
বাংলাদেশের প্রখ্যাত ছড়াকার জগলুল হায়দার। ছড়ার জগতে এখন অতি পরিচিত একটি নাম জগলুল হায়দার ।
জগলুল হায়দার আজ এতটাই পরিচিত যে যারা ছড়ার জগতের মানুষ নন তারাও এখন জগলুল হায়দারকে চেনেন। বাংলাদেশের দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক এমনকি অন্তর্জালেও নিত্য আর নিরলস লিখে চলেছেন তিনি। সমসাময়িক ছড়ার জগতটা এখন জগলুল হায়দারকে ছাড়া পূরণই হয় না। শিশুতোষ ছড়ার বাইরেও ছড়ার প্রতিটি বিভাগে রয়েছে তাঁর অবাধ বিচরণ।
উত্তরাধুনিক ছড়ায়ও তিনি অত্যধিক জনপ্রিয়। কথ্য ভাষাকে ছড়ায় তুলে এনে পরিবেশন করতে পারা এই ছড়াকারের আরেক নৈপুণ্যতা। আর রাজনৈতিক ছড়াকে তো তিনি দিয়েছেন আলাদা এক মাত্রা। মূলত রাজনৈতিক ছড়া জগলুল হায়দারের পরিচয়টি গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
এবারে তিনি বিচরণ করেছেন ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে। স্বভাবজাত রসবোধে পর্যবেক্ষণ করেছেন লোকসভা নির্বাচন। ‘লোকসভা ভোট ছড়া’ শিরোনামে জগলুল হায়দারের পাঁচটি ছড়া নিয়ে এবারের আয়োজন।
ছড়াকার তাঁর স্বভাবসুলভ ছড়ার শরীরে অনেক প্রচলিত কথ্য শব্দ ব্যবহার করেছেন। পাঠকের বোঝার স্বার্থে প্রতিটি ছড়ার শেষে ফুটনোটে সেসব শব্দের পরিচয় তুলে ধরেছেন।

লোকসভা ভোট ছড়া-১
ছাপ্পা
ভোট এসেছে মেদিনীপুর
হুগলি চাঁচল হাওড়াতে
ভোটের কোকিল তাই এসেছে
প্রতিশ্রুতি আওড়াতে।
হায় জনতা, পায় জনতা
খায় জনতা ধাপ্পা যে
ভোট মানে তো আখেরে সেই
ভোট ক্যাডারের ছাপ্পা যে!
*[আমাদের দেশে ভোটে কারচুপি, রিগিং বা ভোট ডাকাতি শব্দগুলো যেভাবে উচ্চারিত হয়, পশ্চিমবঙ্গে ঠিক সেভাবেই উচ্চারিত হয় ‘ছাপ্পা।’ এখন কিছুটা পরিচিত হলেও বাংলাদেশে তখন এই ‘ছাপ্পা’ টার্মের সঙ্গে অনেকের পরিচয় ছিল না।]

লোকসভা ভোট ছড়া-২
দিদি ইজ সেফ
মমতা দি খুব খেপেছেনসিপিএমের নাই খানা আর
সিপিআইও ফেল্টু রে
কংগ্রেসিরা সেই তো কবেই
ভাগছে দিদির রেল ট্যুরে।
কিন্তু এবার নুতুন হাওয়া
দিদির পিছে কাকুরা
এই কথাটাই ছড়াচ্ছে আজ
হুগলী থেকে বাঁকুড়া।
তবু দিদি সেফ আছে বেশ
বিয়াল্লিশে তিরিশ তো
ভাবছে এটাই কলকাতাতে
শরৎ গফুর গিরীশ তো।

লোকসভা ভোট ছড়া-৩
মুসলিম ভোট
মুসলিম ভোট ম্যাটার করে
এইটা সবাই জানেন তো
তাই মোদীরাও ভোটের আগে
তাঁদের কাছে টানেন তো।
শিবসেনারাও মুসলমানের
সাপোর্ট লাভের আশায় তো
বোম্বে শহর দৌড়ে বেড়ায়
প্রায়শ্চিত্তের ভাষায় তো।
একশ থেকে অধিক সিটে
তাঁদের ভোটই নির্ণায়ক
এসব সিটে ভোটের মাঠে
মুসলিমরাই বীর নায়ক।

দিল্লি থেকে শাহী ইমাম
কলকাতাতে সিদ্দিকি
কি রুল দিলেন আগের মতোই
ভোট করে তা বৃদ্ধি কী?
হয় তো করে হয় তো বা না
তবুও এটাই সত্য যে
সংখ্যালঘু ব্লক ভোট দেয়
জানায় পুরান তথ্য যে।
কংগ্রেস তাই সেই আশাতে
বাংলাতে* ফের মমতা
মুসলিম ভোট পাইয়ে দেবে
আবার তাঁদের ক্ষমতা!?
[*বাংলা= পশ্চিমবাংলা।]


লোকসভা ভোট ছড়া-৪
বসিরহাটের ভোট
দিদির নামে ভরসা করে
মুখটা আরো ফর্সা করে
বসিরহাটের সিটে
নুসরাত তো নেমে গেছেন
এবার ভোটের মিটে।
সংখ্যালঘুর এই সিটে তো
চান্স ছিল তার পুরা
তালাক নিয়া এক বাতেলায়
আজ ভেঙে তা গুঁড়া!?
ফিল্মস্টার প্রার্থী আবার
নয় সে লোকাল বলে
এসব নিয়া আওয়াজ ছিল
খোদ দিদিরই দলে।

বসিরহাটে বিজেপি নয়
কংগ্রেসিরাই বাড়া
দিদির দানে দিলু এবার
দিল্লি দিবেন পাড়া!
নুসরাত তো চাপে আছে
তুফান চায়ের কাপে আছে
এই বাতেলার ভুলে-
দিদির ঘাঁটির দখল এবার
পাঞ্জা নিবে তুলে?
[*পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জিলার বসিরহাট লোকসভা আসনে তৃণমূল প্রার্থী টালিউড নায়িকা নুসরাত জাহান। বসিরহাট ৭৩ পার্সেন্ট মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। ফলে দিদি ম্যাজিক, মুসলিম ভোটব্যাংক, তৃণমূল ফ্যাক্টর ও নিজের পর্দা ইমেজ মিলায়া শুরতে এই আসন নুসরাতের জন্য সহজই ছিল। কিন্তু বিজেপির ‘তালাক বিল’ নিয়া নুসরাতের এক বেফাঁস মন্তব্যে পরিস্থিতি আগের মতো নাই। ফলে এই আসনের ভোট নিয়া চাপানউতোর একটু বেশিই চলতেছে। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস প্রার্থী বসিরহাটের ভূমিপুত্র আব্দুর রহিম দিলুর জন্যও ভালো সম্ভাবনা তৈরি হইছে। অবশ্য নুসরাত এখন প্রতিটা জনসভায় তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতেছেন। যাক বলা যায় না কি হয়। শেষমেশ দিদি ম্যাজিকে কি নুসরাত আসতে পারবেন নাকি আবার পাঞ্জা’র (কংগ্রেসের মার্কা) দখলে যাবে এই আসন? ১৯ তারিখের ভোটের ফলেই তা জানা যাইব। আর আজ সেই বসিরহাটের গরম ভোট নিয়াই এই ছড়া।]

লোকসভা ভোট ছড়া-৫
ফেরদৌস আউট
এ হালুয়া- লে হালুয়া-
কই যাবে তয় ভাজি?
ওদের ভোটে ক্যান যাবে কন
ফেরদৌস আর গাজী।
ভোট নিয়া তো আলাপ হবে
হবে কলাম ছড়া
তাই বলে কি ভিনদেশে যায়
ভোটের মিছিল করা?
গাজীর না হয় যুক্তি আছে
ফেরদৌস কোন কামে
ওদের ভোটের মিছিল দিতে
হেমতাবাদে* নামে?
বিজেপি তাই নালিশ দিছে
সেই নালিশের বাটে
ফেরদৌস আজ লেজ গুঁটিয়ে
উলটা দিকে হাঁটে।
ভারতে ভোট ভারতবাসির
আমরা বরং দেখি
দূরে বইসাই সেসব নিয়া
কলাম ছড়া লেখি।
*হেমতাবাদ= পশ্চিমবঙ্গের রায়গঞ্জ লোকসভা আসনের এক এলাকা যেখানে ফেরদৌস নির্বাচনী মিছিলে অংশ নেয়।
**[লোকসভা নির্বাচনে বাংলাদেশি অভিনেতা ফেরদৌস ও গাজী আব্দুন নূর এর প্রচারণা নিয়া পুরা পশ্চিমবঙ্গে এখন তোলপাড়। আর রাজ্যব্যাপি ব্যাপক চাপানউতোর এর মাঝে ফেরদৌসকে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ তার ভিসা বাতিল করা হইছে। ফলে বাধ্য হয়াই তাকে দেশে ফিরতে হইছে। আর সেই প্রেক্ষিতেই এই ছড়া।]




