মুক্তমত

‘জাফর ইকবাল বাঙালি জাতিকে কী দিয়াছেন?’

হাসান মাহবুব

বছর দশেক আগে সামু ব্লগে আলেকজান্ডার ডেনড্রাইট নামক একজন ব্লগার একটি পোস্ট লিখেছিলেন। ‘জাফর ইকবাল বাঙালি জাতিকে কী দিয়াছেন?’

পোস্টের মূল বক্তব্য ছিলো এমন জাফর ইকবাল ইসলাম বিদ্বেষী, জাফর ইকবাল পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর কাজ করে বিশাল অপরাধ করেছেন, দেশের জন্যে জাফর ইকবালের কোনও অবদান নেই ইত্যাদি।

সেই পোস্ট মাইনাসের (তখন সামু ব্লগে অপছন্দ প্রকাশের জন্যে মাইনাস বাটন ছিল) রেকর্ড গড়েছিল। ব্লগাররা নিয়মিত ডেনড্রাইট সাহেবকে ধুয়ে দিত। যারা সেই পোস্টের সমর্থনে কথা বলত, তারা প্রায় সবাই ছিল ব্লগীয় পরিভাষায় ছাগুগোত্রের। ছাগু মানে হলো রাজাকারমনা, জামাত তোষণকারী, পাকিস্তানের পেয়ারা বান্দা। অনলাইন জগতে এরপরেও বহুবার জাফর ইকবালের চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে। কখনও ফটোশপড্‌ ইমেজ দিয়ে, কখনও মিথ্যা উদ্ধৃতি দিয়ে, কখনও তার মেয়েকে নিয়ে কুৎসা রচনার চেষ্টা করে, কখনও তার বইয়ের নামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ,উসকানি ছড়িয়ে, নানাভাবে তারা চেষ্টা চালিয়ে গেছে। এই তারা কারা? সহজ উত্তর, ছাগুগোষ্ঠী। তারা এত উঠেপড়ে লেগে কিছু অন্ধ মানুষকে অন্ধতর করতে পেরেছে, কিন্তু সচেতন এবং শিক্ষিত মানুষদের কাছে খুব একটু পাত্তা পায় নি কখনই।

কিন্তু ইদানিং জাফর ইকবালের পোস্ট মানেই কটূক্তি আর ট্রোলের সমারোহ। আর এতে অংশ নেন এ সময়ের ‘সচেতন’ যুবসমাজ! লেখা যদি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হয়, তাহলেও ট্রোল, লেখা রাজাকারের বিরুদ্ধে হলেও ট্রোল। ছাগুগোত্রের সাথে তাদের আর পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না এখানে। এই কিছুদিন আগেও ‘জাফর ইকবালের গায়েবানা জানাজা’ নামক ইভেন্টে অনেককেই দেখলাম গোয়িং দিতে। আমি বলছি না জাফর ইকবালকে নমস্য মানতে হবে, তার সব কথাই মেনে নিতে হবে, কিন্তু হঠাৎ করে কী ঘটে গেল যে তার গায়েবানা জানাজার ইভেন্টে দলে দলে গোয়িং দিতে হবে বাঁশের কেল্লা গ্রুপে সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে?

এসবের শুরু কোটা আন্দোলন নিয়ে একটি লেখায় নিজেদের রাজাকার দাবী করে প্রতিবাদ করায় তাদের ওপর হড়হড় করে বমি করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করতে চাওয়ায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার এই আচরণ পছন্দ করি নি। কারণ তিনি যাদের ওপর হড়হড় করে বমি করতে চেয়েছেন তারা তো তার ছাত্র, সন্তানতূল্য। তারা যদি কোনও ভুল করে, তিনি সেটা শুধরে দিতে কাজ করবেন, হড়হড় করে বমি করতে চাইবেন কেন? তিনি এর আগেও ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শাবিতে ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তদের শাস্তিও তিনি চান নি, কারণ, তাদের বিপথে আসার দায় প্রশাসনের ওপরেও বর্তায়। যেই ছেলেটি তাকে ছুরি মেরেছিল, তিনি তাকেও রক্ষা করতে চেয়েছেন, বলেছেন তার কোনও ক্ষতি যেন না হয়, তাহলে তার এই হড়হড় করে বমি করতে চাওয়ার কারণ কী?

কারণ হলো, তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাজাকারেরা তার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত গোত্র। এর আগে জামাতের দিগন্ত টিভির সাংবাদিককে ধমকেছেন, সাক্ষাৎকার দেন নি। তারা রাগবে না তো কি?

সংসদ সদস্য মতিয়া চৌধুরীর একটি বক্তব্য এডিট করে কোটা আন্দোলনকারীদের রাজাকারের বাচ্চা বলা হয়েছে বলে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছিল ছাগুগোত্র। পরে সেটা ধরা পড়ার পরেও অতি উৎসাহী কিছু ছাত্র নিজেদের রাজাকার আখ্যা দিয়ে কোটা আন্দোলন চালিয়ে গেছে। এখানে উল্লেখ্য, জাফর ইকবাল কোটা আন্দোলনের একদম শুরুতে এটার সমর্থনেই লিখেছিলেন। কিন্তু নিজেদের রাজাকার দাবী করে আন্দোলন করতে দেখে তার বিবমিষা জাগে। জাগাটাই স্বাভাবিক। তবে তার প্রকাশটা তিনি এভাবে না করলেও পারতেন।

তার হড়হড় বমি মহা আগ্রহে চেটেপুটে খেলো ছাগুগোত্র, এবং তার প্রতি তাদের ঘৃণাকে ছড়িয়ে দেবার চমৎকার এক উপলক্ষ্য পেয়ে গেল। তার গত দুটি লেখায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বলেছেন, বারবার বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই হওয়া উচিত আমাদের বাংলাদেশীত্ব নিরুপনের ফিল্টার, কথাটা কি খারাপ কিছু? হ্যাঁ, আওয়ামী লীগ সরকার ১০ বছর আগে ক্ষমতায় আসার সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার আশাবাদ দিয়েছিল, এখন এই চেতনালদ্ধ উপজাত নানা মানুষ নানা ধান্দায় লুটেপুটে খাচ্ছে, ফলে শব্দটাই খেলো হয়ে আসছে। কিন্তু জাফর ইকবাল ১০ বছর ধরে একই কথা বলে এসেছেন। তিনি পাল্টান নি, সুবিধা নেন নি, উল্টো কুৎসার শিকার হয়েছেন, ছুরিকাহত হয়েছেন। হ্যাঁ, তার লেখার, কাজ করার আরও জায়গা আছে। কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখাটা বেশি জরুরী মনে করছেন, তাই বলছেন অবিরত।

আপনার কাছে টার্কি পালন বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে, আপনি সেটা নিয়ে বারবার লেখেন, কেউ কিছু বলবে না। আপনার কাছে তুলা চাষ গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে, লিখুন না বারবার, কেউ কিছু বলবে না। আপনি ক্রিকেটের চেতনা নিয়ে পোস্ট দেন, সেলফির চেতনা নিয়ে পোস্ট দেন, লা লীগার চেতনা নিয়ে পোস্ট দেন, কোনও অসুবিধা নাই, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভালো কথা বললেও হয়ে যায় চেতনা ব্যবসায়ী, তাই না? তা এই ব্যবসা করে তিনি কী পেয়েছেন? মাথায় ছুরির আঘাত। ভালো না?

অনেকেই তার মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নেওয়া নিয়ে তাচ্ছিল্য করেন। আমি এটা নিয়ে তার পক্ষে কিছু বলব না। শুধু একটা জিজ্ঞাসা, আপনার বাবা কি মুক্তিযুদ্ধ করছিল? আপনার চাচা,ফুপা, খালুদের সবাই কি মুক্তিযুদ্ধ করেছিল? যদি সবাই না করে থাকে, তাহলে তাদেরকে ধরেন না কেন? মুক্তিযুদ্ধ করে নি, দেশ স্বাধীন হবার পর এটা নিয়ে মাথাব্যথাও নেই, এমন মানুষই কি দরকার? জাফর ইকবাল মুক্তিযুদ্ধ করেন নি বলেই তো দায়মোচনের জন্যে বেশি বেশি বলতে হবে, নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে ইতিহাস। তার লেখার ক্ষমতা আছে। তিনি কেন তা কাজে লাগাবেন না! ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ এর মত ক্লাসিক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস তিনি লিখেছেন, ‘একজন দুর্বল মানুষ’, ‘নুরুল এবং তার নোটবই’য়ে লিখেছেন অসাধারণ সব ছোটগল্প। ছোটদের জন্যে ১০ টাকা মূল্যের অতি ছোট পুস্তিকা লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে, পড়াবেন না আপনার সন্তানকে? জানাবেন না ইতিহাস? হ্যাঁ, এখন তার লেখায় সেই আগের শক্তিমত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। আমার বন্ধু রাশেদের মত বই দিয়ে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারছেন না, গঁৎবাধা কথা বলে যাচ্ছেন বারবার।

কিন্তু যেই দেশে এখনও পাকিস্তান জিতলে মিছিল বের হয়, মুখে পাকিস্তানের পতাকা এঁকে খেলা দেখতে যায় তরুণসমাজ, সেই দেশে এই গঁৎবাধা কথাগুলি নিঃস্বার্থভাবে বলে যাওয়ার লোক খুব দরকার। পছন্দ না হলে ছুরি টুরি মেরে দিয়েন, কী আর করবেন!

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension