প্রবাসমুক্তিযুদ্ধ

ভালোবাসার বৃষ্টিতে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ৫০ বছর উদযাপনে ‘একটি দেশের জন্য গান’

বিশেষ প্রতিনিধি, নিউইয়র্ক: মিলনায়তন ভর্তি দর্শক তখন দাঁড়িয়ে গেছেন। সবার করতালি যেনো থামছেই না। সেই সঙ্গে কারো কারো চোখে আবেগের জল। কেউ কেউ চিৎকার করে বলছেন, ‘অসাধারণ’। ‘একটি দেশের জন্য গান’ নামে প্রামাণ্যচিত্রের উদ্বোধনী প্রদর্শনী শেষে এমনটাই ছিল দর্শকদের প্রতিক্রিয়া। আর এমনিভাবে ভালোবাসার বৃষ্টিতে ভিঁজলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অসামাণ্য একটি উদ্যোগকে ঘিরে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রটি। দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশকে ঘিরে প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন লেখক ও সাংবাদিক শামীম আল আমিন। যার ইংরেজি নাম দেয়া হয়েছে ‘সংস ফর এ কান্ট্রি’।

নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের জুইশ সেন্টারে শনিবার সন্ধ্যায় এই প্রামাণ্যচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এর ৫০ বছর উপলক্ষ্যে এই বিশেষ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। ফ্রেন্ডস অব ফ্রিডম নামে সংগঠনের আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে নিউ ইয়র্ক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য কয়েকটি স্টেট থেকেও অতিথিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসওম্যান গ্রেস ম্যাং এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম সহিদুল ইসলামের ধারণকৃত বক্তব্য শোনানো হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল সাদিয়া ফয়জুননেসা।

গোটা উৎসবটি উৎসর্গ করা হয় দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর অন্যতম দুই উদ্যোক্তা জর্জ হ্যারিসন এবং পণ্ডিত রবিশঙ্করের প্রতি। বিশেষ সম্মাননা জানানো হয় কনসার্টে অংশ নেয়া কিংবদন্তি সরোদ শিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খানকে। সেখানে উপস্থিত হয়ে বাবার পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন তাঁর বড় ছেলে ও বিশিষ্ট শিল্পী ওস্তাদ আশীষ খান। এ ছাড়া বিশেষ সম্মাননা দেয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের আমেরিকান বন্ধু ‘মুক্তিরগান’ চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেভিনকে। কনসার্টের প্রত্যক্ষদর্শী লিন্ডা এন্তোনুচি অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করেন। তার হাতে তুলে দেয়া হয় স্মৃতিস্মারক।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “এই আয়োজন ইতিহাসের চমৎকার একটি অধ্যায় তুলে ধরার চমৎকার প্রয়াস। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এটি অসাধারণ একটি দলিল হয়ে থাকবে। সেদিনের কনসার্টটির গুরুত্ব ছিল অনেক। যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল”। বর্তমানে বাংলাদেশ যে উন্নয়নের পথ ধরে সারাবিশ্বের রোল মডেল সেকথাও তুলে ধরেন তিনি।

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, “১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বব্যাপী জনগণ আমাদেরকে সমর্থণ দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থণ আদায়ে কাজ করেছিলেন অনেকে। শিল্পীরাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিলেন না”। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এর উদ্যোক্তা ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘৫০ বছর পর বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জাতি’।

আমেরিকার কংগ্রেসওম্যান গ্রেস ম্যাঙ বলেন, “সেদিনের কনসার্টটি বিশ্বব্যাপী মানুষের হৃদয় স্পর্ষ করেছিল। আজকে সেই দিনটিরই ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। কংগ্রেসে চমৎকার বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত।”

রাষ্ট্রদূত এম সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সেই কনসার্টের মাধ্যমে বিশ্ববাসী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম সম্পর্কে ভালো করে জানতে পারে। যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিল”। কনসার্টের ৫০ বছর পূর্তির উৎসবকে স্বাগত জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে সম্মাননা গ্রহণ করে লিয়ার লেভিন বলেন, “আমি সেদিন নিজের ভেতরের অনুভূতি থেকে, দায়িত্ব পালনের জন্য ছুটে গিয়েছিলাম বাংলাদেশে। আমি বিশ্ববাসীকে জানাতে চেয়েছিলাম বাংলাদেশে কি নির্মমতা চলছে।” তিনি আরও বলেন, “এত বছর পরও বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে যে সম্মান ও ভালোবাসা পাচ্ছি, তাতে আমি অভিভূত”।

কনসার্টে অংশ নেয়া সব শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ওস্তাদ আশীষ খান বলেন, “বাবার পক্ষে আরও একটি সম্মান গ্রহণ করলাম। বাবা সেদিন যা করেছিলেন, তার জন্য গর্ব বোধ করি”।

কনসাল জেনালের সাদিয়া ফয়জুননেসা বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে এমনিভাবে আরও কাজ হতে পারে। যেনো পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের গৌরবের ইতিহাস ভালোভাবে জানতে পারে।” তিনি প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতা শামীম আল আমিনকে ধন্যবাদ জানান।

নির্মাতা শামীম আল আমিন বলেন, “১৯৭১ সালের ১ আগস্ট ছিল রবিবার। ৫০ বছর পর সেই তারিখটি আবারো রবিবার। মাঝখানে চলে গেছে অনেকগুলো বছর। এখন সময় বদলে গেছে। বাংলাদেশ এখন গৌরবের একটি দেশ। তবে বড় প্রয়োজনের সময় সেইদিনগুলোতে যারা আমাদের পাশে ছিলেন, তাদের অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে ধরার এটি একটি প্রয়াস”।

‘একটি দেশের জন্য গান’ প্রামাণ্যচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী শেষে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের দুই কীর্তিমান শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় ও শহীদ হাসান, মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্পী তাজুল ইমাম, সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ, শহীদ পরিবারের সন্তান ফাহিম রেজা নূর এবং নিউইয়র্কে বাংলাদেশের ডেপুটি কনসাল জেনারেল নাজমুল হাসান। তবে এই পর্বে অংশ নিয়েও লিয়ার লেভিন প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাণ, সম্পাদনা এবং গল্প বলার ধরণের ভূয়সি প্রশংসা করে বলেন, “শামীমের এই প্রামাণ্যচিত্র দেখে মনে হচ্ছে আবারো কাজে নেমে পরি। ধন্যবাদ ইতিহাসকে চমৎকারভাবে তুলে ধরার জন্য’।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ফ্রেন্ডস অব ফ্রিডম এর সমন্বয়ক ও প্রামাণ্যচিত্রের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর আশরাফুন নাহার লিউজা। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির উপদেষ্টা ডা. প্রতাপ দাস। সঞ্চালনা করেন নাফিসা আহমেদ।

শেষে সরোদ পরিবেশন করেন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনিত শিল্পী ওস্তাদ আশীষ খান। মনমুগ্ধকর সেই আয়োজনে সেতারে ছিলেন মোর্শেদ খান অপু এবং তবলায় তপন মদক। উৎসবের এই অংশটিও সবাইকে গভীর আনন্দে ভাসায়। ১৯৭১ সালে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এ সরোদ বাজিয়েছিলেন বাবা ওস্তাদ আলী আকবর খান। সেই কনসার্টের ৫০ বছর পূর্তির উৎসবে সরোদ বাজিয়ে সবার অন্তরকে ছুঁয়ে গেলেন পুত্র ওস্তাদ আশীষ খান।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension