
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
কভিড-উত্তর সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। যদিও গতি কিছুটা মন্থর, তবু ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ স্পষ্ট। এটা অনস্বীকার্য যে ঘুরে দাঁড়াতে সময়ের প্রয়োজন। কারণ অর্থনৈতিক, সামাজিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সর্বত্র কভিডের ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যের ওপর যে প্রভাব পড়েছে তা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। তাই বাংলাদেশের এই মুহূর্তে যে চ্যালেঞ্জগুলো দেখতে পাচ্ছি তা শুধু অভ্যন্তরীণভাবে মোকাবেলা করাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবেলারও সম্পর্ক রয়েছে।
এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক। তবে এর সুফল এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে বলে মনে করার কারণ নেই। বহু মানুষের প্রকৃত আয় বাড়েনি। সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় আরো কমিয়ে দিয়েছে। মানুষ জীবনযাপনে হিমশিম খাচ্ছে। সরকারি তথ্য বলছে, ৬.৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ঘটেছে, কিন্তু বাস্তবে আমরা সেটা দেখছি না। বরং অনেক বেশি মূল্যস্ফীতি প্রত্যক্ষ করছি। এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আমরা মাথাপিছু আয় ধরে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছেছি। কিন্তু আয়বৈষম্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে। আমি মনে করি, শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, এর যথাযথ বিতরণ তথা সমতাভিত্তিক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগামী বাজেটে এই বিষয়টাতে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। এটাকে কেন্দ্র করেই কর ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী, শিক্ষা খাতের বরাদ্দ দিতে হবে। শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দিকেই মনোযোগ দিলে হয় না। প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন আছে, কিন্তু মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে সমতা।
দেশে প্রবৃদ্ধির তুলনায় কর্মসংস্থান বাড়েনি। বলা হয় চলমান প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানবান্ধব নয়। এ জন্য আমাদের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আমরা এখনো কর্মসংস্থান বাড়ানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় লোক পাঠাতে পারিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও নেপাল থেকেও লোকজন অনেক মধ্যপ্রাচ্যে গেছে। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার কারণ হচ্ছে আমরা সেদিকে ঠিকমতো নজর দিচ্ছি না। কিছুদিন আগে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানো নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। তারপর বিষয়টি খুব বেশি দূর এগিয়েছে বলে শোনা যায়নি। এ বিষয়ে বাজেটের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। তবে সার্বিক কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য বাজেটে থাকতে হবে।
বাজেটে সব সময় দেখি নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক ও বড় বড় শিল্প খাত এগিয়ে থাকে। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোতে তেমন প্রণোদনা দেওয়া হয় না। এ খাতে অপেক্ষাকৃত প্রণোদনা অনেক কম। বাংলাদেশের সমস্যা হচ্ছে আমাদের অনেক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে; কিন্তু ছোট ও মাঝারি শিল্পের প্রসার ততটা ঘটেনি। অনেক ক্ষেত্রে আমরা এখনো আমদানিনির্ভর। বাজারে গেলে দেখা যায়, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অনেক জিনিস আমদানি হয়। দেশে উৎপাদিত হয় কিংবা উৎপাদন করা সম্ভব এমন অনেক পণ্য, এমনকি ভোগ্যপণ্য আমদানি হচ্ছে। এটা মোটেও ঠিক নয়। আমাদের শিল্পগুলোকে উৎসাহ দিতে হবে। এ জন্য কর সুবিধাসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে।
কৃষি খাত নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। আমরা বলে থাকি যে কৃষি খাত অনেক ভালো করছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সামগ্রিক কৃষির অনেক অবদান রয়েছে। কিন্তু কৃষকদের সে অর্থে উৎসাহিত করা হয় না। কৃষকদের প্রণোদনা খুব কম। এর একটি ধ্রুপদি উদাহরণ হতে পারে হাওর অঞ্চল। শুধু বাঁধ দিয়ে ফসল রক্ষা করা যায় না। বরং হাওরের পরিবেশের সঙ্গে কৃষিকে কিভাবে অভিযোজন করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। এ নিয়ে ব্যাপক আকারের গবেষণা প্রয়োজন। যাই বলি কৃষির প্রতি আমাদের অবহেলা রয়েছে। এখন সময় এসেছে কৃষির প্রতি বেশি নজর দেওয়া।
এত বলাবলির পরও বাংলাদেশের উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। সবই নগরকেন্দ্রিক, বিশেষ করে রাজধানীকেন্দ্রিক। এতে বড় সমস্যা হচ্ছে আঞ্চলিক বৈষম্য সৃষ্টি। এই বৈষম্য বাজেটেও দেখা যায়। এখন সময় এসেছে স্থানীয় পর্যায়ের চাহিদা, স্থানীয় শিল্প ও সম্পদ সৃষ্টিতে বিশেষ নজর দেওয়া। প্রশাসনসহ সরকারের কিছু সংস্থা শহরকেন্দ্রিক কিছু মৌলিক কাজ করে নিতে পারে; কিন্তু অন্যরা পারে না। তাই বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। এটা নিয়ে তেমন কোনো চেষ্টাও দেখা যায় না। কথাবার্তা হয়, জেলা বাজেট করা হবে, স্থানীয় বাজেট হবে। কিন্তু সম্পদ কোথায়? সব কিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক করে ফেলা হয়েছে। অথচ ঢাকার যে দুরবস্থা, সেটা হচ্ছে এই কেন্দ্রীকরণের একটা অভিশাপ। এটি উন্নয়নের একটি নেতিবাচক দিক। এখন সময় এসেছে এখান থেকে বের হওয়ার।
দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণ করা। এর সঙ্গে দ্রুততম সময়ে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু তৈরি পোশাককে একচ্ছত্র সুবিধা দিয়ে গেলে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ও বিদেশে বাজার সম্প্রসারণের মনোযোগ ব্যাহত হয়। তৈরি পোশাক খাতকে অব্যাহতভাবে সুবিধা দেওয়া হলে আর্থিক বৈষম্যও বাড়ে। তাতে মুষ্টিমেয় লোকের কাছে সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়। তাই কোনো যুক্তিতে একটি খাত একচ্ছত্রভাবে সুবিধা পেয়ে যেতে পারে না। তৈরি পোশাক খাত টিকে থাকতে যা করা দরকার তা করতে হবে। প্রশ্নটি হচ্ছে অব্যাহতভাবে সুবিধা প্রদান নিয়ে। কারণ অন্যান্য খাতকেও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তুলে আনা দরকার। আমরা জানি, তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের লবি অনেক শক্ত। সুবিধা কমানো হলে তাঁরা হয়তো হৈচৈ করবেন; কিন্তু যথার্থ পদক্ষেপই নিতে হবে। তাঁরা যে এত আয় করছেন তাতে কার বেশি লাভ হচ্ছে? বলা হয় তাঁরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন। কিন্তু তাঁরাই আবার যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য সামগ্রী প্রচুর আমদানি করেন। এসব আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ আবার চলেও যাচ্ছে। তাহলে প্রকৃত লাভ কার হলো? সুতরাং বাজেটে সুবিধা প্রদানেও বৈচিত্র্য আনতে হবে।
বিদেশে বাজার সম্প্রসারণে মনে রাখতে হবে বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ফলে আমাদের বাজার সেখানে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে পারে। তাই বিকল্প বাজার ও বিকল্প পণ্যের দিকে মনোযোগী না হলে পরিস্থিতি আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই একটি পণ্য ও নির্দিষ্ট বাজারের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। বিশ্বে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে মেরুকরণ ঘটছে, সেখানে বাংলাদেশকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনীর ভাতার প্রশ্ন। এখনো বয়স্কদের ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। পাঁচ-ছয় বছর আগেও তা-ই ছিল। এখন কি সেভাবে ৫০০ টাকার কোনো মূল্য আছে? শোনা যাচ্ছে, সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানা হচ্ছে। এটা ভালো। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ভাতার পরিমাণও বাড়াতে হবে। শুধু বয়স্কভাতা দেওয়া সামাজিক সুরক্ষা যথেষ্ট হয় না। এ জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি।
শিক্ষা খাতে সিলেবাস পরিবর্তন, পরীক্ষার বিষয় পরিবর্তন নিয়ে সময় সময় আলাপ-আলোচনা হয়। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা হয় না। মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক গড়ে তোলা দরকার। ভালো শিক্ষক নিয়োগ দরকার। শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবসহ অন্যান্য আনুমানিক সুবিধা প্রসার করা দরকার। শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দরকার। সার্বিক উন্নতির জন্য শিক্ষার উন্নতি জরুরি হয়ে পড়েছে। বাজেটে এসব বিষয়ে জোর দিতে হবে।
দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ অনুঘটকগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। সেটি বাজেট ও বাজেটবহির্ভূত—দুই দিক থেকেই। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সুশাসনের অভাব, অপচয়, দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে বিপদ হবে। এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। অনিয়মগুলো ঠিক না করলে উন্নয়নকে সার্বিকভাবে টেকসই করা যাবে না, সর্বজনীন করা যাবে না।
এক বছরের বাজেটেই সব কিছু করা যায় না। তবে শুরু করতে হয়। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন কৌশল পর্যন্ত নতুনত্ব আনা প্রয়োজন। একই কায়দায় বাজেট প্রণয়ন, হিসাব প্রদান ও বাস্তবায়ন করে গেলে হয় না। এডিপিতে অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প আছে, সেগুলো বাদ দিতে হবে। প্রকল্পের বিপরীতে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।
এবারের বাজেট প্রণয়ন করতে হবে একটি বিশেষ সময়ের জন্য, বিশেষ পদক্ষেপের সমন্বয়ের সঙ্গে। বাজেট অবশ্যই প্রবৃদ্ধি সহায়ক হতে হবে, একই সঙ্গে তা কর্মসংস্থান সহায়ক, বৈষম্য হ্রাসের সহায়ক হতে হবে। এ জন্য আরো বেশি পরিমাণে কর আদায়ে প্রয়াসী হতে হবে এবং সেটা অবশ্যই ধনীদের কাছ থেকে। ধনীদের থেকে কর আদায় হচ্ছে কম কিংবা তাঁরা ফাঁকি দিচ্ছে। তাদের আয়ের ওপর কর বাড়াতে হবে। ভ্যাটের ওপর অধিক নির্ভর না করে আয় ও অন্যান্য প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে হবে। সমতার ভিত্তিতে কর ও সরকারি ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে।
লেখক: সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়



