সাহিত্য

শব্দে ও বর্ণে শৈশবের কথক হুমায়ূন কবীর ঢালীর বাষট্টিতম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার্ঘ্য

শাহ জে. চৌধুরী

সমকালীন বাংলা শিশুসাহিত্যের জগতে এক উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় আলোকের নাম হুমায়ূন কবীর ঢালী। এই প্রথিতযশা শিশুসাহিত্যিক, সংগঠক, সম্পাদক ও প্রাবন্ধিকের বাষট্টিতম জন্মবার্ষিকী পূর্ণ হলো। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিজের অনন্য সৃষ্টিশীলতা, গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং দরদী লেখনীর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মনন গঠনে নিজেকে নিরলসভাবে নিবেদিত রেখেছেন। শিশুদের সরল হৃদয়কে ছোঁয়ার এবং তাদের স্বপ্নে নতুন রঙ ভরিয়ে দেওয়ার এক অপূর্ব জাদুকরী ক্ষমতা তাঁর সৃষ্টির প্রধান চালিকাশক্তি। ছড়া, গল্প, উপন্যাস, রূপকথা, ভৌতিক রহস্য, ভ্রমণকাহিনি , নিবন্ধ ও সম্পাদনার বহুমাত্রিক বিন্যাসে তিনি গড়ে তুলেছেন বাংলা শিশুসাহিত্যের এক সুবিশাল ও সমৃদ্ধ ভুবন। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে শিশুমনস্তত্ত্বের নিখুঁত রূপায়ণ, গ্রামবাংলার রূপময় প্রাকৃতিক চিত্রায়ন, নিখাদ মানবিক মূল্যবোধ এবং গভীর দেশপ্রেমের মহতী চেতনা।

হুমায়ন কবির ঢালীর তিনটি বইয়ের প্রচ্ছদ।

১৯৬৪ সালের ৩০ অক্টোবর চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার সিকিরচর গ্রামে হুমায়ূন কবীর ঢালীর পৈত্রিক নিবাস। তবে তাঁর পিতা ব‍্যবসায়িক কারণে দেশ স্বাধীনের আগে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে এবং সেখানেই ঢালীর জন্ম।

সিকিরচরের মেঘনা ও ধনাগোদা নদীর অবিরাম কলতান, সবুজ-শ্যামল প্রান্তর, পাখির ডাক, মেঠো পথ এবং রূপময় লোকজ পরিবেশের কোলে তাঁর শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়েছে। দুরন্ত শৈশবে গ্রামীণ জীবনের যে রূপময় রূপকথা, মাটির গন্ধ ও অনাবিল সৌন্দর্য তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা-ই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যিক সত্তার স্থায়ী মূলধন হয়ে ওঠে। ছোটবেলার সেই অপার বিস্ময়বোধ ও দূরন্তপনা তিনি পরিণত বয়সে পৌঁছেও নিজের হৃদয়ে গভীরভাবে লালন করে চলেছেন। আর সে কারণেই মানুষ হিসেবে তিনি যেমন অত্যন্ত হৃদয়বান, উদার, বিনয়ী ও পরোপকারী, তেমনি তাঁর কথা, কাজ ও ব্যবহারে সর্বদা ফুটে ওঠে শিশুদের মতো এক অকৃত্রিম অমায়িক সরলতা। কোনো ধরনের অহংকার বা জটিলতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, তরুণ সাহিত্যিক এবং অগণিত পাঠকের কাছে তিনি এক অত্যন্ত স্নেহশীল, নির্ভরযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় মানুষ।

আশির দশকের শেষ দিকে সাহিত্যচর্চায় প্রবেশ করে হুমায়ূন কবীর ঢালী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাঠক ও সমালোচকদের প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একশ’টিরও বেশি, যা যেকোনো লেখকের জন্যই এক সুবিশাল ও ঈর্ষণীয় অর্জন। তাঁর উল্লেখযোগ্য ও বহুল পঠিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দুষ্টু ছেলের গল্প’, ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’, ‘কাকের ছা কঙ্কাবতী’, ‘লজিংবাড়ি’, ‘নীলগ্রহের রহস‍্য’, ‘ক্লাসমেট’, ‘টিয়েপাখির জন্মদিনে’, ‘পরিকন‍্যা’, ‘লজিংমাস্টার’, ‘আয় ফিরে যাই’, ‘এক ডজন রূপকথা’, ‘সব ভূত অদ্ভুত’, ‘কাকছানার বন্ধু মুরগিছানা’, ‘A Cowboy and a Magic Mango Tree’, ‘The Birthday Gift’ এবং ‘Kabya and Friend of the Angel’। তাঁর প্রতিটি বই কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, বরং কোমলমতি শিশুদের মনের ভেতর নৈতিকতা, পরমতসহিষ্ণুতা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও মানবিক বোধ জাগিয়ে তোলার এক একটি অনন্য মাধ্যম।

বাংলা ভাষার ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে হুমায়ূন কবীর ঢালীর সাহিত্যকর্ম পৌঁছে গেছে বিশ্বমঞ্চে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা শিশুসাহিত্যকে পরিচিত ও সম্মানিত করতে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম এবং ওড়িশায় বাংলা ও ওড়িয়া ভাষায় তাঁর বহু বই ও রচনা অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। ওড়িশা ও আসামের পাঠকদের কাছে তাঁর গল্প ও কিশোর সাহিত্য ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এর বাইরেও ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত সর্বভারতীয় শিশুতোষ সাময়িকী ‘বালবাটিকা’য় হিন্দিতে অনূদিত গল্প বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত নেপাল থেকেও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ইংরেজি শিশুকিশোর গল্পগ্রন্থ ‘Friends of the Angel’।


আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর সর্বজনীন মানবিক আবেদনের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন হলো তাঁর বহুল প্রশংসিত ছোটগল্প ‘বাবা’। পারিবারিক আবেগ ও সার্বজনীন ভালোবাসাকে উপজীব্য করে রচিত এই বিখ্যাত গল্পটি ইতালি (Italian), হিন্দি (Hindi), ওড়িয়া (Odia), অসমীয়া (Assamese) এবং নেপালি (Nepali) ভাষায় অনূদিত হয়ে বিভিন্ন দেশের পাঠকদের হৃদয় জয় করেছে। তবে তাঁর সাহিত্য জীবনের সবচেয়ে বড় ও গৌরবোজ্জ্বল আন্তর্জাতিক মাইলফলক হলো ইউরোপের ঐতিহাসিক দেশ গ্রিসের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে তাঁর যোগসূত্র। তাঁর রচিত শিশুতোষ দুটি বই—‘A Cowboy and a Magic Mango Tree’ এবং ‘The Birthday Gift’ গ্রিসের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমভুক্ত (Curriculum) হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। ইউরোপীয় ক্লাসরুমে গ্রীক শিশুরা বাংলাদেশের একজন লেখকের লেখা পাঠ করছে—এই অর্জন কেবল হুমায়ূন কবীর ঢালীর একার নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এক বিরল ও সুমহান জাতীয় গৌরব।

কেবল একাকী সাহিত্য সাধনায় মগ্ন না থেকে, বাংলা শিশুসাহিত্যের সামগ্রিক বিকাশ ও বিকাশমান ধারাকে সুসংগঠিত করতে হুমায়ূন কবীর ঢালী অত্যন্ত দূরদর্শী সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তিনি দেশে শিশুসাহিত্য চর্চার সর্ববৃহৎ প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ শিশুসাহিত্যিক ফোরাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এই মেধাভিত্তিক সংগঠনের মাধ্যমে তিনি দেশের জ্যেষ্ঠ ও নবীন শিশুসাহিত্যিকদের একই ছাতার নিচে একত্রিত করেছেন। শিশুসাহিত্যের গুণগত মান বৃদ্ধি, নতুন লেখকদের দিকনির্দেশনা প্রদান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাহিত্য উৎসব, সেমিনার, কর্মশালা ও মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে তিনি দেশের শিশুসাহিত্য আন্দোলনে এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করেছেন।

সংগঠকের ভূমিকায় তিনি যেমন সফল, তেমনি নিজ শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। গ্রামের মানুষকে বইপড়ার আলোয় আলোকিত করতে এবং বইবিমুখ এই আধুনিক যুগে কিশোরদের পাঠাভ্যাসে ফিরিয়ে আনতে তিনি চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার শিকির চর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন গ্রামীণ পাঠাগার ‘আমাদের পাঠাগার’। তাঁর ব্যক্তিগত তদারকি ও ভালোবাসায় গড়ে ওঠা এই পাঠাগারটি আজ স্থানীয় শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষের মানসিক বিকাশ, সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা এবং জ্ঞান অর্জনের এক মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গ্রামের কুটির থেকে আসা শিশুরা এখানে বসে বিশ্বসাহিত্যের সাথে পরিচিত হচ্ছে, যা হুমায়ূন কবীর ঢালীর দূরদর্শী সমাজভাবনারই এক উজ্জ্বল বাস্তব প্রতিফলন।

ভ্রমণ হুমায়ূন কবীর ঢালীর সাহিত্য ও মননশীল জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি ও মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার দুর্নিবার কৌতূহল তাঁকে বারবার তাড়িয়ে নিয়ে গেছে দূর-দূরান্তে। তিনি ভ্রমণ করেছেন এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু দেশ। ভারত, নেপাল, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাঁর শক্তিশালী বর্ণনাশৈলীর মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তুলেছেন অনন্য সব ভ্রমণগ্রন্থে। সহজ-সরল ও গতিময় ভাষায় রচিত তাঁর ভ্রমণকাহিনিগুলো পাঠকদের ঘরে বসেই বিশ্বভ্রমণের এক অপূর্ব আনন্দ এনে দেয়।

তবে দেশ-বিদেশের বহু প্রান্তে ঘুরে বেড়ালেও তাঁর হৃদয়ের গভীরতম স্পন্দনটি সর্বদা বাজে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের সুরেই। তাঁর লেখার মূল প্রেরণা ও চেতনার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, একটি প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে শিশুদের হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, দেশপ্রেম এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ শৈশব থেকেই রোপণ করে দিতে হবে। তাঁর ছড়া, গল্প, উপন্যাস ও নাটকে মুক্তিযুদ্ধের সত্য ঘটনা, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দরদী ছোঁয়ায় উপস্থাপিত হয়েছে।

চার দশকের দীর্ঘ ও নিবেদিত সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ হুমায়ূন কবীর ঢালী দেশ-বিদেশের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার, সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর অর্জিত প্রধান পুরস্কার ও সম্মাননাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইউনিসেফ প্রদত্ত মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড (২০১২), এম নূরুল কাদের ফাউন্ডেশন শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১৩), অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক (২০০৬), সালেহীন মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড (২০০৬), কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ স্মৃতি স্বর্ণপদক (২০০৭), নওয়াব ফয়জুন্নেসা স্বর্ণপদক (২০০৮), পদক্ষেপ শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১১) এবং ঝুমঝুমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১৮)। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতে তাঁর সাহিত্যের বহুল প্রসারের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি লাভ করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রদত্ত চোখ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৩), তোরষা সাহিত্য সম্মাননা (২০২০) এবং ওড়িশার মর্যাদাপূর্ণ লেখালেখি সাংস্কৃতিক সংস্থা সাহিত্য সম্মাননা (২০১৯), নিউইয়র্ক থেকে ঢালিউড অ‍্যাওয়ার্ড।


বাষট্টিতম জন্মবার্ষিকীর এই শুভ ও মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল ধ্রুবতারা, শিশুমনস্ক মানুষ হুমায়ূন কবীর ঢালীর প্রতি রইল অন্তহীন ভালোবাসা, অভিনন্দন ও গভীর শ্রদ্ধা। শিশুদের নির্মল হাসি, স্বপ্নময় রূপকথার জগৎ, লোকজ সংস্কৃতি আর স্বদেশের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা নিয়ে তাঁর সৃষ্টিশীল কলম আরও বহুকাল সচল থাকুক। তিনি যেন সুস্থ ও দীর্ঘায়ু লাভ করে আগামী দিনেও বাংলা শিশুসাহিত্যকে নিত্যনতুন রত্নে সমৃদ্ধ করে যেতে পারেন—তাঁর জন্মবার্ষিকীতে এটাই আমাদের পরম প্রার্থনা।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension