
মানুষের মানচিত্র
জাকির হোসেন
সাংবাদিকতাই ছিল ফয়েজ ভাইয়ের মূল অবলম্বন। নিজ পেশার প্রতি তাঁর ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। নিষ্ঠাবান সাংবাদিক ছিলেন ফয়েজ ভাই। দলীয় আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু কখনো দলবাজী করেন নি। দলবাজীকে তিনি ভীষণ অপছন্দ করতেন, বলতেন- ‘খাঁচার পাখি যেমন পাখি নয়, তেমনি দলবাজরা প্রকৃত অর্থে সাংবাদিক নয়। কিন্তু দু:খজনক বিষয় হল, দিন যতই যাচ্ছে দলবাজদের সংখ্যা ততই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এরফলে গণমাধ্যমে নিজ বৈশিষ্ট ও চরিত্র হারিয়ে প্রচার মাধ্যমে পরিনত হয়েছে। সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনগুলোতে এখন আর গণমানুষের আকাঙ্খার প্রতিফলন হয় না। এখন সাংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে বিশেষ রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী এবং ব্যক্তিস্বার্থকে প্রধান্য দেয়া হয়। দলবাজ সাংবাদিকরা এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে নিঃশঙ্কচিত্তে, সর্বোতভাবে সহযোগিতা করে। পেশাগত জীবনে এই দলবাজরা যেমন নিজদলের কোনও অসঙ্গতি উপলব্ধি করতে পারে না, তেমনি প্রতিপক্ষ বা বিরোধীদলের কোনও ইতিবাচক দিক খুঁজে পায় না। সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা গ্রহণ, জাতীয় পুরস্কারের লোভ এবং এমপি, মন্ত্রী হওয়ার আশায় দলবাজদের কেউ কেউ এখন সরাসরি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। আবার কেউ কেউ দলীয় কোনও পদে না থাকা সত্ত্বেও দলবাজীতে দলীয় নেতাকর্মীদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে অনেকেই প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি লাভবান হচ্ছে। তারা বাড়ি, গাড়িসহ অঢেল সম্পত্তির মালিক হচ্ছে, এমন কি অযোগ্যরাও জাতীয় পুরস্কারও পেয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের রাজনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ, সর্বোপরি সাংবাদিকতা কলুষিত হয়েছে।‘
ফয়েজ ভাই বহু কাগজে কাজ করেছেন। ইত্তেফাক, সংবাদ, আজাদ ও পূর্বদেশ পত্রিকার চিফ রিপোর্টার ছিলেন। আগরতলা মামলার আগা গোড়া রিপোর্ট করেছিলেন আজাদ পত্রিকায়। বিশ্লেষকদের মতে এটাই ফয়েজ ভাইয়ের জীবনের শ্রেষ্ঠ রিপোর্ট। ’৫৭ সালে ‘রাজমহল’-এ ন্যাপ গঠিত হওয়ার সময় ফয়েজ ভাই ছিলেন দৈনিকসংবাদের চিফ রিপোর্টার। সেই সময় মজলুম গণমানুষের নেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৬৬ ও ৬৭ সালে দুই বছর মেয়াদে ফয়েজ ভাই পিকিং রেডিওতে বাংলা ভাষায় প্রোগাম চালু করার জন্য নিযুক্ত হন। এর আগে ১৯৫২ থেকে ‘৫৪ সালে ঢাকা রেডিওতে ছোটদের বিভাগ ‘সবুজের মেলা’ পরিচালনা করতেন।
মুক্তিযুদ্ধের অল্প কিছু আগে ফয়েজ ভাই ‘স্বরাজ’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। এই প্ত্রিকাটি অত্যাসন্ন মুক্তিযুদ্ধের আবেগ ধারণ করেছে। মানুষকে বলেছে প্রস্তুত হতে। সার্বিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার জন্য তিনি এই পত্রিকাটি বের করেন। পত্রিকাটির সম্পাদকীয় ছিল না। তৎকালীন সামরিক সরকার ফয়েজ ভাইয়ের নামে ডিক্লারেশন না দেওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানি এক বন্ধু আবেদ জুবেরীর নামে ডিক্লারেশন নিয়েছিলেন। ফয়েজ ভাই ছিলেন এর সম্পাদক। এই পত্রিকায় যুদ্ধের বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের ডায়াগ্রাম ছাপা হত। একাত্তরের মার্চে এই পত্রিকার প্রধান হেডিং হয় ‘বিদ্রোহ ন্যায় সঙ্গত।’ পত্রিকাটির অফিস ছিল তোপখানায় জাতীয় প্রেসক্লাবের উল্টো দিকে। ২৫ তারিখে যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পর ২৯ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তোপখানার অফিসটি বন্ধ করে দেয় এবং সমগ্র প্রেস লুট করে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার উপলব্ধি করে, দেশে একটি নিউজ এজেন্সি থাকা বাঞ্ছনীয়। তখন গঠন করা হয় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস)। তাজউদ্দীন সরকার ফয়েজ ভাইকে এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রধান সম্পাদক নিযুক্ত করেন। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য প্রায় এক বছর নিরন্তর পরিশ্রম করেন। এরই মধ্যে তাঁর প্রতি উচ্চতর কর্তৃপক্ষে বিরূপ মনোভাবের পরিচয় পেয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে এক মুহুর্তও বিলম্ব করেন নি। জীবীকার পরবর্তী নির্বাহ কীভাবে ঘটবে সে চিন্তায় ব্যকুল হননি একেবারেই। এরপর ১৯৭৩ সালে তিনি উদ্যোগ নেন ‘বঙ্গবার্তা’ নামের একটি পত্রিকা প্রকাশের। বলাবাহুল্য, টেকাতে পারেন নি সরকারি রুদ্ররোষের মুখে। এ প্রসঙ্গে ফয়েজ ভাই দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে বলেছিলেন, ‘তৎকালীন সরকারের দুর্নীতি এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মজুলম গণমানুষের নেতা মওলানা ভাসানী সরব হলে সরকার মওলানাকে নজরবন্দী করে। এমতাস্থায় আমি বঙ্গবার্তার প্রধান বার্তা সম্পাদক কামাল লোহানীকে সঙ্গে নিয়ে মওলানা ভাসানীর একটি সাক্ষাৎকার নেই। এটি প্রকাশের পর তৎকালীন সরকার এ পত্রিকার জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়। এ কারণে সরকারের ভয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও পত্রিকাটিতে বিজ্ঞাপন দেওয়া থেকে বিরত থাকে। অন্যদিকে এরই মধ্যে যে সব প্রতিষ্ঠান ৬ মাসের জন্য অগ্রিম বিজ্ঞাপন দিয়েছিল তারাও অর্ডার বাতিল করে। ফলে আর্থিক সঙ্কটে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।‘
১৯৫০ সালে ফয়েজ ভাই ‘হুল্লোড়’ নামে কিশোর মাসিক বের করেন। সে পত্রিকা নবীন-প্রবীণ সকলের মধ্যেই সাড়া জাগিয়েছিল। হুল্লোড়-এর কিশোর মনস্কতা যেমন সত্য, তেমনি সত্য ‘স্বরাজ’ ও ‘বঙ্গবার্তা’র কঠিন অবস্থান।
সাংস্কৃতিক সংগঠক
নানা প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ফয়েজ ভাই। সংগঠন গড়ার, এগুলো পরিচালনা করার এবং নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। কোনও ক্ষেত্রেই ফয়েজ ভাই লাভ লোকসানের হিসেব করেন নি। অনেক কিছুর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু কোথাও আটকা পড়ে থাকেন নি।
ফয়েজ ভাই এদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন ’৫০ সালে। ’৫২ সালে প্রথম প্রগতিশীলদের সমন্বয়ে ঢাকায় একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হয়, এর নাম ‘পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ।’ ঢাকার সব প্রগতিশীল সাহিত্যিক এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত হন। ড. কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন এই সংসদের প্রেসিডেন্ট। আর ফয়েজ ভাই ছিলেন প্রথম সেক্রেটারি। তখন থেকেই ঢাকার প্রগতিশীল সাহিত্যিকদের সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মপন্থি সাহিত্যিকদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। অধ্যাপক অজিত গুহ, মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক অমিয় ভূষণ, আবদুল গনি হাজারী, সৈয়দ নূর উদ্দিন, ড. সারোয়ার মোর্শেদ, সরদার জয়েন উদ্দিন, হাসান হাফিজুর রহমান,আলাউদ্দিন আল আজাদ, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গাফফার চৌধুরী, ড. আনিসুজ্জামান, খালেদ চৌধুরী, আতাউর রহমান প্রমুখ প্রগতিশীল লেখকরা এই সংসদের সদস্য ছিলেন। এদের সঙ্গে ঢাকার ইসলামি লেখক গ্রুপের সমর্থকদের দ্বন্দ্ব সুস্পষ্ট ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ফয়েজ ভাই কলকাতায় বাংলাদেশ সংগ্রামী বুদ্ধিজীবী পরিষদের কার্যকরি সদস্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালে তিনি ‘৬৯-এর গণআন্দোলনে শহীদ মতিউর পুরস্কার প্রবর্তন করেন। এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৩ সালে এর কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়।
কবি হিসেবে নিজেকে জাহির করার জন্য এরশাদ রাষ্ট্রীয় খরচে কবি সম্মেলন ও বঙ্গভবনে কবিতা পাঠের আসর বসালেন। প্রগতিশীল কবিরা প্রত্যাখ্যান করেন এরশাদের কবি-সম্মেলন। ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমানের নেতৃত্বে গঠিত হল জাতীয় কবিতা পরিষদ। এরও প্রাণপুরুষ ছিলেন ফয়েজ আহমদ। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর জাতীয় কবিতা উৎসবের আহবায়ক ছিলেন ফয়েজ ভাই। এরশাদের পতনের পর ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন ফয়েজ ভাই। গোলাম আজমের বিচারের দাবিতে ১৯৯২ সালের ২৬শে মার্চ যে গণ আদালত গঠিত হয়েছিল এর অন্যতম বিচারক ছিলেন তিনি। এর জন্যে বিএনপি সরকার ফয়েজ ভাইয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করে। স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন ফয়েজ ভাই। ১৯৮৩ সালে এইচ এম এরশাদ ঘোষণা করলেন শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া ও আলপনা আঁকা ‘বেদাত কাজ।’ প্রতিবাদে ফয়েজ ভাইয়ের নেতৃত্বে গঠিত হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। দীর্ঘদিন তিনি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। লেখক শিল্পী সাংবাদিক সংস্কৃতিসেবীদের সম্মিলিত পদক্ষেপের কারণে ক্ষমতায় থাকাকালীন এরশাদ কখনই শহীদ মিনারে যেতে পারেন নি। জাতীয় প্রেস ক্লাবেও প্রবেশ করতে পারেন নি এরশাদ। এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে বৈঠক ও যুক্ত ঘোষণা সম্ভব হয়েছিল ফয়েজ ভাইয়ের প্রচেষ্টায়। এজন্য হুলিয়া জারি হয়েছিল ফয়েজ ভাইয়ের নামে। তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছিল এরশাদ সরকার।
১৯৮৯ সালের পয়লা বৈশাখে ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে যে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয় এক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন ফয়েজ ভাই। এ বছরই ঢাকায় প্রথমবারের মত মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এই মঙ্গল শোভাযাত্রায় এখন যোগ হয়েছে এক নতুন মাত্রা। জাতিসংঘের সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ইউনেসকোর স্বীকৃতি লাভের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এখন সারা দেশেই বৈশাখী উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনওধরনের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই চারুকলার শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা চিত্রশিল্পীদের নিজস্ব প্রয়াসে এ শোভাযাত্রা হয়ে উঠেছে বিশ্বের ঐতিহ্য। আমাদের সংস্কৃতিকে করে তুলেছে ঋদ্ধ।শুধু মঙ্গল শোভাযাত্রা নয়, চারুশিল্পের বিকাশে ফয়েজ ভাই ১৯৯১ সালে ঢাকায় প্রথম আধুনিক আর্ট গ্যালারী ‘শিল্পাঙ্গন’ প্রতিষ্ঠা করেন।ফয়েজ ভাইয়ের অনেক সাহসী-দুঃসাহসী প্রচেষ্টার ভেতর একটি হচ্ছে সমাজতান্ত্রিত আর্কাইভ নামে একটি সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা। দেশের আগের-পরের সমাজতন্ত্রীদের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। কিন্তু উদ্যোগটা ফয়েজ ভাইকেই নিতে হয়েছিল। (চলবে)
লেখক: সাংবাদিক



