
সাবেক রাষ্ট্রপতি পল্লীবন্ধু হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ও চীন-জাপান সহ অন্যান্য সম্পর্ক
আবদূন নূর
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ (পল্লীবন্ধু) ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনাকালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং বাংলাদেশের কূটনীতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী অবদান রেখেছিলেন।
প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলের দূরদর্শী দ্বিপাক্ষিক নীতি আজকের ২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং ফলপ্রসূ প্রমাণিত হচ্ছে। তাঁর সময়ে রোপণ করা সম্পর্কের বীজ আজ বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে।বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীন ও জাপানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের গুরুত্ব ও এর প্রতিফলন আলোচনার দাবি রাখে।
চীনের সাথে সম্পর্কের আধুনিক প্রেক্ষাপটএরশাদের আমলে সামরিক ও প্রাথমিক অবকাঠামো দিয়ে শুরু হওয়া চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক আজ “স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ” বা কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে।টানা ১৬ বছর শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার: চীন বর্তমান ২০২৬ সালেও বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগের উৎস।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI): এরশাদের আমলের অবকাঠামোগত সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে। এর অধীনে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতি বদলে দিচ্ছে।
২০২৬-এর কূটনৈতিক নতুন যুগ: অতি সম্প্রতি ২০২৬ সালের জুন মাসে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে “Community with a Shared Future in the New Era” (নতুন যুগে অংশীদারিত্বের এক নতুন স্তর) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। চীন বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা পণ্যের ওপর ২০২৮ সাল পর্যন্ত ১০০% শুল্কমুক্ত সুবিধা বর্ধিত করেছে।
জাপানের সাথে সম্পর্কের আধুনিক প্রেক্ষাপটএরশাদের আমলে যমুনা সেতুর অর্থায়নের যে প্রতিশ্রুতি জাপান দিয়েছিল, আজ তা বাংলাদেশের সামগ্রিক যোগাযোগ ও শিল্প খাতের রূপান্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছে।মেগা অবকাঠামোর মূল চালিকাশক্তি: বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতের দৃশ্যপট বদলে দেওয়া মেট্রোরেল (MRT Lines 1, 5, & 6),
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল, এবং মহেশখালীর মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর জাপানি অর্থায়ন ও জাইকা (JICA)-র সহায়তায় নির্মিত হচ্ছে।ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (EPA): এলডিসি (LDC) বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২৬ সালের মধ্যেই জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA) কার্যকর হতে যাচ্ছে। এটি ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও চামড়া শিল্পের জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ধরে রাখতে সবচেয়ে বড় আইনি ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে কাজ করবে。
কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা: ২০২৬ সালের বিশ্ব রাজনীতিতে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মধ্যে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে, তখন জাপান বাংলাদেশের জন্য একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নোঙর।
মূল মূল্যায়নপ্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলের বড় কৃতিত্ব ছিল তিনি কোনো এক ব্লকের দিকে ঝুঁকে না পড়ে চীন ও জাপান—উভয় দেশের সাথেই সমানভাবে সমতা বজায় রেখেছিলেন। ২০২৬ সালের বর্তমান সরকারও ঠিক একই কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি (Balanced Foreign Policy) বজায় রাখতে এবং একই সাথে ভূ-রাজনৈতিক চাপ সামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে।
আজকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও জাপানের এই “ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (EPA)” কীভাবে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব ফেলবে,
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA) দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অত্যন্ত গভীর ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো উন্নত দেশের সাথে স্বাক্ষরিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি। ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের ঠিক পূর্বমুহূর্তে এই চুক্তি দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের শুল্ক ধাক্কা থেকে রক্ষা করতে যাচ্ছে।আজকের বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে এই EPA চুক্তি বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে যেভাবে প্রভাব ফেলবে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
রপ্তানি বৃদ্ধি ও শুল্কমুক্ত সুবিধা (Tariff-Free Market Access)
৯৭% পণ্যে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা:
চুক্তির আওতায় জাপান বাংলাদেশের ৭,৩৭৯টি পণ্যে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক (RMG), পাটজাত পণ্য, চামড়া ও ফুটওয়্যার এবং হস্তশিল্প রয়েছে।
গার্মেন্টস খাতের বড় জয় (Rules of Origin):
তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ বা শিথিল নিয়ম চালু হওয়ায় বাংলাদেশ সুতা বা কাপড় আমদানি করে পোশাক তৈরি করলেও জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। ফলে ২০২৬ সালের পরেও জাপানে পোশাক রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জাপানি সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) ও প্রযুক্তি হস্তান্তর১,০৩৯টি পণ্যে পর্যায়ক্রমিক শুল্ক ছাড়: বাংলাদেশ জাপানের মাত্র ১,০৩৯টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দেবে, যা একবারে না দিয়ে ১৮ বছর ধরে ধাপে ধাপে কমানো হবে। এর ফলে স্থানীয় শিল্পগুলো নিজেদের শক্তিশালী করার পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছে।
অটোমোবাইল ও লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন:
টয়োটা ও হোন্ডার মতো বৈশ্বিক জাপানি ব্র্যান্ডের তৈরি গাড়ি আমদানিতে বাংলাদেশ এখনই শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়নি। এটি ইচ্ছাকৃত কৌশল, যাতে জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে সরাসরি এসে গাড়ি ও পার্টস তৈরির কারখানা স্থাপন করে।
সেবা খাতের উদারীকরণ ও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিসেবা খাতের শতভাগ উন্মুক্তকরণ:
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ জাপানের জন্য ৯৭টি সেবা খাত এবং জাপান বাংলাদেশের জন্য ১২০টি সেবা সাব-সেক্টর উন্মুক্ত করেছে।আইটি ও দক্ষ পেশাজীবীদের সুযোগ: এর ফলে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি (IT), নার্সিং ও কেয়ারগিভারসহ বিভিন্ন কারিগরি খাতের দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য জাপানের শ্রমবাজারে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পোস্ট-এলডিসি ট্রানজিশন সিকিউরিটি (LDC Graduation)LDC ক্যাটাগরি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে, জাপানের সাথে এই EPA তা স্থায়ীভাবে পূরণ করবে।ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স-বাংলাদেশ (ICCB)-এর মতে, জাপানের সাথে এই চুক্তি সফল হওয়ায় এটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), যুক্তরাজ্য (UK) এবং আসিয়ান (ASEAN) দেশগুলোর সাথে ভবিষ্যতে একই ধরনের বাণিজ্য চুক্তি করার ক্ষেত্রে একটি আদর্শ মাপকাঠি (Benchmark) হিসেবে কাজ করবে।
ডিজিটাল বাণিজ্য ও আইনি নিরাপত্তাএই চুক্তি কেবল শুল্ক কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দুই দেশের মধ্যে ডিজিটাল বাণিজ্য, মেধা স্বত্ব (Intellectual Property) এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সহজ ও স্বচ্ছ করে তুলেছে, যা দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক অবদানগুলো নিচে আলোচনা করা হলো
সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠা: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে ঢাকায় প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সংস্থাটি গঠনে এবং দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের (যেমন ভারতের রাজীব গান্ধী এবং পাকিস্তানের জিয়াউল হক) এক মঞ্চে আনার ক্ষেত্রে এরশাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
জাতিসংঘ শান্তি মিশনে সেনা প্রেরণ: ১৯৮৮ সালে সব রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা উপেক্ষা করে তিনি প্রথম জাতিসংঘ শান্তি মিশনে (UN Peacekeeping) বাংলাদেশের সৈন্য পাঠান। তাঁর এই সিদ্ধান্তের ফলেই আজ বিশ্ব দরবারে শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সৈন্য প্রেরণকারী দেশগুলোর একটি হিসেবে অনন্য মর্যাদা লাভ করেছে।
উপসাগরীয় যুদ্ধে অংশগ্রণ: ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক জোটের অংশ হিসেবে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কুয়েত ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা ও পরিবেশ পুরস্কার লাভ: জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং পরিবেশ রক্ষায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৭ সালে তিনি সম্মানজনক “জাতিসংঘ জনসংখ্যা পুরস্কার” (United Nations Population Award) লাভ করেন, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে।
ইংরেজি শিক্ষার প্রসার: আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য তিনি প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেন।
ইসলামী বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক: ওআইসি (OIC)-র মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত করেন। এর ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়।বিদেশে কর্মী রপ্তানি শুরু: সরকারিভাবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানো শুরু হয় তাঁর আমলে, যা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি (রেমিট্যান্স) হিসেবে কাজ করছে।
জাতিসংঘে অবদান ও বহুপাক্ষিক কূটনীতি: ১৯৮৮ সালে তাঁর সিদ্ধান্তেই বাংলাদেশ প্রথম জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) সেনা পাঠায়। এই একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে আজ “শান্তির দূত” হিসেবে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
লুক ইস্ট (Look East) পলিসি: দূরপ্রাচ্যের উন্নত দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বাড়াতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে চীন ও জাপানের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক সোনালী অধ্যায় শুরু হয় তাঁর আমলে, যার ফলে এই দেশগুলো বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী হয়ে ওঠে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে (১৯৮৩-১৯৯০) চীন ও জাপানের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তিনি দূরপ্রাচ্যের এই দুই পরাশক্তিকে বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলেন।
চীন ও জাপানের সাথে সম্পর্কের সুনির্দিষ্ট সুফল ও অবদানগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
# চীনের সাথে সম্পর্কের সোনালী অধ্যায়এরশাদের আমলে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী রূপ নেয়।চীন-মৈত্রী সেতু নির্মাণ: ঢাকার পোস্তগোলায় বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর প্রথম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত হয়। এটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা করে।
সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী) আধুনিকায়নে চীনকে প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এই সময়ে চীনের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম, ট্যাংক ও ফাইটার জেট সংগ্রহ করা হয়।
বাণিজ্যিক চুক্তি ও সাহায্য: চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি মুক্ত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে বাংলাদেশের পাট ও অন্যান্য পণ্য চীনে রপ্তানির পথ সুগম হয়।
ঘন ঘন উচ্চপর্যায়ের সফর: প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিজে বেশ কয়েকবার চীন সফর করেন এবং চীনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দও বাংলাদেশ সফর করেন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
জাপানের সাথে বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদারিত্বজাপানকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম দ্বিপাক্ষিক দাতা দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে এরশাদের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল।মেগা প্রকল্পের অর্থায়ন: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো যমুনা বহুমুখী সেতুর (বঙ্গবন্ধু সেতু) প্রাথমিক পরিকল্পনা, সমীক্ষা এবং অর্থায়নের মূল আশ্বাস জাপানের কাছ থেকে তাঁর আমলেই আদায় করা হয়েছিল।
যমুনা সার কারখানা প্রতিষ্ঠা: বাংলাদেশের কৃষিখাতকে স্বাবলম্বী করতে জাপানের ওডিএ (ODA) ঋণের আওতায় জামালপুরে তৎকালীন এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ যমুনা সার কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
অনুদান ও প্রযুক্তিগত সহায়তা: শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জাপান জাইকা (JICA)-র মাধ্যমে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ অনুদান এবং কারিগরি সাহায্য পাঠাতে শুরু করে।
সোনারগাঁও হোটেল ও মেঘনা সেতু: ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের উন্নয়ন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা সেতুর প্রাথমিক কাজের পরিকল্পনা জাপানের সহায়তায় এই সময়ে গতি পায়।প্রেসিডেন্ট এরশাদের এই দূরদর্শী কূটনীতির কারণেই চীন ও জাপান আজও বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দুই উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে রয়ে গেছে।
ওআইসি (OIC) ও মুসলিম বিশ্বের সাথে ঘনিষ্ঠতা: ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (OIC) শান্তি কমিটিতে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অংশ নেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্কের কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বিশাল শ্রমবাজার (রেমিট্যান্স খাত) উন্মুক্ত হয়।
উপসাগরীয় যুদ্ধে কৌশলগত অবস্থান: ১৯৯০ সালে ইরাক কর্তৃক কুয়েত আক্রমণের পর আন্তর্জাতিক জোটের অংশ হিসেবে তিনি কুয়েত ও সৌদি আরবে বাংলাদেশি সৈন্য পাঠান। এই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিমা বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি: জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ তাঁকে “ইউনাইটেড নেশনস পপুলেশন অ্যাওয়ার্ড” প্রদান করে, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিল।
———————————————————
লেখক ; কবি ও রাজনীতিবিদ



