প্রধান খবরযুক্তরাষ্ট্র

টু্ইন টাওয়ার হামলায় যেভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন তারা

২১ বছর আগে আমেরিকায় চারটি যাত্রীবাহী জেট বিমান ছিনতাই করে সেগুলো দিয়ে আঘাত হানা হয়েছিল নিউইয়র্কের দুটি আকাশচুম্বী ভবন, পেন্টাগনসহ কয়েকটি স্থানে। যে ঘটনায় নিহত হন কয়েক হাজার মানুষ। এই হামলা ছিল শতাব্দীর অন্যতম সবচেয়ে ভয়াবহ একটি হামলা। শুধু যুক্তরাষ্ট্রবাসীর জন্যই নয়, গোটা বিশ্ব চমকে গিয়েছিল ঘটনার ভয়াবহতায়। দিনটি ছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। খবর ইনডিপেনডেন্টের।

দুটি বিমান বিধ্বস্ত করা হয়েছিল নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার ভবনে। প্রথম বিমানটি আঘাত হানে নর্থ টাওয়ারে। দ্বিতীয় বিমানটি সাউথ টাওয়ারে। দুটি ভবনেই আগুন ধরে যায়। ভবন দুটির ওপরতলায় মানুষজন আটকা পড়ে যান। শহরের আকাশে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। দুটি টাওয়ার ভবনই ছিল ১১০ তলা। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে দুটি ভবনই বিশাল ধুলার ঝড় তুলে মাটিতে ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ে। ঘটনায় প্রায় তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারান। কিন্তু ওই ঘটনার দিন অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান কানাডীয় ব্যবসায়ী ব্রায়ান ক্লার্ক। তিনি ওই সময় স্ট্যানলি প্রাইমনাথ নামের এক ব্যক্তির প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।

ব্রায়ান বলেন, ২০০১ সারের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সাউথ টাওয়ারের ৮৪ তলায় কাজ করছিলেন। সকাল ৯টা ৩ মিনিটে একটি বিমান ৭৭ থেকে ৮৫ তলার মাঝামাঝিতে আঘাত হানে। ঘটনার প্রায় ১০ বছর পরে বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্রায়ান বলেছিলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঘর তছনছ হয়ে যায়। কয়েক মুহূর্তেই সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়। প্রথম ধাক্কা সামলানোর মাত্র ১০ সেকেন্ডের মাথায় আমি প্রচণ্ড ভয় পাই।’ ওই সময় তাঁর সামনে সিঁড়ি ছিল। দ্রুত তিনি সিঁড়ি ধরে নিচে নামতে থাকেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, যে সিঁড়ি ধরে তিনি নামছেন, তা ঠিক আছে কি না। ৮১ তলায় নামার পর দেখেন, এক নারী দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিক উঠছেন। ওই নারী তাঁদের বলেন, নিচে তিনি ধ্বংসস্তূপ ও আগুন দেখতে পেয়েছেন। তাঁদের দ্রুত সরে গিয়ে ছাদের দিকে উঠতে বলেন। তাঁদের আশা ছিল, ছাদে কোনো উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার তাঁদের রক্ষা করতে আসবে।

ওই নারী ছাদের দিকে চলে গেলেও ব্রায়ান ও তাঁকে অনুসরণ করা অন্য সহকর্মীরা সেখানে দাঁড়িয়ে কোন দিকে যাবেন, ঠিক করতে থাকেন। ওই সময় ব্রায়ান একটি শব্দ শুনতে পারেন। তিনি ৮১ তলায় একটি ধাক্কার মতো শব্দ শোনেন। তিনি ভালো করে শুনে বুঝতে পারেন কেউ বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছেন। ব্রায়ান দ্রুত নিচের দিকে নেমে যান। সেখানে তিনি একটি গর্তের মধ্যে একজনকে পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি ফ্ল্যাশলাইটের আলোতে দেখতে পান কেউ একজন বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন।

ওই ব্যক্তি হলেন ফুজি ব্যাংকের কর্মী স্ট্যানলি প্রাইমনাথ। তিনি একটি বিমানকে তাঁদের দিকে ধেয়ে আসতে দেখে আগেই টেবিলের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অফিস ভবন ধ্বংস হলেও ওই টেবিলের কারণে তিনি রক্ষা পান। তবে তিনি দেয়ালের নিচে একটি গর্তে আটকে পড়েন। ব্রায়ান তখন তাঁকে উদ্ধারের জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। কয়েকবারের প্রচেষ্টায় স্ট্যানলিকে ওপরে তুলতে পারেন ব্রায়ান। প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানান স্ট্যানলি। ব্রায়ান নিজের পরিচয় দেন। স্ট্যানলি নিজের নাম বলেন। এরপর দুজন মিলে নিচের দিকে নামতে শুরু করেন। কিন্তু ব্রায়ানকে যাঁরা অনুসরণ করছিলেন, তাঁরা অনেকেই আবার ওপরের দিক ছুটতে থাকেন।

নিচে নামার সময় অনেক ক্ষেত্রে ধোঁয়ায় ভরা ভাঙাচোরা সিঁড়ি তাঁদের পার হতে হয়। ৯টা ৫৫ মিনিটে তাঁরা নিচের তলায় এসে পৌঁছান। তাঁরা যখন ভবন থেকে বের হচ্ছিলেন, এক অগ্নিনির্বাপণকর্মী দ্রুত দৌড়ে তাঁদের ওই এলাকা ছাড়তে বলেন। কারণ, রাস্তায় তখন ভবনের বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ পড়ছিল। অগ্নিনর্বাপকের কথা শুনে দ্রুত দৌড়াতে থাকেন তাঁরা। কিছু দূর দৌড়ে স্ট্যানলি পেছনে ফিরে দেখেন। তিনি ব্রায়ানকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে ভবনটি ভেঙে পড়বে।’ ব্রায়ান দ্বিমত প্রকাশ করেন। কিন্তু তাঁদের কথা শেষ না হতেই সাউথ টাওয়ার ভেঙে পড়তে শুরু করে। ভবনটি ভেঙে পড়ার মাত্র ৪ মিনিট আগে সেখান থেকে বের হতে পেরেছিলেন তাঁরা। বিমানটি যেখানে আঘাত করেছিল, তার ওপরের সব কটি তলা ধসে পড়ে। সেখান থেকে মাত্র চারজন বাঁচতে পেরেছিলেন। ব্রায়ান ও স্ট্যানলি তাঁদের মধ্যে দুজন।

ব্রায়ান বলেন, এ ঘটনার হাজারো অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে। কেন আমি বেঁচে গেলাম। তাঁরা কেন বাঁচতে পারলেন না? আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। আমাকে মূলত জীবন উপহার দেওয়া হয়েছে। আমি ভাগ্যবান।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension