
নেপাল ও বিশ্ব জুড়ে বাল্যবিবাহের পরিসংখ্যান বৃদ্ধি
মহামারীর কারণে সৃষ্ট চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং জটিলতার দিকে ক্রমধাবমান সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়। পরিসংখ্যানগুলোয় বাল্যবিবাহের সঙ্গে অল্পবয়সে মৃত্যুর যোগসূত্র স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়।
জাহান আরা দোলন: রাপ্তি সোনারি, নেপাল : স্বপ্না সরকারী কর্মকর্তা হতে স্বপ্ন চেয়েছিল। আবর্জনা জমে থাকা রাস্তার পাশের ঝুপড়িঘরে বসবাস করা ১৭ বছরের মেয়েটা রোজ রাতে সিলিংএর একমাত্র সৌরচালিত বাল্বের আলোয় বই পড়তে পড়তে, নিজের জন্য একটা অন্যরকম ভবিষ্যতের কল্পনা করত। যে ভবিষ্যত তার মায়ের জীবনের চেয়ে অনেক আলাদা।
কিন্তু নেপাল জুড়ে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, স্বপ্না নিজের লক্ষ্য হারিয়ে ফেলল। কিছু করার মতো না থাকায় গ্রামের এক কর্মহীন শ্রমিকের সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠল।প্রেম হয়ে গেল। তারা বিয়ে করে ফেলল। স্বপ্না এখন আর কর্মজীবনের স্বপ্ন দেখে না। তার আর স্কুলে ফেরার কোনও ইচ্ছে নেই।
স্বপ্না তার দুই মাস বয়সী ছেলেকে বুকের দুধ খাওয়াতে মেঝেয় বসে বলেছিল, ‘পড়াশোনা বন্ধ না করলে হয়ত সবকিছু অন্যরকম হত’। গোপনীয়তার স্বার্থে তার আসল নামটি এখানে উহ্য রাখা হয়েছে।
নেপালের ছোট্ট একটা শহরে স্বপ্নার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে সেটা সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মেয়েদের ক্ষেত্রে ঘটছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, বাল্যবিবাহ অনেক জায়গায় উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং করোনা মহামারী কিশোরীদের স্কুলে ধরে রাখার বহু বছরের কষ্টার্জিত উন্নয়নকে বিপরীত দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জাতিসংঘের চিলড্রেনস ফান্ড সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আশংকা প্রকাশ করে জানিয়েছে, বর্তমান দশকে অতিরিক্ত এক কোটি মেয়ে শিশু বাল্যবিবাহ ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতিসংঘ অনুযায়ী আঠারো পূর্ব বয়সের বিয়েকে বাল্য বিবাহ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, ‘কোভিড-১৯ লক্ষ কোটি মেয়ে শিশুদের পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই উদ্বেগজনক করে ফেলেছে।’
উদ্বেগের মূল কারণটি হলো, অল্পবয়সে বিয়ে এবং অল্পবয়স্ক মৃত্যুর মধ্যকার যোগসূত্র স্পষ্টতই দৃশ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুসারে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ গর্ভাবস্থায় জটিলতা এবং সন্তান প্রসব। এবং শিশু বউদের সন্তানেরা সবসময় সর্বোচ্চ শিশু মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, করোনা মহামারী বাল্যবিবাহের কারণগুলোকে সুতীব্র করে তুলেছে, যেমন শিক্ষার অভাব, অর্থনৈতিক কষ্ট, পিতামাতার মৃত্যু এবং কিশোরী গর্ভাবস্থা, গর্ভনিরোধক ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করে এর পথ প্রশস্ত করা হয়েছে।
ইউনিসেফের সিনিয়র উপদেষ্টা নানকেলি মাকসুদ বলেন, ‘কোভিড -১৯ আমাদেরকে পিছিয়ে নিয়ে গেছে।’
কিছু ক্ষেত্রে, কিশোরী মেয়েদের পিতামাতা বা অভিভাবকের মাধ্যমে বয়স্ক পুরুষদের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। তবে চাইল্ড অ্যাডভোকেটরা সেসব অল্প বয়সী মেয়েদের নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যারা মহামারীর কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়ে, একটি উন্নত, শিক্ষিত জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করে নেওয়াকে একমাত্র বিকল্প হিসাবে দেখে।
অধিকাংশ বাল্য বিবাহেরই কোনো নিবন্ধন হয় না। ইউনিসেফ অনুযায়ী বর্তমানে জীবিত ৬৫ কোটি মেয়ে এবং নারীর বাল্য বিবাহ হয়েছে। চাইল্ড অ্যাডভোকেটরা বলছেন যে ভারত, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ইথিওপিয়া এবং মালাউই’র মতো জায়গাগুলো যেখানে দীর্ঘকাল ব্যাপী এই সমস্যা প্রকটভাবে বিদ্যমান, এগুলোর কয়েকটি অঞ্চলে কিশোরী গর্ভধারণ এখন প্রায় তিনগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।❐
নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে



