অর্থনীতি ও বাণিজ্যআন্তর্জাতিক

যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাবে

করোনার প্রভাব কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির দুর্বল উত্থানের বিষয়ে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এই গতি আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা করেছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্হা (আংটাড)। যুদ্ধ শুরুর আগে এক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে চলতি বছর শেষ নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হয়েছিল।

সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস ২ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ‘টেÌড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট আপডেট’ শীর্ষক আংটাডের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও পণ্য বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার ফলে বিভিন্ন দেশ এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পথে হাঁটছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধির গতি আগের ধারণার চেয়ে আরো নিচে নেমে আসবে। নানা বিধি নিষেধ আরোপের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতির অবস্থা আরো খারাপ হবার আশঙ্কা রয়েছে। সেই সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপ, মধ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অনেক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দেখা দিতে পারে শ্লথগতি। ধাক্কা লাগবে এশিয়ার বাজারেও। চলমান যুদ্ধের ফলে মূল্যস্ফীতির চাপের কারণে আবারও সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির পথে হাঁটতে পারে উন্নত অনেক দেশ। আগামী বাজেটের আকারও কমিয়ে দিতে পারে কিছু দেশ। আংটাডের আশঙ্কা, বিশ্ব অর্থনীতিতে চাহিদা কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতি সমন্বয়ের ঘাটতি এবং করোনার প্রভাবে আগে থেকে বেড়ে যাওয়া ঋণের বোঝা আর্থিক খাতের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। এটি উন্নয়নশীল কিছু দেশকে মন্দার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে আংটাডের মহাসচিব রেবেকা গ্রিনস্পান উল্লেখ করেন, ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রবাহ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ধীরগতিকে আরও তরান্বিত করতে পারে। দুর্বল করে দিতে পারে কোভিড-১৯ থেকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানি তেল ও পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। অনেক দেশে বাড়ছে উৎপাদনখরচ। বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায়ও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে যুদ্ধ। এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে পণ্য, বন্ড ও মুদ্রা বাজারে চরম অস্হিরতার পাশাপাশি মুদ্রার পাচার নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

আংটাডের হালনাগাদ পূর্বাভাস অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশ, মধ্য এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। সেই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ, চীনের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ, জাপানের প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। চলমান যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ধাক্কা না লাগলেও নিত্যপণ্যের দাম এবং জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে দেশটির বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি ভুগবে ইউরোপের দেশগুলো। কারণ যুদ্ধের প্রভাব ছাড়াও ইউরোপের দেশগুলো উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। বিশেষ করে জার্মানি প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে রাশিয়ার উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। যুদ্ধের প্রভাবে নানা ধরনের বিধি-নিষেধের প্রভাবে জার্মানির রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলো ইতিমধ্যে নীতি সুদ হার বাড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতির রাশ টানতে এ ধরনের উদ্যোগ আপাত দৃষ্টিতে ইতিবাচক হলেও বিনিয়োগ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাছাড়া মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক হলে উন্নয়নশীল দেশগুলো হতে মুদ্রা পাচারের প্রবণতাও বাড়তে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সহজ শর্তে অর্থায়নের সুপারিশ করেছে আংটাড। উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশের আর্থিক চাপ কমিয়ে আনতে তারল্য সহায়তা দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension