়ের কাজ করতেন এবং এসব কাজের মধ্যে তারা যেমন নিজেদের সুখ ও স্বপ্নকে বুনতেন, অব্যক্ত প্রেম ও পবিত্র কামনার প্রকাশ ঘটাতেন, তেমনি ফয়েজ ভাই ছড়ার মাধ্যমে নিজের অমলিন শিশুসুলভ মনের রূপ ও স্বরূপকে প্রকাশ করেছেন। কাজের ফাঁকে, বন্ধুর আড্ডায়, চলতি পথে ছাড়া লিখেছেন তিনি। আন্ডারগ্রাউন্ডের অনিশ্চিত কর্কশ, কঠিন ও নিষ্ঠুর জীবনে এবং কারাগারের নির্জন সেলে তিনি ছড়াকে ছেড়ে থাকেন নি, সকল বৈরিতাকে উপেক্ষা করে ছড়া লিখেছেন।
কৈশোরে প্রথম ছড়া প্রকাশের পর ফয়েজ ভাই যেসব কাণ্ড করেছেন এবং প্রথম যৌবনে প্রথম বই প্রকাশের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তা সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়। ১৯৪৪ সালে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় ফয়েজ ভাই বিক্রমপুর থেকে ‘নাম বিভ্রাট’ নামের একটি ছড়া কলকাতার ‘শিশু সওগাত’-এ পাঠান। ছড়াটি ছাপা হবে এমন বিশ্বাস তাঁর ছিল না। কিন্তু সবাইকে বিস্মিত করে ছড়াটি প্রকাশ হয়। এটিই তাঁর জীবনের প্রথম প্রকাশিত ছড়া। যখন তিনি ডাক মারফত পত্রিকাটি হাতে পান, তখন মহাউল্লাসে জগতটাকে যেন অতিক্রম করে যান। আনন্দে পাগলের মত হয়ে যান। মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন সবাইকে তাঁর প্রকাশিত ছড়াটি দেখান। এমনকি বিক্রমপুরের শ্রীনগরের বাজারে বিভিন্ন দোকানিকে পর্যন্ত দেখান। প্রথম ছড়া প্রকাশের পর একপর্যায়ে তিনি একদিন স্কুল থেকে বাড়ি না ফিরে বিক্রমপুর থেকে স্টিমারে গোয়ালন্দঘাট এবং সেখান থেকে রেলে চেপে কোলকাতায় শিশু সওগাত অফিসে যান। অফিসে কর্মরত বিখ্যাত কবি আহসান হাবিব ও হাবিবুর রহমানসহ অন্য সবাই তাঁকে দেখে তো অবাক। আহসান হাবিব একপর্যায়ে ফয়েজ ভাইকে খাওয়া-দাওয়া করিয়ে বলেন, ‘তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাও। কারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন যদি জানেন তোমার ছড়া প্রকাশ হয়েছে তাহলে আমাদের চাকরি থাকবে না। কারণ ছড়া লিখবে বড়রা, পড়বে ছোটরা।’
আহসান হাবিব এরপর ফয়েজ ভাইকে কোলকাতা শিয়ালদহ স্টেশন নিয়ে আসেন এবং সেখান থেকে ট্রেনে তুলে দেন।
ছড়া ছাড়াও সাহিত্যের অন্যান্য শাখার প্রতিও খুব আগ্রহ ছিল ফয়েজ ভাইয়ের। বলতেন, ‘আমি যে কেবল ছড়াই লিখেছিলাম তা নয়, স্কুলের শেষের দিকে আমি ব্যাপকভাবে পাঠ করেছি এবং সেই সময় আমার হাতে আসে রবীন্দ্রকাব্য ‘মানসী’। আমি আমার এক আত্মীয়ের কাছ থেকে বঙ্কিমচন্দ্র ও শরৎ বাবুর কিছু বই পেয়েছিলাম। সেই সময় অনেক বই পড়েছি কিন্তু মর্ম উপলব্ধি করতে পারি নি। স্কুলের শেষের দিকে চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি স্থানীয় ডা. নন্দীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি আমাকে প্রতি মাসে বুদ্ধদেব বাবুর কবিতা ও ‘পরিচয়’ পত্রিকা পড়তে দিতেন। এসব লেখা আমি তখন বুঝতে পারতাম না। তা ছাড়া আমাদের বাড়িতে আসতো মাসিক ‘সওগাত’। এসব পত্রিকা ও বইয়ের মাধ্যমেই সাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।’
ফয়েজ ভাইয়ের প্রথম ছড়া ১৯৪৪ সালে প্রকাশ হলেও প্রথম ছড়ার বই প্রকাশ হয় ১৯৫৬ সালে। নাম ‘জোনাকি’। প্রথমে ফয়েজ ভাই তাঁর বন্ধু পটুয়া কামরুল হাসানকে দিয়ে বইটির ছবি আকাঁনোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কামরুল হাসান তিন বছরেও আঁকতে পারেন নি। এরপর আরেক বন্ধু শিল্পী বিজন চৌধুরীকে দেন ছবি আঁকার জন্য। বিজন চৌধুরী দীর্ঘদিন ঘোরানোর পর একদিন গোপনে কোলকাতা চলে যান এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেন। ফলে জোনাকির পাণ্ডুলিপি এবং শিল্পী বিজন চৌধুরীর খোঁজে ফয়েজ ভাই কোলকাতা যান ১৯৫৬ সালে। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর কোলকাতার কালীগঞ্জে শিল্পী বিজন চৌধুরীর সন্ধান পান। সেখানে বিজন চৌধুরী তিন দিনে বইটির ছবি আঁকেন। এরপর বইটির প্রচ্ছদ আঁকেন শিল্পী কামরুল হাসান। সেকালের ‘আর্ট অ্যান্ড লেটারস’ প্রকাশনী এ পুস্তকটি প্রকাশ করে। এই জোনাকী অঙ্কুরিত হয় ১৯৪৪ সালে। প্রধানত শিল্পীর অভাবে প্রায় ১২ বছর পর ১৯৫৬ সালে বইটি প্রকাশ পায়।
ছড়াকে ফয়েজ ভাই পরিপূর্ণ সাহিত্য হিসেবেই গ্রহণ করেন। তিনি জানতেন ছড়ার অপরিপক্বতা, অস্পষ্টতা ও মূল্যায়ন করা খুব প্রয়োজন। আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের গোড়াপত্তনেই ছড়ার আধিপত্য রয়ে গেছে। ভাষা তখন ছিল অপরিচ্ছন্ন, শব্দ তখন সুগঠিত নয় এবং প্রকাশ ভঙ্গি ছিল চলমান ধারায়। ফলে ছড়ার মধ্যে আমরা বিশেষ যুগের ও সময়ের প্রতিফলন দেখতে পাই। সে কারণেই ছড়ায় আমাদের অতীত জীবনধারা, রাজ্য শাসন, খাদ্য প্রণালী, সামাজিক পদ্ধতি ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং তৎকালীন সভ্যতার বিকাশের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। এজন্য ছড়া আমাদের ঐতিহ্য ও জীবনধারাকে রক্ষা করেছে।
বর্তমানে দৈনিক পত্রিকায় শিশুদের বিভাগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবহেলিত। এই পৃষ্ঠার প্রতি যথাযথ মর্যাদা দেয়া হয় না। কোনও একজন ছেলে অথবা একজন অল্প বয়সী অপরিপক্ক যুবক এ ক্ষেত্রে নিয়োগ করা হয়। এ কারণে এই পৃষ্ঠার মান রক্ষিত হয় না। অপরিপক্ব ও অবাঞ্ছিত বহু লেখায় ছোটদের পাতাগুলো ভরার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। বিখ্যাত কাগজগুলোও একই রকমভাবে অবহেলার পথ অবলম্বন করে। এ নিয়ে ফয়েজ ভাইয়ের ক্ষোভের অন্ত ছিল না।
২০১০ সালের আগস্ট মাসের এক সকালে ফয়েজ ভাই আমাকে ফোনে বলেন, ‘তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। আমার প্রায় এক হাজার ছড়া অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এ নিয়ে কথা বলতে চাই।’ এটা শুনে আমি তো অবাক। বিশ্বাস করতে পারছি না ফয়েজ ভাইয়ের এক হাজার ছড়া অপ্রকাশিত! বিষয়টি জানতে তৎক্ষনাৎ ফয়েজ ভাইয়ের বাসায় যাই। চা খেতে খেতে তিনি নিজেই ছড়ার প্রসঙ্গটি তুললেন,- “আমি ‘৫০, ’৬০ ও ’৭০-এর দশকে আঙুরের মত থোকা থোকা ছড়া দেখতে পেতাম। কোথাও হেঁটে যাওয়ার সময় আমি ছড়া লিখেছি, নৌকায় আমি ছড়া লিখেছি এবং রিকশায় আমি ছড়া লিখেছি। ছড়া রচনার জন্য নির্দিষ্ট কোনও সময় আমি জীবনে কখনও রাখি নি। দিনে বা রাতে কাজের মধ্যে ছড়া লেখার সময় আমি বের করে নিয়েছি। তখন আমার লেখা প্রতিটি ছড়াই ছাপা হয়ে যেত বিভিন্ন কাগজে। পরবর্তী সময় যা ছাপা হয়, তার চেয়ে বেশি আমি লিখতে থাকি। ফলে প্রকাশকরা যে ছড়া প্রকাশের জন্য নেন, তার থেকে অধিকতর ছড়া আমার কাছে জমা হয়। এভাবেই আমার ঘরে সহস্রাধিক ছড়ার পাণ্ডুলিপি সঞ্চিত হতে থাকে। সেই ছড়াগুলো আমি এখন প্রকাশের জন্য উন্মুখ। কোনও লেখকই তার লেখা অপ্রকাশিত রাখতে চায় না। আমিও এর ব্যতিক্রম নই।’
দুপুরে অফিসে এসেই ফয়েজ ভাইয়ের হাজার ছড়া নিয়ে লিখতে শুরু করি। দু’দিন পর তা সাহিত্য পাতায় প্রকাশ হয় প্রধান রচনা হিসেবে। এতে ফয়েজ ভাই খুব খুশি হন। কয়েকদিন পর ফোনে জানান, আমার লেখাতে নাকি কাজ হয়েছে। বাংলাবাজার থেকে প্রকাশকরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেছেন। আর বাংলা একাডেমি আসন্ন মেলায় দুই শ’ ছড়ার একটি বই বের করবে বলে জানিয়েছেন খোদ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। তবে পরবর্তীতে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এ নিয়ে গড়িমসি শুরু করেন। এতে ফয়েজ ভাই খুব বিরক্ত হন এবং তাঁর সম্পর্কে নানা রকম নেতিবাচক মন্তব্য করেন। এসব কথা এখন না বলাই ভালো। যাই হোক, সেবার মেলায় ফয়েজ ভাইয়ের কয়েকটি বই প্রকাশ হয়। বাংলা একাডেমি থেকেও দুই শ’ ছড়ার বইটি প্রকাশ হয়। এতে ফয়েজ ভাই খুব খুশি হন।
চলবে
লেখক: সাংবাদিক



