
বর্ণবাদের উন্মত্তরা সর্বব্যাপী
যে যুবক খুন করেছে কাউকে এবং ধরা পড়ে গেছে, জানে শাস্তি হবে, মৃত্যুদণ্ডই সম্ভবত, সে যদি প্রফুল্ল থাকে, মৃদু হাসি ফুটিয়ে রাখে মুখে তা হলে তাকে আমরা কী বলব— বদ্ধ উন্মাদ, নাকি অন্যকিছু? ইগার আমীর নামে যে ইহুদি যুবক ইসরায়েলের অর্থাৎ তারই রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী ইসহাক রাবিনকে হত্যা করেছিল, তাকে আমরা অবশ্যই পাগল বলতে পারি। যোগ করা যাবে যে, সে সাধারণ উন্মাদ নয়। আদর্শ পাগল। কৃতকর্মের পর তার মুখে যে প্রসন্ন হাসি ছিল সেটা কোনো স্বাভাবিক মানুষের নয়, সেই রকম একজনের যে মনে করে তার জীবন সার্থক হয়েছে, পরম চরিতার্থতা লাভ ঘটে গেছে। প্রসন্নতা আত্মপ্রসাদের এবং অবজ্ঞার। প্রভু, তুমি এদের ক্ষমা করে দিও, এরা জানে না আমি কত ভালো একটা কাজ করেছি, না বুঝে আমাকে আটক করেছে, ভাবছে শাস্তি দেবে। লোকটার ভাবটা ছিল এই রকমের। অনেকটা যিশুখ্রিস্টের মতো। তবে নিশ্চয়ই সে যিশু নয়। তার মন্ত্র ভালোবাসার নয়, ঘৃণার।
একই ঘটনা ঘটেছিল গান্ধী হত্যাকারী উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী নথুরাম গডসের ক্ষেত্রেও। সেও আদালতে সে রকমটাই বলেছিল এবং শাস্তি অনিবার্য জেনেও ধর্মীয় দীক্ষায় তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা ছিল না। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ওই হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা জনরায়ে ভারতের ক্ষমতায় রয়েছে এবং ফ্যাসিবাদী তৎপরতা ক্রমাগত চালিয়ে যাচ্ছে।
এই যুবক ঘৃণার সন্তান। মৌলবাদ যখন জঙ্গি চেহারা নেয় তখন সেটা কেমন নৃশংস হতে পারে তার প্রমাণ সে দিয়েছে। সে একলা নয়, অনেকেই দিচ্ছে। ওই পথে ঘাতকের সন্ধান যখন-তখন পাওয়া যাবে। পাকিস্তানেও পাওয়া গেছে, সেখানকার মিসরীয় দূতাবাসে মৌলবাদী জঙ্গিরা বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। নিহত হয়েছিল ১৬ জন, আহত ৬০। ইসরায়েলি যুবকটি ইহুদি, পাকিস্তানে তৎপর জঙ্গিরা মুসলমান। এ ক্ষেত্রে হিন্দু, ইহুদি, মুসলমানে কোনো ব্যবধান নেই; অন্য বহু ক্ষেত্রে সেটা থাকলেও এবং ইহুদি-মুসলমান পরস্পরের শত্রু হলেও। হিন্দু মৌলবাদীরাও কম পারে না, তাদেরই একজন হত্যা করেছিল মহাত্মা গান্ধীকে, একটা প্রার্থনা সভায় গিয়ে।
এ ধরনের খুনিদের মনস্তত্ত্বে গবেষণার উপাদান আছে। তাদের ব্যক্তিগত ইতিহাস নিশ্চয়ই কৌতূহলোদ্দীপক হবে। তবে সাধারণভাবে বলা খুবই সম্ভব যে, এরা যে জঙ্গি হয় তার কারণ থাকে দুটিÑ একটি হচ্ছে প্ররোচনা, অপরটি চরিতার্থতা লাভের অত্যুগ্র আকাক্সক্ষা। দুটি আলাদা হয়ে থাকে না, এক হয়ে যায়, এক দেহে লীন। উভয়েরই অংশ একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের। হিটলারের শাসন গত শতাব্দীর ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কার্যকলাপের মধ্যে নিকৃষ্টতম, বলা হয় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক কাজ ওই সময় ঘটেছে। কিন্তু হিটলার তো একা ছিল না, সঙ্গে ছিল অনেকে। হিটলার ইহুদিদের হত্যা করে জার্মানিকে বিশুদ্ধ করবে ভেবেছিল, এক তরুণ ইহুদি হিটলারের মতো একই বর্ণবাদী উন্মাদনায় তার নিজের রাষ্ট্রের ইহুদি প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করেছে। হিটলার মনে করত ইহুদিরা পবিত্র জার্মান ভূমিকে অপবিত্র করছে, তাদের নির্বংশ না করে গেলে জার্মানির মুক্তি নেই। গণহত্যার ওই অপরাধীদের আজও যখন ধিক্কার দেওয়া হচ্ছে পৃথিবীময়, বৃদ্ধ ও মৃতপ্রায় অবস্থাতেও কাউকে পাওয়া গেলে যখন ধরে এনে বিচার করা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে, তখন ওই একই অপরাধ করল এক তরুণ ইহুদি। সেও একজন হিটলারই। তারও ওই একই অভিযোগ, ইহুদিদের ঈশ্বর প্রদত্ত পবিত্র ভূমির অংশ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে ফিলিস্তিনীয় আরবদের। এর প্রতিকার করবে সে। প্রতিশোধ নেবে।
হিটলারের প্রকৃত জন্মভূমি জার্মানি কিংবা ইসরায়েলে নয়, তার জন্ম একটি মনোভূমিতে। মনোভূমিটা সাংস্কৃতিক। ইগার আমীর কোনো বাউণ্ডেলে যুবক নয়, সে শিক্ষিত, সে আইনের ছাত্র। হঠাৎ উন্মাদনায় সে খুনি হয়নি, ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয়েছে। স্থির মস্তিষ্কে কাজ করেছে। হিটলারের নাৎসি বাহিনীতে কেবল যে ইহুদিবিদ্বেষী ও অর্ধ-উন্মাদরা ছিল তা নয়, সেখানে অতিশয় সভ্যভব্য, বুদ্ধিমান, সুশিক্ষিত মানুষও ছিল। শেষদিকে ওই একনায়কের ঘনিষ্ঠ সহচরদের মধ্যে ছিলেন আলবার্ট স্পিয়র নামে অতিশয় মার্জিত এক ব্যক্তি। নাৎসি জার্মানির ওপর সবচেয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ লিখেছেন যে, ঐতিহাসিকÑ হিউ ট্রেভর রূপারÑ তিনি যাকে বলেছেন, ওই আমলের ‘আসল দুর্বৃত্ত’।
এই স্পিয়র নিজে খুনি ছিলেন না। যুদ্ধ শেষে তিনি আত্মহত্যা করেননি, ন্যুরেমবার্গ আদালতে যখন তার বিচার হয় তখন বরং স্বীকার করেছেন, হ্যাঁ, তিনি অপরাধী। বিচারে তার কারাদণ্ড হয়েছিল। স্পিয়র ১৯৮১-তে মারা গেছেন। কারাগারে বন্দি অবস্থায় তিনি ডায়েরি লিখে গেছেন, সে ডায়েরি প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলছেন, নাৎসি বাহিনীতে যোগদানের পেছনে একটা স্বপ্ন ছিল তার। বার্লিনকে তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শহর এবং ‘সারা বিশ্বের রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তুলবেন এটাই ছিল সেই স্বপ্ন। তার পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, স্পিয়র বড় হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারে, সেই পরিবারে অভাব ছিল ভালোবাসার। হিটলারের মধ্যে তরুণ বয়সে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন একজন পিতাকে। নিজের পরিবারে তিনি পিতার ভালোবাসা পাননি। রাজনীতিতে এসে সেই ভালোবাসা পেলেন এমন একজন মানুষের ভেতর যে ব্যক্তি আসলে একজন নরঘাতক।
স্পিয়র একা নয়, হাজার হাজার যুবক তখন জার্মানিতে বিদ্যমান হতাশা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর জার্মানির ওপর দিয়ে হতাশায় তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে থাকে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে জাতিগত অসম্মান বড়ই পীড়িত করেছে বিশেষভাবে তরুণদের। তারা দেখছিল বেকারত্বের আশঙ্কা বাড়ছে, দেখছিল ভার্সাই চুক্তি জার্মানিকে নানাভাবে অপমানিত করেছে। পিতৃভূমির এলাকা গেছে ছোট হয়ে, তাকে মানতে হয়েছে পরাজিতের নানা শর্ত। তরুণের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন ছিল এই অবস্থা। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল জার্মানিতে। কিন্তু সমাজতন্ত্র তো জাতিগত অপমানের প্রতিষেধক নয়। সমাজতন্ত্র মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়; সে তো বলে না জার্মানরাই সেরা, পৃথিবীতে তারা অদ্বিতীয়। হিটলারের ডাকটাই উন্মাদ করল তরুণদের। হিটলার বললেন, তিনি শোধ নেবেন জাতিগত অপমানের, জয় করবেন সারা বিশ্ব। তরুণ দেখল চরিতার্থতা লাভের সুযোগ তার সামনে উন্মুক্ত। সে প্ররোচিত হলো প্রচারের দ্বারা এবং অন্যের দৃষ্টান্ত অবলোকনে। ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে গিয়ে যোগ দিল নাৎসি বাহিনীতে।
একইভাবে প্ররোচিত হয়েছে রাবিন-হত্যাকারী। ইসরায়েল জার্মানির প্রতিবেশী নয়। সময়ের ব্যবধান, ব্যবধান স্থানের। সর্বোপরি বর্ণের। কিন্তু ওই ঘাতক যুবকও তো নাৎসি বাহিনীরই সদস্য একজন, যে নাৎসিরা একদিন তার আগের প্রজন্মের ইহুদিদের হত্যা করেছে। বর্ণের যে পবিত্রতার ধারণার ওপর হিটলার তার জার্মানিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, ইসরায়েল নামের রাষ্ট্রটি তো সেই বর্ণবাদের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। হিটলারের প্ররোচনা সভ্যভব্য জার্মান তরুণদের ঘাতকে পরিণত করেছিল, ইসরায়েলের বর্ণবাদও সেই একই প্ররোচনা দিচ্ছে। ঘাতক যুবক নিজে বর্ণবাদ সৃষ্টি করেনি। সে তার রাষ্ট্রের অন্তর্গত বর্ণবাদকে চরম উৎকর্ষের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, সে একটি আদর্শের অগ্রবাহিনীর সদস্য। ইসরায়েল একটি আধুনিক রাষ্ট্র। তার উন্নতি ঈর্ষণীয়, সেখানে বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রথা বিদ্যমান, এমনকি কমিউনিস্ট পার্টিও পেয়েছে কাজ করার স্বাধীনতা, যে রকম সহনশীলতা তার আশপাশের কোনো আরব রাষ্ট্রে নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের অন্তরে তো আছে একটি বর্ণবিদ্বেষ, আছে এই ধারণাও যে, তারাই জগতের শ্রেষ্ঠ। সেই বিদ্বেষ ও ধারণাকে যদি তার নির্গলিতার্থে দেখা যায় তবে যে চেহারাটা ফুটে ওঠে সেটা ওই ইগার আমীরের, ওই যুবকের, যে তার রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করেছে এই অপরাধে অভিযুক্ত করে যে, ইসরায়েলের তিনি অপমান করেছেন। শান্তিচুক্তি করেছেন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এবং পবিত্র ভূমি দিয়ে দিয়েছেন ওই শত্রুদের।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



